দাঁড়িয়েই আছি। একসময় জঁদরেল অফিসারকে নিয়ে জিপটা চলে গেল। ছেলে দুটোর সব কাগজ আবার রাস্তার বস্তায় ঢুকে গেল। দুজনে এক পক্কড় ইয়ারকি মারামারি করে, বস্তা কাঁধে সরে পড়ল ডাইনে বামে থুতু ছেটাতে ছেটাতে। আমি দাঁড়িয়েই আছি। দিনের আলো নিবে গেল। রাস্তার আলো জ্বলে উঠল পটপট। হাঁকছে মালাই, হাঁকছে ঘুঘনি। রাতের চরিত্ররা সব বেরিয়ে পড়েছে। ঠুনঠুন রিকশা। দাঁড়িয়েই আছি। মুকুর পাত্তা নেই। একবার মনে হল, যা থাকে বরাতে, নিজের পরিচয় দিয়ে ভেতরে ঢুকে সুপারকে জিজ্ঞেস করি। হঠাৎ মাথায় খেলে গেল, আচ্ছা জিপটা মুকুর কারণেই আসেনি তো! কাল বিকেল থেকে মেয়েটা হস্টেলে নেই। কোনও খবরও দেয়নি। আমার আর সাহসে কুলেল না। হস্টেলের ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে। একটা ছেলে ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা ঠায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কারও কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি, সব মেয়েই ঢুকছে একজনও বেরোচ্ছে না, যে ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করব। ভেতরের নাটক ছেড়ে কেউই বেরোতে চাইছে না।
আর কাহাতক দাঁড়ানো যায়! উদভ্রান্তর মতো আমি বাড়ির পথ ধরলুম। একা দোকানের সামনে এসে একজনকে ফোন করতে দেখে মনে হল, হস্টেলে একটা ফোন করলেও হয়। বলতেও তো পারি, আমি মুকুলিকার দাদা বলছি। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন হবে, কেমন দাদা? দাবড়ানি খেয়ে ফোন ফেলে দিতে হবে।
এত ফঁকা লাগছে নিজেকে! এককথায় জীবনটা অর্থশূন্য হয়ে গেল। এত বছর বেঁচে আছি এমন নিঃসঙ্গ নিজেকে কখনও মনে হয়নি। মধ্যরাতের নির্জন রাজপথে একাকী একটা ষাঁড়ের মতো মনে হচ্ছে নিজেকে। কোথাও কোনও যাবার জায়গা নেই। কথা বলার মতো কোনও লোক নেই। দু’চারজন বন্ধুবান্ধব সব বিদেশে। আত্মীয়স্বজনের বালাই নেই। পাড়ায় ঢুকব, বলা যায় না মেনির সাপোর্টাররা বদলা নেবার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে কি না! বিষ্টুদার বাড়িতে কথায় কথায় যাওয়া যায় না। লজ্জা করে। বউদি ভাববেন, টিপের সঙ্গে ভাব জমাতে এসেছি। আবোল-তাবোল কীই বা বকব, মনের সে অবস্থা নেই। নিজের বাড়িতে ঢুকতে ইচ্ছে করছে না। নিরানন্দ পুরী। ভীষণ বিষণ্ণতা আসবে।
সামনেই ঠনঠনের কালীবাড়ি। আরতি হচ্ছে। পঁড়িয়ে গেলুম একপাশে। আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক ভদ্রলোক। ফিনফিনে পাঞ্জাবি, কোঁচানো মিহি ধুতি। সরু গোঁফ। আরতি চলছে। ভদ্রলোক হঠাৎ আমার হাতে মৃদু একটা চাপ দিলেন। আমি তাকালুম। ভদ্রলোক হাসলেন। চিনতে পারলুম না।
ফিসফিস করে বললেন, চিনতে পারছ না?
আজ্ঞে না?
