খুচরো নেই।
ভাবছেন ওই কায়দায় বেরিয়ে যাবেন? দিন, আমি আপনাকে চেঞ্জ দোব।
একটা খালি আসনে বসে কনডাক্টর ভদ্রলোক ব্যাগ উলটে চেঞ্জ বের করলেন। ঠোঁটে মুচকি হাসি। আমার খুব ইচ্ছে করছিল, সিক করে অসভ্য ছেলের মতো একটা সিটি মারি। শ্যামবাজারের মোড়ে না নেমে আমি ডিপো পর্যন্ত চলে গেলুম, শুধুমাত্র কনডাক্টর ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করার জন্য। অতুলনীয় মানুষ। তা ছাড়া বাড়ি গিয়েই বা কী হবে। নির্বান্ধব, নিরানন্দ পুরী। স্মৃতিভারাতুর। যে-যাই বলুক, যতই অস্বীকার করুক, আমাদের ওই ওলন্দাজ আমলের বাড়িতে অশরীরী আত্মার উপদ্রব আছে। পাশেই ছিল ওলন্দাজ শাসকের বাড়ি। সেই বাড়ি এখন এক বিশাল ব্যবসায়ীর প্রমোদ ভবন। আমাদের বাড়িটা ছিল সেই বিদেশি বণিকদের কুঠি। খুন-জখম-অত্যাচার-ধর্ষণ সবই হয়েছে। যত রাত বাড়ে তত ভয় বাড়ে।
এই আমার শেষ ট্রিপ, বলে কনডাক্টর ভদ্রলোক ট্রামগুমটির অফিসের সামনে একটা বেঞ্চে বসে পড়লেন। কথা বলতে বলতেই টিকিট আর পয়সার হিসেব চলছে। ভদ্রলোকের নাম পরেশ মৌলিক। বেহালায় থাকেন।
হিসেব চুকিয়ে বললেন, এক ভড় চা চলবে নাকি?
আমার পকেটে তো আপনার দেওয়া টাকাটাই পড়ে আছে!
ভদ্রলোক জিভ কেটে বললেন, আরে ছি ছি। কে কাকে দেয়? দেনেঅলা সেই একজন। ‘ লেনেঅলাও সেই একজন। বিশ্বজুড়ে সেই একের খেলা। আমরা শালা ধরতে পারছি না। ভদ্রলোক জিভ কাটলেন, অ্যায় শালা, শালা বলে ফেলেছি। এই অভ্যাসটা আমার এসেছে দাদুর কাছ থেকে। আমাকে শালা বলেই ডাকতেন। চলে আসুন, গুডনাইট চা-টা মেরে আসি। ওই স্টিমে এখনও আমাকে অনেকদূরে যেতে হবে। ট্রাম চলে বিদ্যুতে। বড়লোক চলে বোতলের ইস্পিরিটে। মধ্যবিত্ত চলে চায়ের ইস্টিমে। গরিব চলে কলকেতে। গরিবের ভগবান মহাদেব। বড়লোকের ভগবান কালী। মহাদেব হয়ে চিতপাত, বুকে নাচছেন মকার। দুই ম-য়ের পায়ের তলায় সারাজীবন ফ্ল্যাট।
আপনি ইস্পিরিট ইস্টিম বলছেন কেন?
