কী হয়েছে, এককথায় বলি কী করে! আমার পিতাকে অপমান! লোকটার জিভ আমি টেনে ছিঁড়ে দোব। জেলে যেতে হয় যাব। জমায়েত দু’ভাগ হয়ে গেল। এক ভাগ আমার দিকে, এক ভাগ মেনিবাবুর দিকে। মেনি খুব তড়পাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলুম, তোমার বাবা কোথায়? তা ঝড়াকসে একটা চড় কষিয়ে দিলে! আমার দিকে যাঁরা ছিলেন, তাদের মধ্যে প্রবীণ পরেশবাবু খুব রাশভারী। মানুষ। তিনি বললেন, মেনি, এই প্রশ্নে কেউ চড় মারতে পারে না, পাগল ছাড়া? এই ছেলেটিকে আমি ভালভাবেই চিনি, তোমাকেও আমার চিনতে বাকি নেই। পিন্টু, মেনি তোমাকে কী বলেছিল?
জ্যাঠামশাই, এমন অশ্লীল কথা, যা আমি মুখে আনতে পারব না।
মেনিবাবুর তিন মেয়ে খুব ওড়াওড়ি করে। মেনির দিকে আমার বয়সি কিছু স্বাভাবিক কারণেই জুটেছে। তাদের একজন বললে, অকারণে কেউ অশ্লীল কথা বলে! হয় ও পায়ে ধরে ক্ষমা চাক, নয় পেদানি খাক।
পরেশবাবু বললেন, পিন্টু, পায়ে ধরে নয়, এমনিই তুমি.ক্ষমা চেয়ে নাও, যতই হোক প্রবীণ মানুষ।
আমি পারব না জ্যাঠামশাই। কে কাকে পেঁদায়, আমি একবার দেখতে চাই। হয়ে যাক।
কখন আমার বন্ধু মিহির পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল লক্ষ করিনি। সে এগিয়ে এল, কে মারবে? মারবে কে? সাহস থাকে এগিয়ে আয়! মিহির আমাকে জিজ্ঞেস করলে, মেনিমুখোটা কী বলেছিল রে! তোর মতো ঠান্ডা ছেলে খেপে গেল। আমি বললুম মেনির মন্তব্য।
পরেশবাবু বললেন, আরে ছি ছি। একজন ঋষিতুল্য মানুষ। আমরা সবাই তাকে শ্রদ্ধা করি। মেনি, তুমি তো একেবারে উচ্ছন্নে গেছ হে! এ পাড়ায় তো তোমার থাকা উচিত নয়। তোমার এ কী স্বভাব! তুমি চোদ্দোটা ছেলেমেয়ের বাপ। আজ বাদে কাল ঘাটে যাবে!
মিহির বললে, তোর জামার বুকে লালমতো কী রে! রক্ত?
না, পানের পিক দিয়েছে।
মিহির বললে, মেনিবাবু, আজ আপনাকে ওয়ার্নিং দিচ্ছি, নিজের ব্যাপার ছাড়া অন্যের ব্যাপারে নাক গলালে খুব খারাপ হয়ে যাবে। আমাকে আপনি ভালই চেনেন। নিজের মেয়ে তিনটেকে আগে সামলান। পিন্টু, তুই বাড়ি যা।
আমি জিতেছি না হেরেছি বুঝতে পারলুম না। দাগরাজি বুকে বাড়ি ফিরে এলুম। বাজার আর হল না।
২.০৬ একদিন কুম্ভকার-গৃহ-পার্শ্ব দিয়া
একটা কথা আছে, মহাগুরু নিপাত যোগ। পিতার মৃত্যুর পর একটা বছর এই যোগ চলে। যতরকম দুর্ভাগ্য নেমে আসে মানুষের জীবনে। আমি যেন সেই যোগের মধ্যে পড়েছি। শ্রীহরিশঙ্কর কোথায় অদৃশ্য হলেন জানি না। তিনি নেই। এই না-থাকাটা মৃত্যুরই সামিল। অসভ্য ইতর মেনি, তাল-তোবড়ানো মুখ। ঠোঁটদুটো ছুঁচোলো করে, এক ধাবড়া পানের পিক দিয়ে দিলে আমার বুকে! সারা গা ঘিনঘিন করছে। জামাটা তো গেলই। ভেতরের গেঞ্জিটাও গেছে।
মুকু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। একটাও কথা নেই মুখে। তীব্র চোখে দেখছে আমাকে। অপরাধী সন্তানের মতো মাথা নিচু করে আছি আমি। আমি দোষী? আমার দোষটা। কোথায়?
