ফরসা টকটকে মুখ, অনেকটা গ্রিক ভাস্কর্যের মতো। সোনার ফ্রেমের চশমা। ছোট্ট টিকোলো নাক। সর্ব অর্থে সফল একজন মানুষ। মস্ত বড় একজন রাসায়নিক। তাঁর চোখেও জল চিকচিক করছে। কার কথা ভেবে? কোথায় যাবার কথা ভেবে? এত পূর্ণতার মাঝেও রিক্ততা। আমি, আমার, এর নাম অজ্ঞান; তুমি, তোমার, জ্ঞান। আমিই তুমি, তুমিই আমি, এর নাম বিজ্ঞান। এম ডি এই মুহূর্তে সেই বিজ্ঞানী।
হঠাৎ বললেন, তুমি তো গান জানো? এই গানটা গাইতে পারো, গোল ছেড়ে মাল লও বেছে। গোলমালে মাল মিশানো আছে ॥ জানো না মন রাগের কারণ। যেমন বালির সঙ্গে চিনির মিলন। সহস্র বর্ণে মিশেছে। পুরোপুরি কেমিস্ত্রি! কী বলো? ফিলট্রেশন, ডিক্যান্টেশন, ডিস্টিলেশন, অ্যানালিসিস, অ্যাসে, টাইট্রেশন। বিশাল এই হিউম্যান ল্যাবরেটরিতে তিনিই হলেন চিফ কেমিস্ট। আমি কী বলি জানো? আমি তো তোমার পিতার মতোই। একটা ভাল পরামর্শ দোব?
আমি তো আপনার পরামর্শের জন্যেই সব ছেড়ে ছুটে এসেছি।
তুমি দেরাদুনে যাও। বড় কাজের মধ্যে নিজেকে ছেড়ে দাও। আর দেরাদুন হল হিমালয়ান সেন্টার। ওইখান থেকে অনুসন্ধান চালাও হরিদ্বার, ঋষিকেশ, রুদ্রপ্রয়াগ, দেবপ্রয়াগ। তাকে পাওয়ার কাজটা সহজ হবে।
একটাই যে সমস্যা, এখানকার বাড়িতে কে থাকবে!
ওটা কোনও সমস্যাই নয়। অনেক সময় সব সপরিবারে বাইরে বেড়াতে যায়, তখন কী হয়? বাড়ি তালাবন্ধ থাকে। এক মাস, দুমাস।
সব যে ধুলো পড়ে যাবে! চুরির ভয় আছে।
কেন? তোমাদের পাড়া কি তেমন সুবিধের নয়? ধুলোকে ভয় নেই। ঝাড়লেই উড়ে যাবে। ভয় হল চোরের।
একসময় খুব ভাল পাড়া ছিল। এখন আর তেমন নেই।
তা হলে এক কাজ করা যায়। তোমাকে একজন বিশ্বাসী তোক দিতে পারি, কেয়ারটেকারের মতো। ভীষণ বিশ্বাসী মানুষ। আসলে কী জানো, তোমাকে আমি ভীষণ ভালবেসে ফেলেছি। কেন তা বলতে পারব না। তোমার ফিউচার আমি গড়ে দিয়ে যেতে চাই। আমার আর ক’দিন? হরিশঙ্কর চলে গিয়ে আমার দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়ে গেছে। হরিশঙ্করের ছেলে মানে আমার ছেলে। তা ছাড়া আমার ছেলে নেই। একটি মাত্র মেয়ে। আমার মেয়ের সঙ্গে তোমার পরিচয় হয়েছে?