ধুর বোকা, স্পিরিট আর স্টিম বললে তো ভদ্দরলোক হয়ে গেলুম। ভদ্দরলোক কে হতে চায়। ভদ্দরলোক হলেই তো ট্রামবাসে, ভাড়া মারার টেনডেন্সি হবে, ঘুষ নিতে ইচ্ছে করবে। ভায়ের। পোঁ, সরি, গাঁ, সরি, পেছনে বাঁশ ভরতে ইচ্ছে করবে। বাঁশ ভরে দে, বাঁশ ভরে দে হুউউউ। জেন্টলম্যান হবার ইচ্ছে আমার একদম নেই। অতটা নীচে নামতে পারব না ভাই। মাপ করো রাজা। দাঁড়ান আপনাদের হিসেবটাকে জমা করে দিয়ে আসি। কুচো পয়সা, কঁচা পয়সা।
পরেশবাবু এগিয়ে গেলেন কাউন্টারের দিকে। গুমটিতে গোল হয়ে ট্রামের পর ট্রাম দাঁড়িয়ে আছে। বেশিরভাগই এইবার ঘুমিয়ে পড়বে। আমার হাতে বাবার দেওয়া ঘড়িটা বাঁধা। সময় দেখছি যতটা কাটানো যায়। মুকুর কথা ভাবছি। কী হল মেয়েটার! নিশ্চয় ওদের সাংঘাতিক অধ্যক্ষা ঘরে তালাচাবি দিয়ে রেখেছেন। গোটা পাঁচেক মেয়েকে বসিয়ে রেখেছেন প্রহরায়। লেডিজ হস্টেল মানেই তো জেলখানা। কী জানি কী হয়েছে ভেতরে! যাই হোক, আর একবার আমি আহত হলুম। ঈশ্বর নাকি যা করেন, সবই মঙ্গলের জন্য। হে মঙ্গলময়, কোথায় বসে আছেন আপনি! কিতনি দূর! সামনেই বাগবাজারের খাল। দগদগে অন্ধকার। এ পারে ও পারে দু’সার ঝুপড়ি। টিমটিমে আলো কাঁপছে কোথাও কোথাও। মেয়েদের খ্যানখেনে গলা বাতাসে ওঠা-পড়া করছে।
পরেশবাবু অর্থমুক্ত নিরর্থ মানুষ হয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন, চলুন, তা হলে একটু ইস্টিম নিয়ে যে যার তাবুতে ফিরে যাই। আজকের মতো যুদ্ধ শেষ। কাল কোন ভোরে আমাকে উঠতে হবে, আপনার কোনও ধারণা আছে?
না পরেশদা।
দাদা বললেন? তা হলে আপনাকে তুমিই বলি। নামটা পেলে বেশ হত।
পিন্টু।
বাঃ, আমাদের দু’জনেরই প দিয়ে শুরু।
গ্যালিফ স্ট্রিটের মাঝামাঝি জায়গায় এলোমেলো একটা চায়ের দোকান। ঝাঁপসা শোকেসে ঠান্ডা লুরি বেগুনি গড়াগড়ি খাচ্ছে। তাকালেই অম্বল। আমরা নড়বড়ে বেঞ্চে পাশাপাশি বসলুম। একজন মহিলা চা তৈরি করছেন। রং ময়লা, কিন্তু বহত যৌবন। বেশ আদেশের ভঙ্গিতে কথাবার্তা বলছেন সকলের সঙ্গে। চিবোনো সঁাতনের মতো চেহারার একটি লোক খিদমত খাটছে। আমরা আসার আগেই লোকটি কিছু একটা অন্যায় করে থাকবে। মহিলা তাকে বেদম ঝাড়ছে। আমাদের দেখে একটু নরম হল।
পরেশদা বললেন, দুটো, মোটা করে।
মেয়েটি একগাল হেসে বললে, দুধ কেটে গেছে এই মড়াটার জন্যে। মোটা হবে না, সরু করে দিচ্ছি।
মানুষ কারও দাঁতের প্রেমে পড়ে! আমি পড়ে গেলুম। দু’ সেট দাঁত যেন দু’সার মুক্তো। কত বয়স হবে! পঁচিশ-তিরিশের মধ্যে। আমার সহপাঠী সুখেন, জবা যাকে নিয়ে পালিয়েছে, সেই সুখেন এই রমণীকে দেখলে শাস্ত্রসম্মতভাবে প্রমাণ করে দিত, এ হল একটা সোনার মোহর, চিনতে পারছিস না অনেকদিন মাটি চাপা ছিল বলে। তোর কোম্পানির আধখানা সাবান দিয়ে প্রথমে ওয়াশ কর, তারপর পাতলা করে অলিভ অয়েল মাখিয়ে স্পঞ্জ। চুল রিঠে মেরে একটু সেন্ট। বিচিলি রঙের শাড়ি আর ব্লাউজ। কপালে একটা টিপ। পায়ে পড়ে যাও। কালবিলম্ব নয়।
পরেশদা বললেন, জীবন যদি দেখতে চাও, দোতলার ঘর ছেড়ে নেমে এসো ফুটপাথে। কড়া লিকারের চায়ের মতো কড়া জীবন। কোনও ফঁ্যাসফোঁস নয়, একেবারে বাঘা থাবা। আমি যা চাই, ভগবান আমাকে তাই দিয়েছেন। আহা ঈশ্বর পরম করুণাময়। পরেশদা দুটো হাত মাথার ওপর তুলে আকাশের স্লেটে তাঁর এই বার্তাটা লিখতে চাইলেন। ডানহাতে বেশ একটা মোটা লোহার বালা।