মুকু ঝাঁঝালো গলায় বললে, আধ ঘণ্টার মধ্যে একটা কাণ্ড করে চলে এলে! গেলে এক কাজে, করে এলে আর এক কাজ? তোমার কী দরকার ছিল খুঁচিয়ে ঘা করার।
বাঃ, আমার বাবার নামে যা-তা বলবে আর আমি চুপ করে থাকব?
তুমি হাত তুলতে গেলে কেন? তোমার তো মুখ ছিল। এই যে জল ঘোলা করে এলে, আরও কিছু শত্রু তৈরি হল। এরপর তুমি এ পাড়ায় টিকতে পারবে? যেতে আসতে টিটকিরি মারবে। একজন মানী মানুষের মানসম্মান ধুলোয় লোটাবে। এত সহজে মেজাজ খারাপ করলে চলে? পৃথিবীটা পৃথিবীই, স্বর্গ নয়। তোমার মতো বোকা পৃথিবীতে আর দুটো নেই। ঠিক ফাঁদে গিয়ে পড়লে!
ফাঁদ আবার কী!
মানুষ কত উদ্দেশ্যে কত কাজ করে তোমার ধারণা আছে? নেই।
এ পাড়ায় আমারও কিছু বন্ধু আছে।
বিপদে কারওকে খুঁজে পাবে না। যাও, জামাটা খুলে ফেলে দিয়ে চান করে এসো।
কোনওরকমে খাওয়াদাওয়া হল। নিরানন্দ ভোজন। মুকু সেই থেকে আমার সঙ্গে কথা প্রায় বলছেই না। নীরবে সবকিছু করে যাচ্ছে। তার সাজগোজ হয়ে গেছে। গয়নার বাক্সটা আলমারি থেকে বের করলুম। মুকু হঠাৎ বললে, ওটাকে তুমি কি ওইভাবেই নিয়ে যাবে?
তা হলে?
কী তোমার বুদ্ধি? এ যেন ফুল দিয়ে সাজিয়ে শ্মশানে মড়া নিয়ে যাওয়া। বলো হরি! এক ঝটকায় কেড়ে নিলে কী করবে? ফাঁসফাস করে কাদবে?
তা হলে কী করে নিয়ে যাব?
বাজার করার চটের ব্যাগটা নিয়ে এসো। একটা খবরের কাগজে সব জড়িয়ে ওর মধ্যে ফেলো। তার ওপর একটা কাপড় চাপা দাও।
অক্ষরে অক্ষরে মুকুর নির্দেশ পালন করে পৌনে বারোটা নাগাদ আমরা রাস্তায় নেমে এলুম। মোড়ের মাথায় তিন-চারটে ছেলে জটলা করছে। একজনের সঙ্গে একটা সাইকেল। আমরা কাছাকাছি যেতেই একজন সিক করে একটা সিটি মারল। তিরের মতো লাগল। মন ছুঁড়ে গেল।
মুকু বললে, উঁহু, একেবারে পাত্তা দেবে না।
দু’পা এগোতে-না-এগোতেই আর একজন বলে উঠল, মালটা ভালই জুটিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা মন্তব্য, আসবে নাকি? খাওয়াব চাটিম কলা।
আমার কানদুটো গরম হয়ে গেল। হাতের মুঠো কষকষ করছে। ইচ্ছে করছে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ি। আমি যাঁর সন্তান, সেই হরিশঙ্কর হলে রক্তগঙ্গা বয়ে যেত। আমার মাতামহ হলে, সবকটাকে এক এক করে তুলে আছাড় মারতেন। ঠিকই বলতেন তিনি, ভঁটে চলাফেরা করার দুটো হাতিয়ার, ব্রহ্মচর্য আর মুগুর।
