তুমি ওদের সামনে সেই গয়না বের করবে! বলিহারি তোমার বুদ্ধি! ঐশ্বর্যের প্রদর্শনী করতে আছে?
ওঁরা সবাই ভীষণ ভাল মানুষ, তুমি জানো না।
যতই ভাল মানুষ হন, কাঙালকে শাকের খেত দেখাতে আছে?
তুমি ওঁদের কাঙাল বলছ?
সংসারী মানুষ মাত্রেই কাঙাল। কখন কী অভাবে পড়বেন বলা যায়। তখন তোমার কাছে আসবেন সাহায্যের জন্যে। ফেরাতে পারবে না। দিতেই হবে।
বিপদে সাহায্য করা খারাপ?
সাহায্য তারাই করতে পারেন, যাঁদের অনেক আছে। আর অনেক যাঁদের আছে, তারা কখনই সাহায্য করবেন না। তারা থাকেন সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাঝামাঝি জায়গায় যাঁরা। আছেন তারাই মরেন। কত তুমি সাহায্য করবে? কজনকে তুমি সাহায্য করবে? একটু বুঝতে শেখো। অত হলহলে হলে চলবে না। পরিবারের গোপন কথা মানুষের মুখে মুখে ছড়ায়।
তুমি বড় সংসারী মুকু। বড় বেশি হিসেবি।
একজন বেহিসেবি হলে আর একজনকে তো হিসেবি হতেই হবে। তা না হলে ব্যালেন্স হবে কী করে? তোমার গয়নার লিস্ট আমি করে দোব। আজ রাতেই করে দোব। এখন চললা খেয়ে আসি।
দোরতাড়া বন্ধ করে রাস্তায় নেমে এলুম। কোথায় পা ফেলছিলুম জানি না, মুকু হাঁ হাঁ করে উঠল, দেখে দেখে, কীসের ওপর পা পড়ছে একবার দেখো। গোবর।
অতটা খেয়াল করিনি। সামলে নিলুম। মুকু শুধু হিসেবি নয়, সাবধানী। দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেছে। খোলা রাস্তা চলে গেছে সামনে পিছনে। ছাঁড়াছাড়া ল্যাম্পপোস্ট আলোর জাল ফেলে পোকা ধরছে। এ রকে ও রকে আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে মানুষ পড়ে আছে। মিষ্টির দোকানের বাইরে ভিয়েন শেষ করে হাওয়া খেতে বসেছেন ঘর্মাক্ত হালুইকর। আমাদের পাড়ার বিখ্যাত মাতাল শামুদা তাঁতের মাকুর মতো টলে টলে ফিরছেন, একবার এদিকে একবার ওদিকে। এইসময় সামনাসামনি পড়ে গেলেই মহা বিপদ। দু’কাধ ধরে প্রেম বোঝাবার চেষ্টা করবেন। প্রেম কাকে বলে। খাঁটি প্রেম। পেটে পড়লেই ভদ্রলোক প্রেমের লাইনে চলে যাবেন, অথচ বিয়ে করেননি। ভাল চাকরি করেন। সকালে ফিটফাট ভদ্র। যত রাত বাড়তে থাকে ততই রূপান্তর! মধ্যরাতে সম্পূর্ণ বেসামাল। মাঝে মাঝে গলা ছেড়ে গান ধরেন, মোর প্রিয়া হবে এসো রানি, দেব খোঁপায় তারার ফুল। সুন্দর গলা।
মুকুকে বললুম, পা চালাও।
মুকু বললে, কেন?
টলমলে ওই ভদ্রলোক অতিশয় বিপজ্জনক। একবার ধরলে আর রক্ষে নেই।
জানো, ষাঁড় দেখলে আমি ভয় পাই না। আমি মগের দেশের মেয়ে। বাবার হাত ধরে আরাকানের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বার্মা থেকে পালিয়ে এসেছিলুম।
কথায় কথায় শামুদা আমাদের দূর দিয়ে আপনমনে চলে গেলেন। পড়তি জমিদার বংশের ছেলে। ভারী সুন্দর দেখতে।
মুকু বললে, মাতালরা ছাতাকে ভীষণ ভয় পায়।
যাঃ, ছাতাকে কেন ভয় পাবে?
