ও হ্যাঁ, তুমি কনক। কনক কাঞ্চন।
আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, কাঞ্চন সাধারণত ছেলেদেরই নাম হয়।
দ্যাট আই নো। কনক মানে কী?
সোনা।
কাঞ্চন মানে কী?
সোনা।
তা হলে? আমার ভুলটা দেখলে কোথায়? আমি ওকে স্বর্ণ বলে ডাকতে পারি, সোনা বলে ডাকতে পারি। একই মানে। রোজ সকালে কয়েক পাতা করে অমরকোষটা মুখস্থ করো। তাতে তোমার ওই বোকা-বোকা ভাবটা কিঞ্চিৎ কেটে যাবে।
উঃ, কী থেকে কী হয়ে গেল! দু’জনেই অপ্রস্তুত। গাধার মতো দাঁড়িয়ে ঘা চাটছি। কনকের কিন্তু সাহস কম নয়। পরিস্থিতি একটু থিতোতেই প্রশ্ন করল, আপনারা রাতে কী খান জানতে পারলেই ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে সব তৈরি হয়ে যাবে। আমরা যে কদিন আছি, আপনাকে আর রান্নাবান্না নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না।
খুব ভাল কথা। আমি কিন্তু তা হতে দেব না। আমার অভ্যাস নষ্ট হয়ে যাবে। তোমরা চলে যাবার পর বিপদে পড়ে যাব।
আপনি কী বলছেন মেসোমশাই। জ্ঞানী মানুষের কখনও অভ্যাসের দাস হওয়া উচিত নয়।
উঃ, শাবাশ। ভয়ে চোখ আর দম দুটোই বন্ধ। বোমের পলতেয় আগুন পড়েছে। দেখতে পাচ্ছি ফিচির ফিচির ফুলকি ছাড়তে ছাড়তে এগোচ্ছে। ফাটল বলে। মৃদু হাসির শব্দে চোখ খুলে গেল। বোমা ফাটল না। কনকের মেসোমশাই হাসছেন। মেয়েদের কী মহিমা রে! আগুনে আগুন নেই। তাপে তাপ নেই। জলে জল নেই। আমার মায়া! বিকেলে যখন চটকাঁচটকি করছিল, শরীরে উত্তাপ দেখে মনে হয়েছিল, ম্যালেরিয়া। তুমি কাপছ। তোমার জ্বর। কুইনিন খাও।
আজ্ঞে না গর্দভ। মেয়েদের আর বেড়ালের তাপ একটু বেশিই হয়। বুড়ি হয়ে বৃন্দাবনে গেলে তবেই এ জ্বর ছাড়বে।
আবার সেই মায়া? মায়ায় মজেছে মন। ভালই গাও, মজল আমার মনভ্রমরা শ্যামাপদ নীল কমলে। শ্যামামাকে আর কষ্ট দিয়ো না। মন টোল খেয়েছে, টাল খেয়েছে। শ্যামা কেটে মায়া। বসাও।
পিতা বললেন, হেরে গেলুম তোমার কাছে।
এ যেন নিমাইয়ের কাছে রঘুনাথ শিরোমণির হার। হারতেই হবে। অতবড় একটা কাবুলিকে ছোট্ট মেয়ে মিনি নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছিল। মুঠো মুঠো কিসমিস, আখরোট, মনাক্কা, খুবানি। ঝুলি থেকে বেরোচ্ছে তত বেরোচ্ছেই। কনক হাসতে হাসতে বললে, এতে হারজিতের কিছু নেই। মেসোমশাই, মেয়েদের কাজ মেয়েরাই করবে।
তা ঠিক, তা ঠিক। পিতা মাথা নাড়লেন।
কনক কথাটা এমন করুণ করুণ মুখে বললে, যেন কুকুরের কাজ কুকুর করেছে কামড় দিয়েছে। পায়ে। পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্কেই যদি এই কুকুর আর প্রভুর ভাবটা ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তা হলে আর কোনও সমস্যা থাকে না। ন্যাজ নেড়ে নেড়ে ঘুরে যাও।
রাতে তা হলে লুচিই হোক।
তাই হোক, মেসোমশাই। এক হাতে কাঁচের গেলাস, আর এক হাতে তাসের মতো ধরা দুটো বড় নোট।
আপনার তো আবার অম্বল হয়েছে? আই ডোন্ট কেয়ার। সোডিবাইকার্ব ইজ দেয়ার।
তা হলে লুচি হোক, রাতটা নিরামিষেই চলুক, চিনে ঘাস দিয়ে দুধের পায়েস, একটু গোলাপের আতর। মারভ্যালাস!