আজ্ঞে না।
শান্তিনিকেতন থেকে এবার এলেই তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দোব। তা হলে তুমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলো। চলে যাও দেরাদুনে। ওখানে নিখিল তোমার অপেক্ষায় আছে। দেখবে কী সুন্দর বাংলো! সামনেই মুসৌরি হিল। পেছনে ফরেস্ট। একটু দূরেই সহস্রধারা। মিলিটারি অ্যাকাডেমি।
আমি তা হলে আসি আজ।
কাল আমাকে জানাবে। রাতটা ভেবে নাও ভাল করে। বেশি ভেবো না। সারেন্ডার করে দাও নিজেকে। ঘটনা মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কৌশল হল নিজেকে ভাসিয়ে রাখা। জীবন অনেকটা নৌকোর মতো, ভাসতে তোমাকে হবেই। হালটা শুধু ধরিয়ে দাও শক্ত হাতে। তার হাতে।
উঠে প্রায় দরজার কাছে চলে এসেছি এমন সময় পাবলিসিটি অফিসার ঢুকলেন। ঢুকেই বললেন, তোমার বোনকে বাইরে বসিয়ে রেখেছ কেন? বেচারা মুখ চুন করে বসে আছে।
এম ডি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, তোমার বোন? তোমার বোন আছে জানতুম না তো? তা হলে তো তোমার দেরাদুন যাওয়া হবে না।
একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেলুম। ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার হওয়া দরকার। এম ডি নিজের ঘর ছেড়ে ভিজিটার্স রুমে বেরিয়ে এসেছেন। মুকু উঠে দাঁড়িয়েছে। সহবত জানা মেয়ে, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। এম ডি তাড়াতাড়ি মুকুর মাথায় হাত রেখে বললেন, বাঃ ভারী সুন্দর মেয়ে তো। কী নাম তোমার মা?
মুকুলিকা।
পাবলিসিটি অফিসার বললেন, আমার একটা সমস্যা মিটে গেছে। একে আমার বিজ্ঞাপনের মডেল করব। মেয়েটি শিক্ষিতা, এম এ পড়ছে। ভাবছি, আপনার অনুমতি নিয়ে ওকে আমার ডিপার্টমেন্টে নিয়ে নোব। ভাইবোন একই সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করবে। বেশ হবে।
এম ডি আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, তা হলে তুমি কলকাতাতেই থাকো। তোমার জায়গায় সুহাসকেই পাঠাই। সেইটাই হবে বেস্ট সলিউশন। আচ্ছা, আমি আর তোমাদের সময় দিতে পারছি না। আমার আবার চেম্বার অব কমার্সে মিটিং আছে। আমি আর মুকু পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম।
২.০৭ প্রেমের হাতে ধরা দেব
রাস্তায় বেরিয়ে এসে বাড়িটার দিকে একবার তাকালুম। কারখানার কালো চিমনি ভসভস করে ছেড়ে চলেছে পিঙ্গল ধোঁয়া। সাবান তৈরি হচ্ছে। গন্ধে চারপাশ আমোদিত। মাথা ঝিমঝিম করছে। একটা যা-তা ব্যাপার হয়ে গেল। যে-রাস্তাটা ধরে হাঁটছি, সেইটা কিছুদুরে গিয়ে পড়েছে ট্রাম আর বাস রাস্তায়। ট্রামের শব্দ কানে আসছে। মুকু আমার পাশে পাশে প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে চলেছে।
মুকুই প্রথমে কথা বললে, সব তো ভেস্তে গেল।
কী ভেস্তাল?
ভাইবোনে বিয়ে হয়?
না।
আমরা তো ভাইবোন হয়ে গেলুম।
ও তো একটা বলতে হয় তাই বলা।
কেন? সাহস করে বলতে পারলে না, এ আমার বোন নয়, বউ। বুক ফুলিয়ে বলা গেল না? লোকে খারাপ ভাববে, তাই না? বাঙালি তো, ঘোমটার আড়ালে খেমটা নাচ। বাইরে প্রকাশ হয়ে পড়লেই চরিত্রে চিড় ধরে যাবে।
রাগ করেছ?
দুঃখ পেয়েছি। অভিমান হয়েছে। আমার এই লুকোচুরিটা একেবারে সহ্য হয় না।
যদি অনুমতি দাও তো একটা কথা বলি।
বলো। তুমি তো কথার মালা, কথামালা। কথামালার শৃগাল।
