চুপ মেরে গেলুম। মুকুর গলা ক্রমশই চড়ছে। যাত্রীরা আমাদের দিকে তাকাচ্ছেন অবাক হয়ে। একজন সাংঘাতিক সুন্দরী মেয়ে বোকাবোকা একটা ছেলেকে তেড়ে ধমকাচ্ছে। ভাবছেন, ব্যাপারটা কী?
ফ্যাক্টরির গেটের সামনে দু’জনে এসে দাঁড়ালুম। দ্বিতীয় শিফটের কাজ শুরু হয়ে গেছে। অফিস আর ল্যাবরেটরি বিল্ডিং-এর পেছন দিকে কারখানার বিশাল চিমনি, ভুসভুস করে ধোঁয়া ছাড়ছে। বেশ ভারী একটা লাঞ্চের পর যেন ধূমপান করছেন বড়সড় কোনও মানুষ। অফিস গেটের সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের পাবলিসিটি অফিসার। খুব সাজগোজ করেন। নিজেই যেন এক জীবন্ত পাবলিসিটি। কোম্পানির যত কসমেটিক্স আছে সবই মেখে বসে আছেন। প্রতিদিনই তাই করেন। এইটাই তার ধরন। মেয়েলি চেহারা, মেয়েলি ভাবভঙ্গি। পোশাকে কখনও বাঙালি, কখনও পাক্কা সাহেব। আজ সাহেব। সাদা জামার ওপর টাই ঝুলছে। আমার সাথে মোটামুটি ভালই খাতির। খাতিরের কারণ, আমাকে মাঝে মাঝেই তাঁর কবিতা শুনতে হয়। প্রবল প্রেমের কবিতা। প্রেমিকা কোথায় আছেন জানি না। সেই প্রেমিকাকে তিনি প্লেটে সাজিয়ে কখনও দিচ্ছেন রক্তঝরা হৃদয়, কখনও ফুসফুস, কখনও অঞ্জলি দিচ্ছেন নয়নপদ্ম। বাকি আছে, যকৃৎ, প্লীহা। একমাত্র কোনও সার্জেনই এই কাণ্ড করতে পারেন।
আজ সাহেবি পোশাক বলে সাহেবের মতো আচরণ, হ্যাল্লো। হাউ ডু ইউ ডু! শোনাল, হাডুডু। আর একটু হলেই মুখ ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিত কিত! সামলে নিলুম কোনওক্রমে। হাতটা ধরে কষে আঁকানি মারলেন। তারপর মুকুর দিকে তাকিয়ে কুমডোর ফালির মতো হাসলেন। হেসেই রইলেন। চোখ দেখে মনে হল, অসীম কৌতূহল পরিচয় জানার।
বলেই দিলুম প্রশ্ন করার আগে, আমার বোন।
দেখেই বুঝেছি মুখের মিল। অসম্ভব সাদৃশ্য।
হাতে একটা চেনবাঁধা চাবি ছিল। উত্তেজনায় পাঁইপাই ঘোরালেন একবার। শেষে অদ্ভুত এক প্রশ্ন করলেন, তোমার চুল কত বড়?
মুকু অবাক হয়ে বলল, আমার চুল?
হ্যাঁ তোমার চুল।
তা হবে, কোমর পর্যন্ত নামবে তো বটেই।
ব্যস, আমার একটা মস্ত চিন্তা গেল। তোমাকে আমাদের তেলের বিজ্ঞাপনের মডেল করব। এমন সুন্দর চেহারা, চাঁদের মতো মুখ। মডেলিং-এর ফিউচার জানো, ভেরি ব্রাইট। কাপড়ের বিজ্ঞাপন হলে তোমাকে কখনই বলতুম না। চুলের বিজ্ঞাপন অ্যাবসলিউটলি ইনোসেন্ট। চুল আঁচড়াবে, চুল খুলবে, ব্লোয়ার দিয়ে চুল উড়িয়ে দোব, তুমি একটা টার্নটেবিলে ঘুরবে। স্লো-মোশনে দেখানো হবে। গোটা চারেক কথা। কবিতাও হতে পারে। আমাদের পেমেন্ট খুব ভাল। ক্যাশ। তোমাকে আজ আমি বলে রাখছি, তুমি ফিমস্টার হবে। কেউ আটকাতে পারবে না। লেখাপড়া কী করেছ?
