আমি আরও একটু যোগ করলুম, বাইরে থাকে। কলকাতায় এসেছে লেখাপড়া করার জন্যে।
বউদি নিজেই নিজের পরিচয় দিলেন, পিন্টু আমাকে বউদি বলে। এই আমার মেয়ে টিপ।
মুকু আমার দিকে তাকিয়ে বললে, যাও দেরি কোরো না। তোমার অনেক কাজ পড়ে আছে। বিকেলের সাজে বউদিকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। কালো কুচকুচে চুল। টানটান খোঁপা। ডুরে শাড়ি। টিপ বেশ কুঁচিয়ে শাড়ি পরেছে। চুলে বিনুনি। ফুলের মতো সুন্দর। আমি পায়ে পায়ে বেরিয়ে এলুম ঘরের বাইরে। মুকু বোধহয় দেখাতে চাইছে আমার ওপর তার কতটা কর্তৃত্ব! মুকুর ভিতরে একটা ডিক্টেটর বসে আছে। শীত আসছে। জল বেশ ঠান্ডা। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ভাবছি, ব্যাপারটা বেশ জটিল হল। বউদিকে এখন আমি কী বলব? মুকু যেভাবে হাল ধরেছে, সহজে টাল খাবার নয়। ঠাকুরঘরে প্রদীপ জ্বালালুম। একগোছা ধূপ। সারাবাড়ি গন্ধে ভরে গেল। আসনে বসামাত্রই মনটা অন্যরকম হয়ে গেল। এই আসন সাধকের আসন। বাবা বসতেন। কোনও আসনে দিনের পর দিন বসে অবিরত সৎ চিন্তা করলে, সেই আসনে শক্তি সঞ্চারিত হয়। সেই আসনে বসামাত্রই, আসন তাকে গ্রাস করে। অনধিকারী কেউ বসলে আসন তাকে ঠেলে ফেলে দেয়। একটা ঝিমঝিম শান্তির ভাব ছেয়ে আসছে শরীরে। মনে হচ্ছে, দেহের বাঁধন খুলে পড়ছে। কোথা থেকে কোথায় যেন চলেছি ভেসে ভেসে। এইভাবে অনেকক্ষণ বসে থাকা যেত, কিন্তু উঠে পড়তে হল।
ঘরে ঢুকে দেখি মেয়েদের মজলিশ বসে গেছে। মুকু মধ্যমণি। বউদি তার গায়ের ওপর হেসে গড়িয়ে পড়ছেন। টিপের মুখ উদ্ভাসিত। যাক, মুকু তা হলে মিশে গেছে!
বউদি বললেন, পুজো করে এলে?
মুকু বললে, ও তো ধ্যান-জপ নিয়েই থাকে। মাঝে মাঝে ভয় করে, সংসার ছেড়ে চলে না যায়!
বউদি বললেন, হবেই তো, এ যে সাধকের বাড়ি। রক্তে সাধনা আছে।
মুকুর কথায় অবাক হয়ে গেলুম। বলে কী! আমাকে ঠেলে কোথায় তুলছে! একটু আগে বললে, কাপুরুষ। পর্যাপ্ত তিরস্কার। এমন কথা নেই, যা বলেনি। এখন বলছে মহাপুরুষ।
মুকু বললে, চলো, রান্নাঘরে কোথায় কী আছে দেখে নিই। আজ তোমাকে বেশি কিছু খাওয়াতে পারব না, প্লেন অ্যান্ড সিম্পল খিচুড়ি।
বউদি বললেন, সে আর কী কথা! তোমরা আমার ওখানে খাবে। আমি এতক্ষণ সব রান্না করলুম কীসের জন্যে?
মুকু বললে, সে আপনি একজনের জন্যে করেছেন, আমার কথা তো ছিল না। ও তা হলে যাক। আমি আমার মতো ফুটিয়ে নিই।
বউদি খপ করে মুকুর হাতদুটো ধরে বললেন, এ তুমি কী কথা বলছ? অভিমানের কথা। তুমি যে আসবে আমার কি তা জানা ছিল? আর সংসারে কেউ ঠিক ঠিক একজনের জন্যে রাঁধে না। সংসার অনেককে নিয়ে। তোমাদের দুজনকেই আমরা ধরে নিয়ে যাব।
টিপ মুকুর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। জড়িয়ে ধরে বললে, তুমি কী সুন্দর! তুমি কত কী জানো? মুকুদি, তুমি আমাকে পড়াবে? আমার খুব লেখাপড়া করতে ইচ্ছে করে।
আমি যদি এখানে থাকি নিশ্চয় পড়াব তোমাকে। তুমি এত সুন্দর মেয়ে!