সত্যি! আমি পরীক্ষা করে দেখেছি। একদিন দুপুরবেলা হরি ঘোষ স্ট্রিটে আমাকে দেখে এক মাতালের প্রেম চাগিয়েছিল। আমার হাতে ছিল একটা ছাতা। ভটাস করে খুলতেই লোকটা ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে বললে, দেবী, দেবী, মাতা, জননী, বজ্রাঘাত কোরো না। জানো তো, বাঘ গুলির চেয়ে ভয় পায় হাচিকে? কেঁদো বাঘের সামনে ফাঁচ করে হেঁচে দেখো লেজ তুলে পালাবে! হাতিকে যদি পায়রার পালক দিয়ে সুড়সুড়ি দাও দুদ্দাড় করে পালাবে!
এসব তুমি পরীক্ষা করে দেখেছ?
ছাতাটা করেছি। বাকিগুলো শুনেছি।
আমরাও ঢুকছি, বিষ্টুদাও ঢুকছেন। মুকুর সঙ্গে পরিচয় ছিল না। পরিচয় করিয়ে দিলুম। বিষ্টুদা অসম্ভব খুশি হয়ে বললেন, ভগবান তোমাকে পাঠিয়েছেন মা। ছেলেটা মহা বিপদে পড়েছে, কেউ দেখার নেই। পরামর্শ দেবার মতো কেউ নেই। কী খাবে, কোথায় শোবে, তারও কোনও ঠিক নেই। তুমি এসে যে কী ভাল করেছ! চলো চলো ভেতরে চলো।
শিউলির গন্ধে উঠোন ভরে আছে। গাছ একেবারে ফুলে ফুলে সাদা। মা আর মেয়ে দু’জনেই বেরিয়ে এলেন। বউদি মুকুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, কী ভাল যে লাগছে! ঘর যেন আলো হয়ে গেল।
মুকু বললে, একটু বেশি বেশি হয়ে গেল। এ বাড়ির আলো আপনারা দুজনে।
বিষ্টুদা কুয়োতলায় দাঁড়িয়ে হুড়হুড় করে চান করছেন। শীতশীত রাত। ঠান্ডা না লেগে যায়। সবই মানুষের অভ্যাস। অপূর্ব খাওয়া হল। যেন কোনও উৎসবের ভোজ!
মুকু বললে, বউদি, আপনি আর টিপ এইবার বসে যান, আমি পরিবেশন করি।
পরিবেশন করার কিছুই নেই গো, সব আমরা গুছিয়ে রেখেছি। তুমি শুধু আমাদের সামনে জমিয়ে বোসো, গল্প করি আর খাই।
বিষ্টুদা বললেন, আর গল্প করার সময় নেই। রাত হয়েছে বেশ। চলো, তোমাদের পৌঁছে দিয়ে আসি।
বেরিয়ে আসার সময় মুকু বললে, দেখে রাখো, একেই বলে লক্ষ্মীর সংসার। ঠিক যেন একটা আশ্রম। শান্তিকুঞ্জ। ভীষণ ভাল লাগছে, মনে হচ্ছে এখানেই থেকে যাই।
বউদি বললেন, আজ রাতে না-ই বা গেলে। সবাই মিলে বেশ গল্প হবে।
কিন্তু! সেই আশি না কত ভরি সোনা! তারই টানে বাইরে তো রাত কাটানো যাবে না। ভীষণ চুরি হচ্ছে চারপাশে। যক্ষ হয়ে বিষয় আগলাতে হবে। বিছে হার, চন্দ্র হার, বাজু, বাউটি। মৃতাদের যত অলংকার।
২.০৫ Happiness is beneficial for the body
গভীর রাতকে মাঝে মাঝে মনে হয় কালো এক অশ্বারোহী। ছুটে চলেছে নতুন এক দিনের দিকে। কখনও মনে হয় জুয়াড়ি। প্রদীপের আলোয় মাথা নিচু করে বসে তিন তাস খেলছে। আগামী প্রভাত