মনে করার চেষ্টা করো।
আরতির বাজনা দ্রুত চলেছে। পুরোহিতের চামর দ্রুত লয়ে দুলছে। দেখছি আর ভাবছি। হঠাৎ দেখি ভদ্রলোক অদৃশ্য। আরতি শেষ। ভক্ত কণ্ঠের মা মা চিৎকার। প্রণাম করে, সামনেই যে ট্রাম পেলুম উঠে বসলুম। ভাড়া দেবার জন্যে পকেটে হাত দিলুম। ফাঁকা। মালমশলা সব উধাও।
২.০৮ রক্ষা করো হে
সামনেই ট্রামের কনডাক্টর হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। শূন্য পকেট থেকে আমার নিরালম্ব হাত বের করে তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমি হাহা করে হেসে উঠলুম। এমন মুক্ত হাসি বহুকাল আমার গলা ছেড়ে বেরোয়নি।
ভদ্রলোক অবাক হয়ে বললেন, কী হল?
একজন সহযাত্রী বাঁকা মন্তব্য করলেন, ঢিলে হয়ে গেছে। ভাড়া দেবার সময় অনেকের এমন হয়।
আমি পাত্তা না দিয়ে বললুম, কেল্লা মার দিয়া।
দরজার দিকে এগিয়ে গেলুম। ভাড়া যখন দিতে পারব না, তখন নেমে যাই। ভদ্রলোক আমার হাত চেপে ধরে বললেন, মেরে দিয়েছে তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ। একেবারে ক্লিয়ার।
ভদ্রলোক রসিক। বললেন, কোষ্ঠ সাফ! উঠলেন তো ঠনঠনিয়া থেকে। কালীবাড়ি গিয়েছিলেন বুঝি!
আজ্ঞে হ্যাঁ।
টাকা মাটি, মাটি টাকা। তা নামছেন কেন? বসুন। ভাড়া দিতে হবে না। শ্যামবাজারেই বাড়ি?
তা হলে তো ভাবনা ছিল না। মাইল চারেক আরও যেতে হবে।
বাসে চড়তে হবে। এই নিন একটা টাকা রাখুন।
হতভম্ব হয়ে গেলুম। এমন হৃদয়বান মানুষ এখনও পৃথিবীতে আছেন। প্রায় তোতলা হয়ে গেছি, আপনি আমাকে ভাড়া দিচ্ছেন! আমি শোধ করব কীভাবে!
খুব সহজভাবে। কাল কালীবাড়িতে প্রণামী দিয়ে দেবেন এক টাকা।
যে-ভদ্রলোক একটু আগে ব্যঙ্গ করেছিলেন, তিনি বললেন, আরে ভাই যা পাওয়া যায় নিয়ে রাখো না।
লোকটির দিকে এইবার তাকাবার সুযোগ হল। নিখুঁত বাঙালি! সেই দাঁত-বের করা বোকাবোকা হাসি। সবজান্তা ভঙ্গি। সন্দেহপ্রবণ। তেলচকচকে মুখ। কনডাক্টর ভদ্রলোক সোজা তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, টিকিট?
ভদ্রলোক বললেন, মান্থলি।
দেখান।
বুকপকেটে দু’আঙুল ঢুকিয়ে কী একটা তোলার ভঙ্গি করলেন। বেরোল না কিছুই।
কনডাক্টর এইবার ধমকের সুরে বললেন, নকশা ছেড়ে টিকিটটা দেখান।
হোয়াট ডু ইউ মিন?
বাঙালির মুখে ইংরেজি বেরোলেই বুঝতে হবে, ডাল মে কুছ কালা।
জানো আমি বোনাফাইড প্যাসেঞ্জার।
প্রথমে আপনি বলতে শিখুন, তারপর টিকিটটা কেটে বোনাফাইড প্যাসেঞ্জার হন। এমন বোনাফাইড প্যাসেঞ্জার আমরা সারাদিনে শয়ে শয়ে দেখছি।
আমি কমপ্লেন করব অথরিটির কাছে। হোয়াট ইজ ইয়োর নাম্বার?
এই যে আমার বুকে। পয়সা ছাড়ুন।
ভদ্রলোক একটা দশ টাকার নোট বের করলেন। খুব গোলমেলে লোক। গুরুদেব টাইপের। ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতো। কনডাক্টর বললেন, খুচরো দিন। দশ টাকার নোটের ভাঙানি হয় না। আপনার মাথার ওপর নোটিশটা পড়ুন।
