কে দেখবে আর কে না দেখবে!
পাশের ঘর থেকে মুকু বেরিয়ে এল সেই ডুরে শাড়িটা পরে। ঘরে ঢুকেই বললে, সমস্ত দরজা জানলা বন্ধ করো। নীচের সব বন্ধ হয়েছে?
হয়েছে।
ঘুপচিঘাপচি সব দেখে এসেছ, কেউ ঢুকে বসে নেই তো ঘাপটি মেরে!
না, তা তো দেখিনি। সদরে খিল লাগিয়ে উঠে এসেছি।
বাঃ, টর্চের আলো ফেলে একবার দেখে এলে না? লুকিয়ে থাকার জায়গার তো অভাব নেই। যাও একবার দেখে এসো।
কঠিন পরীক্ষা। আমি ভিতু। ভয়ংকর রকমের ভিতু। ভূতের ভয়, চোরের ভয়, সাপের ভয়, এমনকী ব্যাংকেও ভয় পাই আমি। ব্যাঙের বিশ্রী একটা স্বভাব হল, লাফিয়ে কোলের ওপর আসার চেষ্টা। সেইজন্যেই বলে কোলা ব্যাং। আমাকে ইতস্তত করতে দেখে মুকু বললে, ধরেছে তো! ভয়ে একেবারে মরে যাচ্ছ!
তুমিও চলো না।
না, তোমাকে একা যেতে হবে। পুরুষমানুষ, সাহস করো। ছায়া দেখে চিৎকার করে উঠো না। সেই পাঁচ সেলের টর্চটা নিয়ে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামছি। ড্যাম্প। সোঁদা সোঁদা গন্ধ। দেয়ালে নোনা ধরেছে। আপনা আপনিই নানা দেশের মানচিত্র হয়ে বসে আছে। দরজার ফাটলে ফাটলে উচ্চিংড়ের কলরোল। রাতের ঝিল্লি যেন কাঁপছে দিনের গর্ভযন্ত্রণায়! মনে হচ্ছে পাতালে নামছি। পায়ের দিক থেকে একটা গুড়গুড়ে শীত তলপেট পর্যন্ত উঠে আসছে। অন্ধকার যেন কফিনে শুয়ে আছে। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে, এই বুঝি কাঁধে কেউ হিমশীতল হাত রাখবে। ঘাড়ে ফেলবে বরফ-নিশ্বাস।
দেখেশুনে ফিরে এলুম। মুকু খাটে আড় হয়ে শুয়ে আছে রাজরানির মতো। কিছু চুল সামনে ঝুলছে, কিছু পিঠের দিকে। একটা ডায়েরি খুঁজে বের করেছে কোথা থেকে। গম্ভীর মুখে পাতা ওলটাচ্ছে। নীল চাঁদরের ওপর মুকুকে বেশ মানিয়েছে। মুখ তুলে বললে, সব ঠিক আছে?
আছে।
আমি মেসোমশাইয়ের একটা ডায়েরি খুঁজে বের করেছি। বেশ কিছু ঠিকানা লেখা আছে। এই ঠিকানা ধরে আমরা অনুসন্ধান করে দেখতে পারি।
সবই কি কলকাতার? বেশির ভাগই কলকাতার, বাইরেরও আছে কিছু। দক্ষিণভারত, উত্তরভারত, মধ্যভারত।
ওইসব ঠিকানার সঙ্গে বছরে একবারই যোগাযোগ। বিজয়ার চিঠি। ওর কোনওটাতেই তাঁকে। পাওয়া যাবে না।
তোমার অনেক দোষের একটা হল, তুমি নিরাশাবাদী। সব কিছুতেই না। হ্যাঁ বলতে জানোনা? যাক তোমার সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। দরজা বন্ধ করে গয়নার বাক্স বের করো। আজই লিস্টটা তৈরি করে ফেলি।
অনেক রাত হল, না?
হল তো হল, তাতে তোমারই বা কী, আমারই বা কী? রাতের সম্পর্ক ঘুমের সঙ্গে। সময় নষ্ট না করে সব নিয়ে এসো।
গয়নার বাক্সটা খাটের মাঝখানে রাখা হল। একপাশে আমি আর একপাশে মুকু। মুকুর হাতে কাগজ আর কলম। প্রথমেই বেরোল ছ’টা আংটি। একটা আংটি হাতে নিয়ে মুকু বললে, পাথরটা মনে হচ্ছে হিরে?
