মহাভারত অশুদ্ধ না হলেও, দেহ অশুদ্ধ হবে। তুমি একটু একটু করে আমার দিকে সরবে, আমি সরব তোমার দিকে। রাত ভোর হবার আগেই যা হবার তা হয়ে যাবে। লোহা আর চুম্বক দূরে দূরে থাকতে পারে না।
আমি কথা দিচ্ছি।
তোমার কথা যে আমি বিশ্বাস করি না মহারাজ। তুমি মিথ্যাবাদী।
মিথ্যাবাদী? আমি মিথ্যাবাদী?
ডাহা মিথ্যাবাদী। বিকেলে তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলুম, সারাদিন তুমি কী খেলে? অম্লান বদনে বললে, টুকটাক, সামান্য কিছু। মানে, প্রায় উপোসই করে আছ। ইতু বউদি বললেন, তুমি দুপুরে পাত পেড়ে চর্ব-চুষ্য খেয়ে গেছ। এই ডাহা মিথ্যেটা তুমি বললে কেন? আমি জানি কেন বললে! তোমার সবটাই লোকদেখানো। তুমি দেখাতে চাইলে, দেখো, আমি কত বিচলিত, নাওয়া খাওয়া ভুলে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি আওয়ারা হয়ে। আসলে, ব্যাপারটা তুমি বেশ মেনে নিয়েছ শান্ত মনে, হজম করে ফেলেছ। কোনও কিছু তোমার মন স্পর্শ করে না। মন ছুঁয়ে চলে যায়। ছোট ছোট ব্যাপারেই মানুষকে চেনা যায়, বড় ব্যাপারে যে কী করবে! আর যেই করুক তোমাকে আমি আর বিশ্বাস করি না। বিশ্বাস করেননি তোমার বাবাও। নাও এখন শুয়ে পড়ো। আমি পাশের ঘরে চললুম। আমার প্রবল ঘুম পেয়েছে এইবার। আর দাঁড়াতে পারছি না। শোওয়ার আগে হাত জোড় করে প্রার্থনা করবে, ঈশ্বর! আমাকে চরিত্র দাও, আবেগ দাও, চোখে জল দাও। লোককে দেখাব না, নিজেকে দেখাব। নিজেই নিজেকে দেখে বাহবা করে উঠব। সার্টিফিকেট বাইরের কেউ দিতে পারে না। নিজের সার্টিফিকেট নিজেই দেওয়া যায়।
মুকু যেন আগুনের মতো জ্বলছে। আমার বিবেক যেন আমার সঙ্গে কথা বলছে। পাশের ঘরের দরজা বন্ধ করার শব্দ হল। আমি বসে রইলুম গুম মেরে। আমার ঘুম ছুটে গেছে। হাওয়া কোন দিকে ঘুরছে কে জানে? নিস্তব্ধ চরাচর। উত্তুরে বাতাস ছেড়েছে। দমকে দমকে। গাছের পাতায় ঝুপঝাঁপ শব্দ। হঠাৎ একটা গান ভেসে এল মনে,
সুদূর কোন নদীর পারে গহন কোন বনের ধারে
গভীর কোন অন্ধকারে হতেছ তুমি পার ॥
তিনি কে? তিনি আমার পিতা, শ্ৰীযুত হরিশঙ্কর। নিরুদ্দিষ্টের কলামে বিজ্ঞাপন দিতে হলে লিখতে হবে: প্রবীণ এক মানুষ। সুঠাম শরীর। উচ্চতা, পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি। মাথার চুল পাতলা হয়ে এসেছে। বুকের মাঝখানে অ্যাসিডে পুড়ে যাওয়ার দাগ। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। পাতলা ক্ষুরধার ঠোঁট। উন্নত নাসা। তিনি সুদূর কোন নদীর পারে গহন কোন বনের ধারে এই গভীর নিশায় দাঁড়িয়ে আছেন একা। একটি খেয়া হঠাৎ খুলে গেল তীর থেকে। গভীর কোন অন্ধকারে হতেছ তুমি পার। আর ভাবতে পারছি না। এইবার শুয়ে পড়ি।
ঘুম ভেঙে গেল। দরজায় টকটক শব্দ। জানলায় উজ্জ্বল প্রভাত। মুকুর গলা, গেট আপ মাই বয়। বাইরে এসে অবাক হয়ে গেলুম। শাড়ির আঁচল কোমরে জড়ানো। হাতে একটা ঝাড়। খোঁপা মাথার উপর উঁচু করে বাঁধা।
মুকু বললে, গুড মর্নিং।
মর্নিং। তোমার এ কী বেশ?
