তা হয়তো ঠিক, ধূর্ত এবং ভীরু। তোমার গালাগালের যোগ্য। তুমি ভীষণ কড়া কড়া কথা বলল।
তুমি বলাও।
যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম সেটা হল, মেয়েরা রাখি বাঁধে জানো তো, দাদা দিয়েই প্রেমের শুরু। অনেক দাদাই শেষে স্বামী হয়। এই কেসটাও সেই কেস।
আমি এতক্ষণ ধরে কী ভাবলুম জানো, তোমার একজন বোনেরই দরকার, বউ নয়। বোন অনেক পবিত্র। আমি ওপর-পড়া হয়ে তোমার জীবন দখল করতে চেয়েছিলুম, সেটা ঠিক হবে না। তোমার চরিত্রটা বড় এলানো।
আমি তা মনে করি না।
আমার তাই মনে হয়।
আমার আসল দিকটা তুমি দেখোনি। দেখলে তোমার সিদ্ধান্ত পালটাতে।
সেই দিকটা কী? তোমার সবই তো তালগোল পাকাননা। এই তো দেরাদুনের সুযোগটা হারালে। আর একজন যাবেন তোমার জায়গায়। তুমি কলকাতায় বসে বসে বোন আর বাড়ি আগলাবে। সুযোগ বারেবারে আসে না।
প্রথমে তো তাই ঠিক হল। মাঝখান থেকে বিপুলবাবু ঢুকে সব গোলমাল করে দিলেন তোমাকে বোন বলে পরিচয় করিয়ে দিয়ে। বাড়িটার একটা ব্যবস্থা হয়েই গিয়েছিল।
তুমি তো বলতে পারতে, আমি হস্টেলে থাকি।
তা কী করে হয়! বাড়ি ছেড়ে বোন খামোখা কেন হস্টেলে থাকবে, কোন যুক্তিতে?
তুমি তো ব্যাপারটা এক্সপ্লেন করতে পারতে, মায়ের পেটের বোন নয়, মাসতুতো বোন।
তা হলে কী ভাবতেন? ভাবতেন, বাবা নেই, মাসতুতো বোনকে হস্টেল থেকে এনে কী না কী করছে!
আমার কী মনে হচ্ছে জানো, এটা রাস্তা না হলে ঠাস করে তোমাকে এক চড় কষাতুম। একেবারে পারফেক্ট জানোয়ারের মতো কথা। তোমার নোংরা ভাবনাটা অন্যের ঘাড়ে চাপাতে চাও? একজন সুন্দর শিক্ষিত মানুষ কেন এমন ভাববেন? ছেলেবেলা থেকে কিছু গ্রাম্য মহিলার মধ্যে থেকে তোমার এই অবস্থা হয়েছে। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে মানেই উঁহুঁ হুঁহু! ভাশুর, ভাদ্দরবউ, বউদি, ঠাকুরপো, তুতো বোন, তুতো ভাই, যেখানে যত আছে সব ব্যভিচার করে বেড়াচ্ছে। একে বলে ঝিয়ে-সাইকোলজি। তোমার উচিত, তোমাদের ওই প্রাগৈতিহাসিক বাড়ি ছেড়ে বৃহৎ বিশ্বে নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়া। তোমার মনে নোনা ধরেছে।
মুকু ছিটকে আমার থেকে বেশ কিছুটা দূরে সরে গেল। রেগে গেলে মুকুর মুখচোখ লাল হয়ে ওঠে। চলন-বলন সবই তড়বড়ে হয়ে যায়। কাকড়াবিছের মতো খড়খড় করতে থাকে। প্রকাশ্য রাজপথে সিন ক্রিয়েট করার ইচ্ছে আমার নেই। ইতিমধ্যেই লোকজন তাকাতে শুরু করেছে। নীরবে বাকি পথটুকু হেঁটে আমরা ট্রাম স্টপেজে এসে গেলুম। মুকু একটা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়েছে, যেন আমাকে চেনেই না। মধ্যদিনের আলোয় তাকে ভীষণ মায়াবী লাগছে। পানের মতো মুখ। ফুরফুরে চুল। ফরসা দেহত্বক রাতের সমুদ্রের ফেনার মতো জ্বলছে। ভীষণ একটা ভালবাসায় ক্রমশই আমি উতলা হয়ে উঠছি। আমার সমস্ত সমস্যা টমস্যা ভেসে বেরিয়ে যেতে চাইছে। বেশ বুঝতে পারছি মুকুকে ছাড়া আমার চলবে না।
মুকু হঠাৎ আমার কাছে সরে এসে বললে, শোনো, আমি তোমার বোনটোন হতে পারব না। ওসব আদিখ্যেতা আমার সহ্য হবে না। আমি তোমার মতো পাপ করতে পারব না। মুখে বলব এক, কাজে করব আর এক, আমার দ্বারা তা হবে না। তুমি চলো।
কোথায় যাব?
