তার মানে তুমি আমাকেও ঘৃণা করো?
চুপ! আমার কথা এখনও শেষ হয়নি। আমি আগে শেষ করি। আমার বাবা আমাদের দু’বোনের জন্যে যথেষ্ট করলেন। লেখাপড়া শেখালেন। কিন্তু তোমার বাবার মতো আমার বাবার জীবনে কোনও ত্যাগ নেই, কোনও আদর্শ নেই। এই বয়সেও নারীসঙ্গের জন্য লালায়িত। আমাদের সমালোচনায় কান দেননি। মায়ের স্মৃতি মুছে ফেলেছেন মন থেকে। কথায় কথায় বলবেন, জীবনের ব্যাপারে আমি একজন পাকা ইংরেজ। আমার আদর্শ চুটিয়ে বাঁচো, মরে যাও। সবারই শেষ একমুঠো ছাই। ফুঁ দিলে উড়ে যাবে। কিছু মনে কোরো না, আমার বাবাকে দেখলে মনে হয়, এক বৃদ্ধ পশু। তোমার বাবাকে দেখে আমার আবার বিশ্বাস ফিরে এল। মনে হল মানুষও দেবতা হতে পারে। আমি প্রেমে পড়ে গেলুম। সে এক অদ্ভুত প্রেম। মেয়ে, স্ত্রী, বন্ধু, মা সব মিলিয়ে একটা ব্যাপার তৈরি হল। তখনই মনে হল, এই মানুষটিকেই আমার জীবনের ধ্রুবতারা করব। শিবের সংসারকে গৌরী হয়ে সাজাব। তোমার সমস্ত ন্যাকামি তছনছ করে তোমাকেও তোমার বাবার মতো করব কুছ নেহি হ্যায় তো থোড়া থোড়া। অন্তত কুড়িটা ছেলে আমার জন্যে হাঁ হাঁ করে আছে। তাদের মধ্যে একজন অধ্যাপকও আছেন। বেশ বুঝতে পারি সবক’টা দেওয়ালি পোকা। চরিত্রের কোনও জোর নেই। অধ্যাপকের আবার বউ আছে। সবকটা এমন হ্যাংলার মতো ভাব করে, পা থেকে মাথা অবদি জ্বলে যায়। একমাত্র তোমার মধ্যে তোমার বাবার গুণ কিছুটা খুঁজে পেয়েছি। তোমাকে এইসময় ধরতে পারলে আমি একজন মানুষ পাব। তোমাকে একটু টেম্পার করে নিতে হবে। বেশ করে তাতে আর পেটাতে হবে। লোহা থেকে তৈরি করতে হবে স্টিল। এও এক ধরনের ভালবাসা। দায়িত্বপূর্ণ। ভালবাসা। মেসোমশাই ফিরে এসে যেন বলতে না পারেন, আমার ছেলেটাকে কেউ দেখেনি। এই দায়িত্ব কেউ আমাকে দেয়নি, আমি নিজেই তুলে নিয়েছি কাঁধে।
মুকু মুখ নিচু করে ঘাসের ওপর হাত বোলাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি তার মুখের দিকে। পাতার ফাঁক দিয়ে পড়ন্তবেলার রোদ এসে পড়েছে তার রেশম চিক্কণ চুলে। আমার আর বলার কিছু নেই। আমার মাতামহের কণ্ঠে শোনা একটি গানের কলি হয়ে গেছি আমি, দিয়েছ তুমি অনেক দিয়েছ/অযাচিত তব দান/বুঝিনি মহিমা দিইনি মূল্য/তবু দান অফুরান/কত করুণার কণিকা ঝরিয়ে/ নিতি মমতায় রেখেছ জড়িয়ে/ অযতনে আমি ফেলেছি ছড়িয়ে করোনি তো অভিমান ॥ আমার এই প্রবল দুর্দিনে ভগবানের এ কী করুণা! আমার মতো একটা মর্কটকে এইভাবে কেউ ভালবাসতে পারে, এই বিশ্বাসটাই আমার ছিল না। সেই ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছি সকলেই আমাকে এলেবেলে ভাবে। খেলার মাঠে যখন টিম তৈরি হত, দু’পক্ষই বলত ও হল এলেবেলে। সেই এলেবেলেকে শিক্ষিতা ডাকসাইটে সুন্দরী এক মেয়ে ভালবেসেছে। প্রেমের আদিখ্যেতা নয়, অভিভাবিকা হতে চাইছে। গভীর একটা ভাবনা রয়েছে আমাকে ঘিরে।