হ্যাঁ, হিরে। ওটা আমার মায়ের আঙুলের। বিয়ের আংটি।
আংটিটি নিজের অনামিকায় গলিয়ে মুকু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে। একটা অশরীরী আলো ছিটকোচ্ছে। মুকু বললে, মায়ের আঙুল আর আমার আঙুল একই মাপ। আমি যে আসব মা বোধহয় জানতেন। এ সবই তো আমার।
অবাক হয়ে মুকুর দিকে তাকালুম। এত লোভী!
মুকু বললে, খুব খারাপ লাগল শুনতে, তাই না? ইচ্ছে করে বললুম, তোমার মনে হেঁকা দেবার জন্যে। সবই তোমার, গয়নার লোভ আমার নেই। পুরো বাক্সটা উপুড় করে দাও। আমি এক একটা লিখব, আর তুমি তুলবে।
বাক্সটা উপুড় করে দিলুম। চুড়িতে রুলিতে ঠোকাঠুকি হয়ে কিনকিন শব্দ করে উঠল। মনটা কেমন ছাত করে উঠল। যাঁদের অঙ্গে এইসব শোভা পেত, তারা পৃথিবীর খেলা শেষ করে বহুদিন হল চলে গেছেন। হিরের আংটি আঙুলে। মা হারমোনিয়ম বাজিয়ে গান গাইছেন। হিরে ঝিলিক মারছে। নাকে হিরের নাকছাবি। কানে মুক্তোর দুল। কত সুখ ছিল এই সংসারে! মৃত্যু এসে ঈগল পাখির মতো একে একে সব ছোঁ মেরে নিয়ে চলে গেল।
মুকু বললে, অতীত থেকে দয়া করে ফিরে এসো বর্তমানে। এই নাও, নাম্বার ওয়ান। হিরের আংটি। নাম্বার টু, রুবির আংটি, পোখরাজ, নীলা।
লিস্ট ক্রমশই বড় হচ্ছে। বিছে হার, প্রজাপতি হার, চেন, সাপ বালা। জোড়া সাপ। সাপের চোখে রুবি। প্রজাপতি হারটার অবাক করা শোভা। মোটামোটা চুড়ি, রুলি, আর্মলেট, টায়রা, ব্রোচ। শেষ গয়নাটা যখন বাক্সে ফিরে এল ঘড়িতে তখন রাত দুটো। আমার হাই উঠছে। মুকু আমার চুলে হাত বুলিয়ে বললে, এইবার বাবুর ঘুম পেয়েছে গো! যাও সব তুলে রাখো। কাল আমরা দুজনে গিয়ে ব্যাঙ্কে জমা করে দিয়ে আসব।
আলমারির মধ্যে বাক্সটা চালান করে দিলুম। চন্দনের গন্ধ, ন্যাফথালিনের গন্ধ ছড়িয়ে গেল ঘরে। নানারকম সুগন্ধীর সঙ্গে আমার পিতার যোগ ছিল। ফালি ফালি কাপড়ে নানারকম সেন্ট মাখিয়ে জানলায় জানলায় ঝুলিয়ে দিয়ে মোটা গালচে পেতে এসরাজ বাজাতে বসতেন। সুর আর সুগন্ধ একসঙ্গে ছড়াত সারা বাড়িতে। এসরাজটা সিল্কের আলখাল্লা পরে কোণের টেবিলে দাঁড়িয়ে আছে। আর কি কোনওদিন বেজে উঠবে!
মুকু আলগোছে ঢকঢক করে জল খেল। খাটের চাদরটা টানটান করে বালিশ পেতে দিয়ে বললে, নাও শুয়ে পড়ো। শোওয়ার আগে জল খেয়ো।
আর তুমি?
আমি পাশের ঘরে।
সেকী? এই বিশাল খাটে আমাদের দু’জনেরই তো চমৎকার হয়ে যেতে পারে!
আরে ছি, ছি, দু’জনে একই বিছানায় শোওয়া যায়, না শোওয়া উচিত? তিনি থাকলে পারতে? না-থাকায় তিনি আরও আছেন। এই কথাটা যেন ভীষণভাবে মনে থাকে! কোনও অপবিত্র আদর্শবিরোধী কাজ এই বাড়িতে চলবে না। এটা জ্ঞানপীঠ, সাধনপীঠ! পাশাপাশি চুপচাপ দু’জনে শুলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে?
