এলাকা ছাড়িয়ে আসার পর মুকু বললে, একা হবে না, দল চাই। লোফারদের চেনো!
একটাকে মনে হল চেনাচেনা। আর তিনটে বেপাড়ার। আমার কী মনে হচ্ছে জানো? সবকটাকে ছিঁড়ে খণ্ড খণ্ড করি।
একা পারবে না। নিজেই খণ্ড খণ্ড হয়ে যাবে। দলের সঙ্গে লড়তে হলে দল চাই। তুমি একা। তোমাদের পাড়াটা খুবই খারাপ।
আগে এইরকম ছিল না। হঠাৎ হয়ে গেছে।
এর একমাত্র কারণ, দেশবিভাগ।
এ পাড়ায় আর থাকা যাবে না মুকু।
তা বললে তো চলবে না। এত বছরের বসবাস ছেড়ে পালাবে কোথায়? আরও খারাপ দিন। আসছে। হেরে গেলে হবে না। কায়দা করে থাকতে হবে। কোনও কিছু গ্রাহ্য করবে না। যব হাতি চলে বাজার কুত্তা ভুকে হাজার।
ব্যাঙ্কের ম্যানেজার খুব ভাল ব্যবহার করলেন। আমি একা থাকলে হয়তো করতেন না। মুকুই কারণ। চোখ ঠিকরে দেবার মতো রূপ, তেমনি স্মার্ট। ম্যানেজার ভদ্রলোক চেয়ার থেকে শরীরটাকে আধখানা তুলে ফেলে এদিকে-ওদিকে দুলতে লাগলেন লগবগে নাচের পুতুলের মতো। মুকুই হেসে বললে, বসুন আপনি। ভদ্রলোকের চোখদুটো টিপের মতো আটকে রইল মুকুর মুখে। আমার বেশ মজা লাগছিল। হঠাৎ এক ছত্র কবিতা প্রজাপতির মতো উড়ে এল,
Man is the hunter, woman is his game;
The sleek and shining creatures of the chase,
We hunt them for the beauty of their skins
They love us for it, and we ride them down.
কিছু কিছু মানুষ আছেন উত্তেজনায় তোতলা হয়ে যান। ভদ্রলোকের তাই হল। অলওয়েজ অ্যাট ইয়োর সার্ভিস, এই একটি লাইন বলতে চেয়েছিলেন। কী বিপদেই যে পড়লেন! অল অল করলেন বারকতক। শব্দজব্দের মতো, পরের শব্দটা কী হবে আমরা অনুমান করার চেষ্টা করছি। ওয়েজটা মুক্তি পাবার পর আমরা সাহায্য করলুম, অলওয়েজ অ্যাট ইয়োর সার্ভিস। ভদ্রলোক যেন মুক্তির নিশ্বাস ফেললেন। বেল টিপলেন। দৌড়ে এল বেয়ারা। বেয়ারার সামনে তিনি ক্ষমতাশালী ম্যানেজার। দাপটে হুকুম দিলেন, চা নিয়ে এসো।
ইন্টারনাল ফোন তুলে কাকে যেন আসতে বললেন। চা আর ভদ্রলোক আসার ফাঁকে ম্যানেজার মুকুকে আবার একটা কিছু বলতে চাইলেন। সেই একই সমস্যা। আপনিতে এমনভাবে আটকে গেলেন, মনের কথা মনেই রয়ে গেল। কথা যখন চিউয়িংগাম হয়ে যায় তখন আর কিছুই করার থাকে না।
চটের ব্যাগ থেকে একে একে গয়না বেরোচ্ছে। ক্যাশিয়ার ভদ্রলোক মুকুর বুদ্ধির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। কী প্র্যাকটিক্যাল, কী ইন্টেলিজেন্ট! ম্যানেজার শুধু তারিফের হাসি হাসতে লাগলেন। কাগজপত্র তৈরি হল। সইসাবুদ হল। মুক্তির আনন্দ নিয়ে আমরা বেরিয়ে এলুম। এত দুঃখ, যে এই সামান্য ব্যাপারটাকেই মনে হচ্ছে কত বড় সুখ!
