পরেশদা বললেন, ভগবানকে বললুম, ভগবান! আমার সংসার ঘুচিয়ে দাও। পনেরো বছর সময় নিলেন। সব ফৌত। পরিবার, পরিজন, আত্মীয়স্বজন সব চৌপাট। ভগবান বললেন, লেখাপড়া করলে কেরানি হবি। সারাদিন চেয়ারে বসে থেকে থেকে বাতে ধরবে, বদহজমে মরবি। এই তোর সব টাকাপয়সা কেড়ে নিলুম। নে ব্যাটা, এইবার বোঝ অন্নচিন্তা চমৎকারা, কালিদাস হয় বুদ্ধিহারা। একটু ভাগ্য খারাপ, রেলগাড়ি হল না, হল ট্রামগাড়ি। ভগবান বললেন, এমন করে দিলুম একেবারে ঘোড়ার মতো, সারাজীবন চেয়ারের সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক থাকবে না। সারাদিন দু’ঠ্যাঙে খাড়া হয়ে ঘড়ঘড় করে ঘোরো। রাস্তায় হাঁটার সময় মনে হয় ফুটকড়াইয়ের ওপর দিয়ে হাঁটছি। কেরানি হলে সাততাড়াতাড়ি বিয়ে করার জন্যে খেপে উঠতুম। বিয়ে মানে মাস তিনেকের স্বপ্ন তারপর সারাজীবন দুঃস্বপ্ন। আলপিনের শয্যা। সে পথেও আর যেতে হল না। মহাদেব মাথায় হাত রেখে বললেন, বাবা পরেশ, তুমি আমার চেলা বনে যাও, দালানকোঠা ফেলে দিয়ে শ্মশানে বৈঠকখানা।
শেষ কথাটা গান হয়ে পরেশদার গলা ছেড়ে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। বুঝলুম, বেশ ভালই চর্চা আছে গানের। ওদিকে দু’গেলাস চা নিয়ে প্রলয় কাণ্ড চলেছে। একটা লটরপটর হাতপাখা নিয়ে সেই মড়া নামধারী মানুষটি উনুনের আঁচের সঙ্গে লড়াই করছেন, আর শ্যামা মহিলাটি উত্তম-মধ্যম খিস্তি করে চলেছেন। তার মধ্যে দেহ আছে, ভাগ্য আছে, অদৃষ্ট আছে, ওই লোকটির চোদ্দো পুরুষের শ্রাদ্ধ আছে।
পরেশদা বললেন, ল্যাঙ্গোয়েজ শুনছ! স্বামী-স্ত্রীর কম্বিনেশনটা একবার দেখছ! যেমন লিকার তেমনি ফ্লেভার! আসাম দার্জিলিং ব্লেন্ড!
অবশেষে দু’গেলাস চা আমাদের হাতে এল। ভদ্রলোক গেলাসদুটো যখন আমাদের হাতে দিচ্ছেন, তখনই লক্ষ করলুম, তার হাতদুটো পোড়া। সমস্ত চামড়া গুটিয়ে পাকিয়ে এক জায়গায় জড়ো হয়ে গেছে। দেখামাত্রই সারাশরীর কেমন করে উঠল। লোকটির মুখ দেখে মায়া হল। একসময় দেখতে নেহাত খারাপ ছিলেন না। জীবন এখন সব রস নিংড়ে নিয়েছে। মুখে কোনও কথা নেই। অসম্ভব উজ্জ্বল দুটো চোখ। গাল ভেঙে যাবার ফলে নাকটা খাড়া। মুখটা ধারালো।
পরেশদা বললেন, হাতদুটো দেখলে?
পুড়ে কঙ্কাল হয়ে গেছে।
ইতিহাস শুনবে? ওটা আগুনে পোড়া নয়, অ্যাসিডে পোড়া। ওই মেয়েটির নাম লতা। তিনজনে ফাঁইট করছিল ওই লতার জন্যে। এক ব্যর্থ প্রেমিক, সে আবার সোনার দোকানের কারিগর ছিল। লতাকে অ্যাসিডে গলিয়ে সোনা করতে চেয়েছিল মনে হয়। তখন এই ছেলেটা বাঁচিয়েছিল। ওর গোটা পিঠটা পোড়া, একটুর জন্য মুখটা বেঁচে গেছে। তুমি পারবে, তোমার প্রেমিকাকে এইভাবে বুক দিয়ে বাঁচাতে? পারবে না। মধ্যবিত্ত বাঙালির সবকিছুই ভাসাভাসা, অগভীর। আগে নিজেকে সামলাবে। বলবে, আপনি বাঁচলে বাপের নাম।
প্রেমটা তেমন সাকসেসফুল হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না!