কাজের লোকের বেশ। তোমার ঘরটা ছাড়া সবই পরিষ্কার করা হয়ে গেছে। উনুনে আগুন পড়েছে। এইবার চা চাপছে। মুখ ধুয়ে নাও।
কখন উঠেছ তুমি?
উঠেছি? কখন শুয়েছি তাই বলো?
সেকী, সারারাত জেগে ছিলে? কেন? ঘুম এল না?
তা হলে এই দেখো।
মুকু নিমেষে তার ডান উরুটা আমার সামনে খুলে ধরল। ফরসা ধবধবে। এত ফরসা যে চোখে ধাঁধা লেগে গেল। সেই শুভ্র ত্বকে থর নিয়ে উঠেছে লাল চাকামতো একটা কী।
চমকে প্রশ্ন করলুম, কী ওটা?
শাড়ি নামিয়ে দিয়ে মুকু বললে, যন্ত্রণা। সবে শুয়েছি। ঘুমও প্রায় এসে গেছে। এমন সময় দিলে কামড়ে।
কী কামড়াল?
বিছে। খপ করে চেপে ধরলুম অন্ধকারে। চটকে রগড়ে রসটা মাখিয়ে দিলুম। জানো তো, বিষের ওষুধ বিষ। সারারাত জ্বলল হুহু করে লঙ্কাবাটার মতো। বসে বসেই রাতটা কেটে গেল।
আমাকে ডাকলে না কেন?
তুমি আমার সুখের সাথী। দুঃখের সাথী হতে যাবে কেন?
কাল থেকে তুমি খুব পাকাঁপাকা কথা বলছ। কই দেখি আর একবার?
মুকু হেসে বললে, আর না মশাই। একবারই যথেষ্ট।
তুমি আমাকে কী ভাবো বলল তো! চলো, একটু ওষুধ লাগিয়ে দিই।
কোনও প্রয়োজন নেই, আপনিই সেরে যাবে। তুমি তোমার কাজে যাও, আমি যাই আমার কাজে। মুকু আমার ঘরে ঢুকে গেল। মশারি তুলে, বিছানা গোছগাছের কাজে লেগে গেল। দাঁত বুরুশ করতে করতে নিজেকে ধিক্কার দিলুম– সত্যিই তুমি বাপু শয়তান। তোমার ছলের অভাব নেই। মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছ না? মানুষের একটা প্রত্যঙ্গ তোমাকে এমনভাবে কাবু করে ফেলল? হবে না, তোমার কিছু হবে না। সেই দুই সন্ন্যাসীর গল্প। দু’জনেই চলেছেন, এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায়। খুব বৃষ্টি হয়েছে ক’দিন। চারপাশে জলকাদা। ডোবা, খানাখন্দ। সন্ন্যাসী দু’জন চলেছেন। পেছনে আসছিলেন এক সুন্দরী যুবতী মহিলা। তেমনি তার সুন্দর সাজপোশাক। সামনেই একটা কাদার ঈক। মহিলা ইতস্তত করছেন। ওই কাদায় নামলে শাড়ি জুতো সবই যাবে। তাঁর ইতস্তত ভাব দেখে এক সন্ন্যাসী তার দিকে এগিয়ে গেলেন। মহিলা কিছু বলার আগেই পাঁজাকোলা করে তাকে কাদার অংশটুকু পার করে দিলেন। আবার চলতে শুরু করলেন দুই সন্ন্যাসী। হাঁটতে হাঁটতে তারা এসে পৌঁছোলেন এক মঠে। রাত হল। দু’জনেই শুয়েছেন এক ঘরে। হঠাৎ দ্বিতীয় সন্ন্যাসী বললেন, পরমানন্দ! তুমি এটা কী করলে?
