কোনটা?
তুমি তো জানো, আমাদের মতো সন্ন্যাসীর নারীদর্শনেও চিত্তচাঞ্চল্য হতে পারে। স্পর্শ! সে তো আরও ভয়ংকর! আর তুমি সেই মহিলাকে কোলে করে কাদা পার করালে! কাজটা কি ভাল করলে?
পরমানন্দ হাসতে হাসতে বললেন, হায় হরি! আমি তো তাকে কখন কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছি, তুমি এখনও তাকে বয়ে বেড়াচ্ছ!
ওই দ্বিতীয় সন্ন্যাসীর অবস্থা হয়েছে আমার। কতক্ষণে ওই নিদারুণ প্রত্যঙ্গ মন থেকে সরে যায় দেখি! সারাটা দিনই থাকবে। নিজেকে তো ভালই চিনি। মুকুর ডাক ভেসে এল, কতক্ষণ ধরে সঁাত মাজবে! তোমার ক’টা দাঁত? বত্রিশটা না চৌষট্টিটা?
মুকুর বেশ দেখে চমকে উঠলুম। আমার একটা পাজামা আর পাঞ্জাবি পরে দুকাপ চা হাতে নিয়ে ঘরের দিকে চলেছে।
এ তোমার কী বেশ?
কী করব, বাসী কাপড়চোপড় সব কেচে দিয়েছি। আর তো নেই কিছু।
কেন, যে-শাড়িটা পরে এসেছিলে?
সেটা তো রাস্তার কাপড়। ওটা পরে রান্নার কিছু ছোঁয়া যায়!
উঃ, তুমি একটা হয়েছ বটে! তোমার ওই জায়গাটা কেমন আছে?
আবার সেই চিন্তা! বেশ আছে, ভাল আছে। মাঝে মাঝে চিনচিন করছে।
ডাক্তারবাবুকে কল দোব?
তার আগে এসো দু’জনে মিলে বাড়িটা পরিষ্কার করি। বাজারে যাবে তো?
কী রাঁধবে?
সব নিরামিষ।
আমরা তো শাক্ত!
মেসোমশাই মাছ, মাংস, ডিম সব ছেড়ে দিয়েছিলেন। দাদু শেষটায় হয়েছিলেন বিষ্ণুর উপাসক। পিতার আদর্শকে যে-ছেলে ধরে রাখতে পারে সে-ই সুসন্তান। একথা আমার নয় কনফুসিয়াসের।
তোমার হস্টেলের কী হবে!
বারোটার সময় আমরা দুজনে বেরোব খেয়েদেয়ে। প্রথমে যাব ব্যাঙ্কে। সেখান থেকে হস্টেলে। যা আছে সব নিয়ে চলে আসব।
আর ইউনিভার্সিটি?
কাল থেকে আবার ক্লাস শুরু হবে।
আর আমার চাকরি?
কাল থেকে বেরোও। কতদিন আর বাড়িতে বসে থাকবে!
আমাকে তো দেরাদুনে বদলি করেছে।
তুমি তোমার অসুবিধের কথা গিয়ে বললো। বলল আমি এখন কলকাতায় থাকব।
সে হয় না। অত বড় একটা প্রোমোশন নোব না!
তাই বলো! লোভ! লোভে ধরেছে। তা হলে দোরতাড়া বন্ধ করে দেরাদুনে চলে যাও। আমি আমার হস্টেলেই ফিরে যাই।
একটা কথা বলব সাহস করে?
বলো।
বেশ কিছুক্ষণ ইতস্তত করলুম। বলব কি বলব না? শেষে আমতা আমতা করে বলেই ফেললুম, আমরা যদি বিয়ে করি? করে সোজা দেরাদুনে চলে যাই?
মুকু হাহা করে হেসে উঠল, বিয়ে করবে? মেসোমশাইয়ের অবর্তমানে, অনুমতি ছাড়াই? তিনি বাঁচলেন কি মরলেন একবার দেখবে না! নিজের সুখ নিজের কেরিয়ারটাই কেবল দেখতে চাও! যে-মানুষ সমস্ত ত্যাগ করে তোমাকে মানুষ করলেন, শেষটায় তিনি এইভাবেই হারিয়ে যাবেন!