তোমার ওই এম ডি-র কাছে। এইবার যা বলবার আমি বলব।
বেশ ভয় পেয়ে গেলুম, কী বলবে?
বলব, মশাই! আসল ব্যাপারটা হল, আমি বোনটোন নই। ও ওইরকম বলতে হয় বলছে। সাধুপুরুষ সাজবার জন্যে। মায়ের বোন মাসি হয় ঠিকই। একই রক্ত। আমি ওর জ্যাঠাইমার বোনের মেয়ে। তার মানে ঘোড়ার ডিম। আমি ভালবাসি। আজ বাদে কাল বিয়ে করব। স্বামী-স্ত্রী সীমানায় পঁড়িয়ে আছি। আমরা দুজনেই দেরাদুনে যাব। চলো চলো। আর দেরি নয়।
দেরাদুনে যাবার প্রয়োজন নেই মুকু। কলকাতাতেই বেশ থাকা যাবে। তা ছাড়া তুমি যদি চাকরিটা পেয়ে যাও, তা হলে দুজনের রোজগারে রাজার হালে।
ও! এখন থেকেই তুমি আমার রোজগারের আশায় আছ! তা ভাল।
আমি ঠিক অতটা লোভী নয় মুকু। তোমার রোজগারের আশা আমি করি না। আমার একার। রোজগারেই দু’জনের সংসার বেশ ভাল চলে যাবে। আমি তোমাকে ভালবাসি।
ভালবাসো? বাবা, এ যেন ভূতের মুখে রামনাম। শোনো, ওসবে আমি ভুলছি না। তোমাদের ওই বিশ্রী পাড়া ছেড়ে চিরকালের জন্যে প্রবাসী হতে হবে। হিমালয়ের কোলে হলে তো কথাই নেই। চলো চলল।
আমাদের সামনে দিয়ে সাদা রঙের বিলিতি একটা গাড়ি বেরিয়ে গেল। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললুম। পেছনের আসনে বসে আছেন এম ডি। কী একটা পড়ছেন গভীর মনোযোগে। আমি বললুম, ওই দেখো এম ডি বেরিয়ে গেলেন। আজ আর কোনও কথা হবে না। চেম্বার অফ কমার্সে ওঁর মিটিং আছে।
তাতে তোমার আনন্দে নাচার কোনও কারণ নেই। কাল আমি আসব। এসে সমস্ত পরিস্থিতিটা নিজে বুঝিয়ে বলব। আমি কে, তুমি কে, আমরা ভবিষ্যতে কী হব! তোমার কি মনে হয় আমি ইয়ারকি করার জন্যে ওই মুল্লুক থেকে এই মুলুকে এসেছি। আমার একটা পরিকল্পনা আছে। পরিকল্পনাটা শুনবে?
ট্রাম আসছে।
আসুক। আসবে, থামবে, চলে যাবে, আবার আসবে। ট্রামের অভাব নেই। পরের ট্রামে যাব। না হয় তারও পরের ট্রামে।
কিন্তু এই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে কঁহাতক আর তর্কাতর্কি করা যায়, তুমিই বলো?
চলো, তা হলে এই পার্কে গিয়ে বসি। ফাঁকা জায়গায় বসে মন দিয়ে আমার পরিকল্পনাটা তোমার শোনা উচিত।
