গুটিগুটি এগিয়ে গিয়ে আমরা দু’জনে অদূরের একটা ছোট পার্কে বসলুম। ছোট হলেও মনোরম। গোটা তিনেক বিশাল গাছ। তিনকোনা সবুজ ঘাসের কার্পেট। দু-একটা খালি ঠোঙা, আইসক্রিমের কাপ, ঝরাপাতা, সিগারেটের টুকরো ছড়িয়ে আছে। একটা সুন্দর রুমাল পড়ে আছে। কেউ পেতে বসেছিলেন, তুলতে ভুলে গেছেন। আমরা একটা আড়াল দেখে পাশাপাশি বসে পড়লুম। বসেই মনে হল শুয়ে পড়ি, এত ক্লান্ত। কিছু না করেই ক্লান্ত। শরীর হল মনের খেলা। মন গেল তো সব গেল।
মুকু তার ফরসা ফরসা হাতদুটো দিয়ে আমার ডান হাতটা খপ করে চেপে ধরল। ফরসা। দুধের মতো। অনামিকায় রক্তলাল একটা রুবি। যেন ডালিমের দানা। সিল্কের মতো শরীরের ত্বক। টানটান হয়ে আছে। হাতের কোথাও একটা রোম নেই। শাড়ির তলা দিয়ে পা দুটো বেরিয়ে আছে। মোমের মতো গোড়ালি। পায়ের আঙুল যেন মোচার কলি। ভগবানের নিজের হাতের ভাস্কর্য। এমন। কিছু দেখলে আমার ইচ্ছে করে পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়তে। কে বড়, কে ছোট, সে বিচার আর থাকে না। মনে হয় হেরে গেছি, পরাজিত আমি। ঈশ্বরের আর্ট গ্যালারির মেঝেতে আমি ছিঁড়ে পড়ে আছি। পুরনো চার চরণ কবিতা মনে পড়ে যায়:
যে হৃদে আছিল শোভা কত অমরার,
অমরী আসিত যেথা ছুটে বার বার
তুমি নারী, মৃদু হেসে, আঁখি-কোণে চেয়ে
নিলে অনায়াসে লুটে সে হৃদি আমার?
আমার হাত ছেড়ে দিয়ে মুকু একটা গাছের ভাঙা ডাল কুড়িয়ে নিয়ে বঁটার মতো ঘাসের ওপর বোলাল কিছুক্ষণ। মুখটা নিচু করে আছে। কপালের ওপর চুল ঝুলছে কয়েক গুছি। হঠাৎ মুখ তুলে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল। অসাধারণ সেই হাসি! যেন পাথরে চিড় ধরল। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলুম কিছুক্ষণ। এ কেমন মেয়ে! এই বকছে, এই ধমকাচ্ছে, এই হাসছে।
মুকু গাছের ডালটাকে কোলের ওপর শুইয়ে, বেশ গুছিয়ে বসে বললে, আমাদের সংসারটা ভেঙেছে আমার বাবার ভুলের জন্য, একগুঁয়েমির জন্য। যুদ্ধ যখন বাধল, তখন বার্মা থেকে সবাই পালাতে লাগলেন। আমার একগুঁয়ে বাবা শেষ দিন পর্যন্ত পড়ে রইলেন মাটি কামড়ে। সময়ে পালালে কিছু সঙ্গে নিতে পারতেন। ট্রান্সপোর্ট পেতেন। শেষে কী হল? হাঁটাপথে রওনা দিতে হল। রেঙ্গুনের জেল খুলে দিয়েছে। যত চোর গুন্ডা, বদমাশ, উন্মাদ ছাড়া পেয়ে সারা শহরে তাণ্ডব করে বেড়াচ্ছে। দোকানের পর দোকান লুঠ করছে। শেষে আমাদের পাশের বাড়ির এক বউকে রাতের বেলা বাড়ি চড়াও হয়ে নৃশংসভাবে রেপ করে মেরে ফেললে। তখন আমার বাবার টনক নড়ল। পরের রাতেই আমাদের টার্গেট করত। আমরা পেগুর পথ ধরলুম। সেখান থেকে প্রোম। শ দুই মাইল। ভাবতে পারো? হাঁটছি তো হাঁটছিই। প্রোম থেকে মান্দালয়। কাতারে কাতারে মানুষ চলেছে। এমনি তবুও হাঁটা যায়, সঙ্গে বোঁচকাকুঁচকি। পথের ধারে মৃতদেহ পড়ে পচে ফুলে ঢোল হয়ে আছে। কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। কারও