মুকু যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। কোনওরকমে বেরিয়ে এসে বললে, এম এ পড়ছি।
তা হলে? সেটাও তো একটা ব্যাপার। তুমি তো আমাদের পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে জয়েন করতে পারো। একটা ওপনিং আছে। ভাইবোন একসঙ্গে আসবে, একসঙ্গে যাবে। এম ডি-কে বললে এখুনি রাজি হয়ে যাবেন। তোমার ভাইকে ভীষণ ভালবাসেন তো! তা তোমরা দু’জনে যাচ্ছ কোথায়?
আমি বললুম, ছুটিতে আছি, এম ডি-র সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
তা যাও যাও, দেখা করো। পারলে কথাটা পেড়ো।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মুকু বললে, মেয়েদের জীবনে কত বিপদ দেখেছ? সামনের রার ছেলে হয়ে জন্মাব।
আমি কী ভাবছি জানো? সামনের বার মেয়ে হয়ে জন্মাব। মেয়েদের কী ডিম্যান্ড।
মুকু শেষপর্যন্ত এম ডি-র ঘরে ঢুকল না। বসে রইল ভিজিটার্স রুমের সোফায়। আমি ঢুকতেই তিনি বললেন, একী, তুমি কলকাতায়? যাওনি এখনও? বোসো বোসো।
চেয়ার টেনে বসলুম। সামনে বিশাল টেবিল ঝকঝক করছে। পেছনে সার সার বুক শেলফে রাজ্যের রসায়ন শাস্ত্রের বই। দেয়ালে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ছবি! সারাঘরে চোখ ঘুরে এল। চেয়ারে সামান্য নড়াচড়া করে বললুম, আমি খুব বিপদে পড়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছি। আমার খুব প্যাথেটিক অবস্থা।
এম ডি উদ্বিগ্ন মুখে আমার দিকে তাকালেন। আমি বেশ গুছিয়ে আমার কাহিনি বললুম। শেষে যোগ করলুম, আপনি যদি আমাকে কলকাতায় থাকতে দেন তবেই আমার এই চাকরিটা থাকে।
তিনি অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তোমারও দুর্ভাগ্য আমাদেরও দুর্ভাগ্য। নতুন একটি প্রোজেক্ট হাতে নিলুম, এখন তোমার মতো ভাল ছেলে পাই কোথায়!
আমার যা মনে হয় স্যার, মাস তিনেকের মধ্যে তাকে খুঁজে পাব এবং ফিরিয়ে আনতে পারব।
আমার তা মনে হয় না। তোমাদের পরিবারে একটা বৈরাগ্যের বাতাস ঘুরছে। তা ছাড়া হরিশঙ্করকে আমি যতদূর জানি, সে কোনও হঠকারিতা করার পাত্র নয়। কলেজ লাইফ থেকে আমি তাকে চিনি। সব ব্যাপারেই ভেরি সিরিয়াস। আর বৈরাগ্য, এ বড় মজার জিনিস। হঠাৎ আসে প্রশ্ন নিয়ে, একেবারে বেসিক প্রশ্ন,
তাই কি? সকলি ছায়া? আসে থাকে আর মিলে যায়?
তুমি শুধু একা আছ, আর সব আছে আর নাই?
যুগ যুগান্তর ধরে ফুল ফুটে ফুল ঝরে তাই?
প্রাণ পেয়ে প্রাণ দিই সে কি শুধু মরণের পায়?
এম ডি উজ্জ্বল মুখে আমার দিকে তাকালেন, কার লেখা?
রবীন্দ্রনাথ।
এম ডি নিজেই একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলেন। মনে হয় একই প্রশ্ন তাকেও পীড়া দিচ্ছে,
কোথা রাত্রি কোথা দিন, কোথা ফুটে চন্দ্র সূর্য তারা!
কেবা আসে, কেবা যায়, কোথা বসে জীবনের মেলা!
কেবা হাসে, কেবা গায়, কোথা খেলে হৃদয়ের খেলা!
কোথা পথ, কোথা গৃহ, কোথা পান্থ, কোথা পথহারা!
কোথা খসে পড়ে পত্র জগতের মহাবৃক্ষ হতে,