তা হলে আমি করবটা কী? শূন্য ঘাটে আমি কী-যে করি, রঙিন পালে কবে আসবে তরী?
একটা কাজই তুমি করবে, ওই রবীন্দ্রসংগীতের প্রথম লাইনে যা আছে, তোমায় চেয়ে আছি বসে পথের ধারে সুন্দর হে। তুমি বসে থাকবে, সব যেমন ছিল সেইভাবে বজায় রেখে। একেবারে টিপটপ করে রাখতে হবে। তিনি আসবেন, আসতে তাকে হবেই। আমার মন বলছে। প্রয়োজন হলে তোমাকে চাকরি ছাড়তে হবে।
খাব কী?
খাবে না। মাস্টারি করবে। অন্য কোথাও চাকরির চেষ্টা করবে। টেকনিক্যাল লাইনে চাকরির অভাব হবার কথা নয়। না হয় দু’পয়সা কমই মাইনে হবে। মা-মরা ছেলেরা অবশ্য স্বার্থপরই হয়। তুমি একটু বেশি স্বার্থপর, এই যা তফাত।
তা হলে কী করব এখন?
বাজার করবে। বারোটার মধ্যে বেরোতে হবে। একেবারে বর্তমানের কথাটাই আগে ভাবো, তারপর আগামী দিনের কথা ভাবা যাবে। তোমাকে আমি বাজে পরামর্শ দোব না।
ব্যাগ বগলে রাস্তায় নেমে এলুম। চারপাশে যেন গ্যাজগ্যাজ করছে। রাস্তায় নেমে মনে হল, আমি ভীষণ অসুস্থ। জীবনের সুর কেটে গেছে। দু’পা যেতে-না-যেতেই পেছন থেকে মেয়েলি গলায় ডাক। এল, এই যে পিন্টু, পিন্টু।
এ পাড়ার বিখ্যাত মেনিদা। সাতসকালেই মুখে ডবল খিলি পান। চ্যাকোর চ্যাকোর করে চিবোচ্ছেন। হাতে ধরে আছেন পানের বোঁটায় চুন। জিজ্ঞেস করলুম, কী বলছেন?
তোমার বাবা উঠেছেন?
না।
আঃ, ভেরি লেট রাইজার। ভোরে ওঠার মহিমা বুঝল না। সারাজীবন শুধু শুনেই গেল সূর্য পুব দিকে ওঠে। দেখা আর হল না। তুমি তো ডেকে দিতে পারো। এই বয়েসে ভোরবেলা বেড়ানোই হল বেস্ট একসারসাইজ। আমি সেই ভোর পাঁচটা থেকে ঘুরছি। তা কখন গেলে দেখা হবে বলে তো?
তিনি কিছুদিনের জন্যে বাইরে গেছেন।
তাই নাকি, চেঞ্জে? তা আমি যে আবার অন্যরকম শুনলুম। সেই বিধবা মাগিটাকে নিয়ে সংসার পাততে গেছে!
আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে গেল। সপাটে এক চড় ভদ্রলোকের মুখে। মাথাটা একপাশে টলে গেল। জীবনের প্রথম চড়। জামার কলারটা বুকের কাছে খামচে ধরলুম। এক ঝাঁকানি মেরে বললুম, কী বললেন?
মেনিবাবু বললেন, বাস্টার্ড! থুঃ করে এক ধাবড়া পানের পিক ছুঁড়ে দিলেন আমার দিকে। এক ধাক্কা মারতেই ভদ্রলোক পড়ে গেলেন চিতপাত হয়ে। সঙ্গে সঙ্গে লোক জড়ো হয়ে গেল। মেনিবাবু শুয়ে শুয়েই বললেন, গুরুজনের গায়ে হাত তোলা! হারামজাদা! যেমন বাপ তার তেমনি ছেলে!
আমি একটা লাথি মারার জন্যে ডান পা-টা তুলেছিলুম। আমাকে কে একজন পেছন থেকে জাপটে ধরলে, কী হচ্ছে কী! খুন করে জেলে যেতে চাও?
চতুর্দিক থেকে প্রশ্ন, কী হয়েছে কী! একটা বৃদ্ধ নিরীহ মানুষকে ধরে ঠ্যাঙাচ্ছ? ভদ্রলোকের ছেলের এ কী দুর্মতি!