তোমার মাথা! প্রেমের তুমি কাঁচকলা বোঝে। তোমার চোখের সামনে যা ঘটছে সবই প্রেম। তুমি ওই লোকটিকে কিছু বলে দেখো না একবার, কী হয়! আস্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। তুমি এখনও নাবালক। নবকার্তিকের মতো চেহারা, প্রেমট্রেম করেছ?
প্রেমে চুরচুরে হয়ে আছি। কী আর বলব! মিথ্যে কথাই বলতে হল। পেটের কথা পেটে রাখাই ভাল। দোকানে আর কোনও খদ্দের নেই। মেয়েটি বাইরে এসে বসল। ভগবান চোখ দিয়েছেন, নারীশরীরের আকর্ষণ বোঝার ইন্দ্রিয় আমার জেগেছে। আড়ে আড়ে তাকাচ্ছি। মেয়েটি বললে, আজ আর শালা কোনও খদ্দের নেই। তুমি ভাতের জলটা এইবার বসিয়ে দিয়ে চালটা বেছে ফেলল। আনাজের ঝুড়িতে কী পড়ে আছে দেখো।
এতক্ষণে লোকটির মুখে কথা সরল, আজ রুটি করো না, গরম গরম রুটি।
মেয়েটি আঁঝিয়ে উঠল, আমার একেবারে লোহার গতর দেখেছ, তাই না! কে এখন বসে বসে আটা ঠেসবে?
পরেশদা গেলাস নামিয়ে বললেন, চলো, এবার যাওয়া যাক।
হঠাৎ কোথা থেকে বেশ জমাটি গান ভেসে এল, সঙ্গে চালু হাতের হারমোনিয়ম। গানের বাণীও স্পষ্ট, চিন্তা না করো শ্যাম। কপাক কপাক করে তবলার ঠেকা। ফুরফুরে বাতাস। ঠুংরি অঙ্গের গান। আসছে খালের ওপার থেকে। পরেশদা থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন, ওস্তাদ, এসে গেছে। যাঃ, আজ রাতে আর বাড়ি যাওয়া হল না।
কেন পরেশদা?
অসম্ভব! এই গান ছেড়ে যাওয়া যায়? ওস্তাদ এসে গেছে। জোর মাইফেল।
কোথায় হচ্ছে?
ওই তো ওপারে! সাহাবাবুর গোলায়। যাও, তুমি বাড়ি চলে যাও। বাড়িতে ভাববে। আমি আসর মেরে কাল সকালে ডিউটিতে চলে আসব।
আপনার বাড়িতে ভাববে না?
যাতে কেউ না ভাবে তার ব্যবস্থা তো আমার শিববাবু করে দিয়েছে। কেউ নেই, তা ভাববে কে? এমনকী চোরেও আমার কথা ভাববে না। আমি কোথায় থাকি জানো? এক বড়লোকের বাড়ির দারোয়ানের গুমটি ঘরে। পড়তি বড়লোক। দারোয়ান দেহাতে ভেগেছে। পরিবারের ছোটবাবু বললেন, শেয়ালের আস্তানা হওয়ার চেয়ে তুমিই থাকো। পারলে একটু পাহারাটাহারা দিয়ো। তা মন্দ কী? বিনা পয়সায় থাকা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে তেনারা, মানে শিববাবুর মাফলাররা।
সেটা কী?
বুঝলে না? জ্যান্ত মাফলার। ফণা আছে। ফোঁস করে। তারা মাঝে মাঝে দেখভাল করতে আসে। নাঃ, তোমার সঙ্গে আর কথা বলা যাচ্ছে না। শুনছ, ওস্তাদ কী ছাড়ছে?
পরিষ্কার কানে আসছে, চিন্তা না করো শ্যাম, আয়ি বাহার। গন্ধর্ব কণ্ঠ শোনাই ছিল, আজ কানে। এল। বললুম, পরেশদা, আমিও যাব। গান আমিও ভীষণ ভালবাসি।