বাবা, কারও মা, কারও মেয়ে। অসুস্থ হয়ে কেউ পড়ে আছে, আর হাঁটতে পারছে না। কে থামবে তার জন্যে! সবাই পালাচ্ছে। টাকার কোনও দাম নেই। হোটেল আছে জায়গা নেই। জল নেই, খাবার নেই। লাখোপতি, কোটিপতি হন্যে হয়ে ঘুরছে। টাকা হয়ে গেছে কাগজ। প্রোমে শুরু হয়ে গেছে কলেরা। আমরা যখন আর হাঁটতে পারছি না, তখন বসে পড়ছি রাস্তার ধারে খোলা আকাশের নীচে। পাশেই হয়তো পড়ে আছে কেউ, মারা গেছে কলেরায়। কোনওরকমে মান্দালয়ে গিয়ে পৌঁছেলুম। মায়ের অবস্থা তখন খুবই খারাপ। প্রোম থেকে মান্দালয় পাঁচশো মাইল। তুমি ভাবতে পারো? দূরত্ব ভাবলেই মাথা ঘুরে যায়। কোথাও কোনও সাহায্য নেই। কেউ কারওকে সাহায্য করবে না। মান্দালয়ের পথে আমার মা মারা গেলেন। জঙ্গলের গভীরে একটা জায়গায় দুটো গাছের মাঝখানে কিছু মাটি গাছের ডাল দিয়ে উসকে মাকে শুইয়ে দেওয়া হল। প্রথমে চিত করে শোয়ানো হল। বাবা বললেন, না না, অমন সুন্দর মুখ জন্তুজানোয়ারে খেয়ে যাবে। উপুড় করে শোয়াই। মাকে উপুড় করে দেওয়া হল। মা শুয়ে আছেন ঝুরো ঝুরো মাটির ওপর। চারপাশ দিয়ে চলে গেছে ইলিবিলি গাছের শিকড়। মচমচে গাছের পাতা। আমি আর দিদি গাছের পাতা জড়ো করে মাকে চাপা দিচ্ছি। কিছু শুকনো কিছু ভিজে দলা পাকানো। আস্তে আস্তে তলিয়ে গেলেন পাতার স্তূপে। একসময় বাবা বললেন, চলো, আর তো কিছু করার নেই। সামনে অনন্ত পথ। আমাদের তখন এমন অবস্থা কঁদতেও ভুলে গেছি। খাওয়া নেই, দাওয়া নেই, চান নেই। পশুর মতো অবস্থা। আমার কেবল মনে হচ্ছে, আমিও শুয়ে পড়ি মায়ের পাশে। মাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে যেমন শুয়ে থাকতুম রেঙ্গুনে আমাদের বাড়ির খাটে। মান্দালয় থেকে ভারত কমসে কম দেড় হাজার মাইল। পথ আরও সাংঘাতিক। একের পর এক খরস্রোতা পাহাড়ি নদী, ইরাবতী, চিড়ুইন। ঠিক হল আমরা কোনওরকমে ইরাবতী পেরিয়ে, আরাকান আকিয়াব হয়ে চট্টগ্রামে ঢুকব। এমন কোনও অখাদ্য নেই যা আমাদের খেতে হয়নি। কুমিরের মাংসও খেয়েছি। এমন একটা ভয়ংকর অভিজ্ঞতার পরেও বাবার কিন্তু সংসারে বিতৃষ্ণা এল না। মনকে দিয়ে বলাতে পারলেন না, কী ছার সংসার! উলটে বললেন, এই তো সংসার! ভোগ আর দুর্ভোগ এ ছাড়া সংসারে নেই কিছু। আমার কিন্তু শিক্ষাটা হয়ে গেল অন্যরকম। আর কোনওদিন সেই মান্দালয়ের জঙ্গলে যেতে পারব না। পাতার স্তূপ সরিয়ে দেখতে পারব না, কোনও কঙ্কাল শুয়ে আছে কি না চিরনিদ্রায়? আমার মা। আমি দেখেছিলুম, মৃত্যুর সেই মহোৎসবেও পশু মানবের নারীমাংস-লালসা। মৃতদেহের পাশে মানুষের মৈথুন। সবসময় ভিক্টিম হয়েছে মেয়েরা। দিদি আমার চেয়েও বড়। ঘোরতর সুন্দরী। আরাকানের পথে বাবা তার সারাগায়ে কাদামাটি মাখিয়ে দিলেন রূপ চাপা দেবার জন্যে। পরিয়ে দিলেন একটা ঢোলা শার্ট, যাতে দেহের আকর্ষণ চাপা পড়ে থাকে। সেই থেকে পুরুষজাতের ওপর আমার প্রবল ঘৃণা।