গেলাসটা মেয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, মেসোমশাই দু’বার গলা ঝেড়ে বললেন, হরিদা, সবার আগে একটা কাজ সেরে নেওয়া যাক, এই দুটো আপাতত আপনার কাছে রাখুন।
মেসোমশাই হাসি-হাসি মুখে গুটিগুটি এগোচ্ছেন। পিতার মুখ ক্রমশই কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। এইবার বোমা ফাটবে।
হোয়াট!
বাতাসের ধাক্কায় মেসোমশাই দুলে উঠলেন। এত জোরে হোয়াট বেরোবে কে আর ভেবেছিল?
আপনি আমাকে টাকা দেখাতে এসেছেন? এত অহংকার! অহংকারং বিমূঢ়াত্মা।
ছি ছি, এ আপনি কী বলছেন হরিদা! এতে আপনি অহংকারের কী দেখলেন?
সেই বোধটুকু থাকলে আপনি ওভাবে টাকার পেখম মেলে বাইজি বাড়ির বাবুর মতো এগিয়ে আসতেন না। আপনি আমার অভিমানে ধাক্কা মেরেছেন। ভাবতেই পারলেন না যে আপনি আমার আত্মীয়। আপনি ক্ষুদ্র, আপনি বীভৎস। আপনার সভ্যতার ঝুলি থেকে হুলো বেরিয়ে পড়েছে।
পিতা ধাপে ধাপে চড়ছেন, মেসোমশাইয়ের কপালের কোচ একটি একটি করে বাড়ছে। প্রতিবাদের জন্যে ঠোঁট নড়ছে, শব্দ বেরোবার ফাঁক মিলছে না। সিনেমা হলের দরজা দিয়ে যখন গলগল করে তোক বেরোতে থাকে তখন ঢোকার লোকেরা একপাশে দাঁড়িয়ে থাকে গা বাঁচিয়ে। যত জোরে হোয়াট দিয়ে শুরু করেছিলেন ততোধিক জোরে একটি হাঁচি দিয়ে মেসোমশাই-নিধন পর্ব শেষ হল।
মেসোমশাই বললেন, আমাকে আপনি ক্ষমা করুন। আমি টাকা দেখাবার জন্যে টাকা দেখাইনি। এই বাজারে তিনজন এক মাস এবেলা ওবেলা খাবে তার একটা খরচ আছে তো! আমি সেই ভেবেই শেয়ার করতে চেয়েছিলুম। আপনি আমার পয়েন্টটা না বুঝেই বেশ কিছু কটু কথা হুড়হুড় করে বলে গেলেন, আপনার যেমন সেন্টিমেন্টে লাগল, আমার তেমনি লাগল প্রেস্টিজে। এ এক ধরনের অপমান।
দুই যোদ্ধার মাঝে কনক এসে দাঁড়াল। এ মেয়ে অ্যানি বেসান্ত কি হেলেন কেলারের দ্বিতীয় সংস্করণ। লেডি উইথ দি ল্যাম্প। কনক বললে, ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। মেসোমশাই, আপনি শান্ত হন। বাবা, আপনি একটু কাঁচা কাজ করে ফেলেছেন।
সমর্থন পেয়ে পিতা আবার লাফিয়ে উঠলেন, তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে। তুমি জিনিসটার কুৎসিত দিকটা ঠিক ধরতে পেরেছ। এটা তো হোটেল নয়, সরাইখানা নয়, পাঞ্জাবির পকেট থেকে কড়কড়ে নোট বের করে নাকের ডগায় ছুঁড়ে দেবেন, এই নিন। এক মাস কেন? আপনারা এখানে এক বছর থাকুন অতিথি হয়ে। আমার কে আছে বিনয়দা। রাজ্যপাট ভেঙে গেছে, সভাসদরা বিদায় নিয়েছে। আপনারা এসেছেন এই তো আমার সৌভাগ্য। বহুদিন পরে গাছের ডালে পাখি এসে বসেছে। কতকগুলো নোংরা কাগজ নেড়ে সুর কেটে দেবেন না। আমার অনুরোধ।