মুকু রাস্তায় নেমে হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে বললে, হারি আপ মাই বয়!
মুকু আমার বাবার এই কথা দুটো কোথা থেকে পেল, কাম অন মাই বয়, হারি আপ মাই বয়! তিনিই কি কথা বলছেন মুকুর কণ্ঠে বসে! বড় পরিচিত কথা।
আমার হাতে সেই বিশ্রী চটের ব্যাগটা। জিজ্ঞেস করলুম, মুকু, এইটার কী ব্যবস্থা হবে?
গোল করে পাকিয়ে বগলে চেপে রাখো। কেন, লজ্জা করছে?
পোশাকের সঙ্গে মানাচ্ছে না।
বাবা! দেখো। সেরকম হলে আমার কাছে দাও।
এরপর আর কিছু বলা যায় না। ঊর্ধ্বশ্বাসে আরও কিছু দূর হাঁটার পর জিজ্ঞেস করলুম, এরপর আমরা কোথায় যাব?
আমার হস্টেলে। তুমি একটা ট্যাক্সি ডাকবে। মালপত্র তুলব। সোজা চলে আসব বাড়ি।
কিছু কথা ছিল।
কী কথা?
কোথাও একটু বসা দরকার।
বসার দরকার নেই। বুঝেছি, তুমি কী বলতে চাও। ভয়ে মরছ। তুমি চাও না আমি তোমার সঙ্গে থাকি! পাড়ার ওই লোফারগুলো তোমাকে টিটকিরি মারবে। এই হল তোমার এক নম্বর ভয়। দু’নম্বর ভয়, যদি মেসোমশাই ফিরে আসেন, তা হলে আমাকে দেখে কী ভাববেন? তোমার ওইসব ভয়কে আমি পাত্তা দিচ্ছি না। তোমাকে আমি একলা থাকতে দেব না। তোমার একটা গুণ ছিল না, সেইটা হঠাৎ এসেছে, কথায় কথায় মারামারি করা। একই সঙ্গে তোমার বাবা আর মা হয়ে তোমাকে আগলাতে হবে।
মুকুর কথা শুনে আমি থমকে গেলুম। এ অভিনয়, আদিখ্যেতা, না সত্যিই প্রেম!
মুকু বললে, হাঁ করে তাকাবার মতো আমি কিছু বলিনি। তুমি এখন আমার মুঠোয়।
বাস আসছে। স্টপেজ কিছুটা দূরে। মুকু বললে, হারি আপ মাই বয়!
আমরা বাসে উঠে পড়লুম। ফাঁকা। পাশাপাশি বসলুম। কিছু দূর যেতে-না-যেতেই আমার মাথায় আর এক চিন্তা এল, টাকা। অন্নচিন্তা চমৎকারা। মুকু যদি আমার সঙ্গে থাকে তা হলে রোজগার চাই। ভাল রোজগার। চাকরি ছাড়ার উপায় নেই। সংসারে জড়িয়ে পড়ার এই বিপদ। একা হলে কোনও কথাই ছিল না। খাওদাও বগল বাজাও।
খুব মৃদু গলায় ডাকলুম, মুকু।
চোখ বুজিয়ে বসে ছিল। চোখ না খুলেই বললে, আবার কী সমস্যা!
সবার আগে আমার ফ্যাক্টরিতে তো একবার যেতে হয়।
চলল। এর জন্যে অত ভাবার কী আছে?
তা হলে টিকিটটা সেইভাবেই কাটি।
কাটো। তোমার ম্যানেজিং ডিরেক্টারের সঙ্গে আমি কথা বলব।
আমিই সব গুছিয়ে বলতে পারব।
আমি বললে আরও ভাল পারব। তা ছাড়া আমার সঙ্গে পরিচয়ও হয়ে যাবে।
যদি কিছু মনে করেন?
তোমার এই এক হয়েছে! সবেতেই দুর্ভাবনা। মনে করলে করবেন।
তুমি বললে, এম ডি ভাববেন ছেলেটার কোনও ব্যক্তিত্ব নেই।
তোমার সত্যিই কি কোনও ব্যক্তিত্ব আছে? নিজে নিজে কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারো?