মুকু চোখ তুলে তাকাল। চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। বিশ্বাস করো, আমার অনেক জায়গা আছে যাবার, কিন্তু কোথাও যেতে মন চায় না। আমি মানিয়ে নিতে পারব না। কিন্তু তোমাকে পারব। তোমার ভেতর একটা শিশু আছে, যে কোনওদিন বুড়ো হবে না। তোমার ওই অবিষয়ী ভাবালু ভাবটাকে আমি ভালবেসে ফেলেছি। ভালবেসে ফেলেছি তোমাদের সাত্ত্বিক সংসারটাকে।
তোমার মতে আমার তা হলে কী করা উচিত মুকু? তুমি দু’বার দুরকমের পরামর্শ দিলে। একবার বললে, চাকরি ছাড়তে হয় ছাড়বে। এখানেই থাকবে। সব টিপটপ করে সাজিয়ে অপেক্ষা করবে, তিনি আসবেন। এই মুহূর্তে বলছ দেরাদুনে যেতে হবে।
এটা হচ্ছে আমার দ্বিতীয় চিন্তা। একরোখা অভিমানী মানুষ। নিজে তিনি ফিরবেন বলে মনে হয় না। তাকে ফেরাতে হবে। ধরে আনতে হবে। পাহাড়েই তিনি গেছেন। দেরাদুনে থেকে সন্ধান করা সহজ হবে। সামনেই আসছে কুম্ভমেলা। সেই বিশাল জমায়েতে আমরা তন্নতন্ন করে খুঁজব।
বেশ, তা হলে তাই হোক। কাল আবার আসব। এখন চলো, তোমার হস্টেলে যাই।
পার্ক থেকে বেরিয়ে আমরা একটা ট্রামে উঠে পড়লুম। হস্টেলের সামনে এসে আমরা একটু অবাক হয়ে গেলুম। পুলিশের একটা জিপ দাঁড়িয়ে আছে। আছে আছে, আমরা তেমন গ্রাহ্য করলুম না। মন একমুখী হয়ে আছে। অন্য কোনও ভাবনা ঢুকছে না মাথায়। একটাই চিন্তা, আমাদের যেতে হবে। মালপত্র গোছগাছ করে আমরা বেরিয়ে পড়ব।
মুকু বলল, তুমি বাইরে অপেক্ষা করো। যখন বলব তখন একটা ট্যাক্সি ডাকবে।
মুকু চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে আছি বাইরে। সামনেই জিপগাড়িটা। নিরেট এক ব্যক্তিত্ব। দেখলেই ভয়ভয় করে। হস্টেলের অফিসঘরটা গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে। মনে হল ঘরের মধ্যে অনেক মেয়ের জটলা। একজন ভারিক্কি মহিলার তর্জন-গর্জন কানে আসছে। ঠিক বুঝতে পারছি না অশান্তিটা কীসের? কোনও মেয়ে কি আত্মহত্যা করেছে? চুরি হয়েছে? মেয়েরা মারামারি করেছে নিজেদের মধ্যে? কিছু একটা হয়েছে। পুলিশ অফিসারের ইউনিফর্ম চোখে পড়ছে। মেয়েদের হস্টেল। একেবারে সামনে দাঁড়ানো ঠিক হবে না। একটু দূরে সরে গেলুম। যারা কাগজ কুড়োয়, এইরকম দুটো ছেলে বস্তা থেকে ফুটপাথে সমস্ত কাগজ উজাড় করে কী যেন বাছাবাছি করছে। ভীষণ ব্যস্ত তারা। দিন শেষ হয়ে আসছে। হস্টেলের ভেতর বিশাল দেবদারু। এক ঝাক পাখি চুটিয়ে কলরব করছে। জায়গাটা নিরাপদ বলেই মনে হল। পুলিশের এক বড়কর্তা এসেছেন, তাঁর নির্দেশে ইভ টিজারদের আর রকবাজদের আচমকা খুব ধরা হচ্ছে। কোনও কথা নয়, ধরো আর ভ্যানে তোলো। হস্টেলের ভেতর পুলিশ ঢুকে আছে। বলা যায় না বেরিয়েই আমাকে দেখলে হয়তো চ্যালেঞ্জ করবেন। এ ব্যাপারে আমি বেশ ভিতু। মুকুকে নিয়ে যতক্ষণ আমি পার্কে বসে ছিলুম, কেবলই ভাবছিলুম, এই বুঝি কেউ এসে বলে, অ্যায় কী হচ্ছে। দাঁড়িয়ে পঁড়িয়ে এমন একটা মুখ করে কাগজ বাছাই দেখতে লাগলুম, যেন আমারই কাগজ। আমারই জীবনের ঘেঁড়া পাণ্ডুলিপি। ছেলে দুটোর চারটে কথার তিনটেই খিস্তি। খিস্তির লে নেওয়াও চলতে লাগল। কতরকমের গালাগাল যে আছে!