বউদি বললেন, আজ তা হলে তোমার সেইসব জিনিসপত্তর মেলানো হচ্ছে না?
আজ আর থাক বউদি। হাঙ্গামা করে দরকার নেই। মুকু এসেছে। যা করার কালই হবে।
আমি তা হলে একটু চায়ের চেষ্টা করি। মনটা চা-চা করছে।
বউদি বললেন, রাত নটার সময় আর চা খায় না। আমাদের বাড়িতে চলল। তখন দেখা যাবে।
এত তাড়াতাড়ি গিয়ে কী হবে? বিষ্টুদার দোকান বন্ধ হতে হতে সেই রাত এগারোটা!
ওর জন্য বসে থাকবে নাকি?
থাকব না! বিষ্টুদা ছাড়া কিছু জমে! ফাঁকাকাঁকা লাগবে।
মুকু বলল, বউদি, আপনারা এগিয়ে যান, আমরা দশটার মধ্যে যাচ্ছি।
নীচে পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেলুম। যাবার সময় টিপ বলল, মুকুদিকে আমার ভীষণ ভাল লেগে গেছে। আমি কিন্তু মাঝে মাঝে আসব।
মাঝে মাঝে কেন, তুমি রোজই এসো। তোমরা এলে আমার খুব ভাল লাগবে।
বউদি কানে কানে বললেন, তোমার কেমন বোন? সত্যি বলো তো? দূর সম্পর্কের?
আমার জ্যাঠাইমার বোনের ছোট মেয়ে।
বুঝেছি। বউদি মুখ টিপে একটু হাসলেন! আমার হাতে সামান্য চাপ দিয়ে বললেন, তা ভালই। শাসন করতে জানে।
মুকু দাঁড়িয়ে আছে খোলা জানলার সামনে। ঢুকতেই ফিরে তাকাল। ডুরে শাড়িটা বিছানার ওপর ছড়ানো। মুকু রাগরাগ গলায় বলল, নিজের সিদ্ধান্তে নিজে আসতে পারো না? নিজেকে ছড়িয়ে ফেলার অদ্ভুত ক্ষমতা তোমার। গোপনীয়তা রাখতে জানো না? ওঁরা কী করতে এসেছিলেন? যেখানে বাঘের ভয় সেইখানেই সন্ধে হয়। কাকিমা গেলেন তো বউদি এলেন। সঙ্গে আবার পরি! কিছু পারো বটে!
কী করব বলো, সকালে আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কী করি, কোথায় যাই।
আমি কি মরে গিয়েছিলুম? আমার কাছে আসতে তোমার কী হয়েছিল?
তোমার কাছে যাব বলেই তো বেরিয়েছিলুম। বাসস্টপে বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে এলুম। তখন আমার মন একেবারে ভেঙে গেছে।
তোমার মন কবে আস্ত ছিল? না ভোগে, না যোগে, আরশোলার মতো ফড়ফড় করে উড়ছে একবার এ দেয়াল একবার ও দেয়ালে। নিজেকে আগে একটু স্থির করো তো! তা না হলে তোমার সব যাবে। ভেসে যাবে।
মুকু, তুমি আমাকে আর বোকো না। বিশ্বাস করো, আমার মন ভীষণ খারাপ হয়ে আছে।
সেইজন্যেই তো উত্তম-মধ্যম দিচ্ছি। তোমার মনটাকে ঘোরাবার চেষ্টা করছি। ওরা কী গোছগাছ করতে এসেছিল?
বাড়িতে অনেক সোনার গয়না রয়েছে। ওইভাবে তো ফেলে রাখা যায় না। বিষ্টুদা বলছিলেন, একটা লিস্টি করে ব্যাঙ্কে জমা করে দাও।
