মহলার শব্দে পাড়া কাঁপছে। হঠাৎ মনে হল, হেমন্তর সঙ্গে আমার তফাত কোথায়? সৎ, সাত্ত্বিক, আদর্শবান, আচার্যস্বরূপ এক মানুষকে দেশত্যাগী করে নিজে আঁকিয়ে বসেছি জমিদারের মতো। লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, সবই আমার আছে পুরোমাত্রায়। সর্বোপরি ভীরু। নিরাপদ নিশ্চিত আশ্রয় ছেড়ে নড়তে চাইছি না।
মুকু সোজা এগিয়ে গেল কাপড়জামার আলমারির দিকে। এক টানে পাল্লাটা খুলে ফেলল। নাড়ানাড়ি করল খানিক। টেনে বার করল একটা শাড়ি। সেই ফিকে হলুদ রঙের শাড়িটা, যেটা আমি কাকিমাকে পুজোয় দোব বলে কিনেছিলুম। দেওয়া আর হল না।
মুকু শাড়িটা তুলে ধরে বললে, এটা কার? তোমার সেই কাকিমায়ের?
সহসা উত্তর দিতে পারলুম না। আমতা আমতা করে বললুম, পুজোর সময় দোব বলে কিনেছিলুম।
দিলে না কেন?
পরিস্থিতি বদলে গেল।
মুকু খাটে বসল। শাড়িটা কোলের ওপর। প্রশ্ন করল, সত্যি কথা বলো তো, ওই মহিলার সঙ্গে। তোমার সম্পর্কটা কী ছিল? আমি তোমার কনফেশন চাইছি।
কেন প্রশ্ন করছ মুকু? তুমি তো জানো। তুমি তো অনুমান করতে পারো। আমি একটু খারাপ হয়ে গিয়েছিলুম। এখন আবার ঠিক হয়ে গেছি।
তোমার লজ্জা করেনি? নিজের ওপর ঘৃণা আসেনি?
এসেছে। সামলাতে পারিনি নিজেকে।
তুমি না সন্ন্যাসী হবার স্বপ্ন দেখো? কথায় কথায় শঙ্কর, বুদ্ধ, শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দের কথা বলো। তোমার লজ্জা করে না! বুঝতে পারো না তুমি কত ঘিনঘিনে! তুমি একটা পারভার্ট! আমার কাছে খুব বোলচাল মেরেছিলে। মুকু, আমি ব্রহ্মচারী। আমার পথ ভোগের নয় যোগের! কত রঙ্গই না জানেনা! এইভাবে চললে, তুমি কোথায় শেষ করবে জানো কি? বেশ্যালয়ে।
আমি চিৎকার করে উঠলুম, মুকু!
এ তোমার আর্তনাদ, ধমক নয়। নিজের কাছে নিজেই ধরা পড়ে গেছ। এইবার আমি তোমাকে ধরব। আমাকে তুমি চিনতে পারোনি এখনও। আমি তোমার বাবার প্রতিনিধি।
তিনি কি তোমাকে পছন্দ করতেন?
না, করতেন না। তার প্রধান কারণ তুমি। তুমি যে কত দুর্বল চরিত্রের তিনি তা জানতেন। যে-কোনও মেয়ে একটা টুসকিতে তোমার ঠাটঠমকের দুর্গ ভেঙে দিতে পারে। প্রমাণ চাও? দেখবে, এখুনি তোমার কী করুণ অবস্থা আমি করে দিতে পারি? দেখতে চাও?
মুকুর হাতদুটো আমি ধরে ফেললুম, আমাকে তুমি বাঁচাও। তুমি আমাকে পড়ে ফেলেছ মুকু, খোলা বইয়ের মতো। আমি উচ্ছিষ্ট হয়ে গেছি। এঁটো হয়ে গেছি। অপবিত্র হয়ে গেছি।
তুমি খুব বিপজ্জনক হয়ে উঠেছ। মেয়েরা যে ধরনের চরিত্রকে ভয় পায়, ঘৃণা করে, তুমি ক্রমশই সেই ধরনের একটি চরিত্র হয়ে উঠছ। এই হলে জীবনে তুমি কোনওদিন সুখী হতে পারবে না, সুখীও করতে পারবে না কারওকে। শেষ পরিণতি আত্মহত্যা। আমার হাত ছাড়ো। তুমি কাপছ?
ভয়ে ভয়ে হাত ছেড়ে দিলুম। মুকুর চোখে নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। অক্ষমের লেখা উপন্যাসের মতো অপাঠ্য।
মুকু বললে, ওই ঘরে ঠাকুরের কাছে আজ প্রদীপ ধূপ জ্বালিয়েছিলে?
না।
কেন?
আমরা তো এই সবে এলুম।
কথাটা তোমার মনে ছিল?
বোধহয় না।
নিষ্ঠা বলে একটা শব্দ আছে, জানো?
জানি।
তোমার কি তা আছে? একটা জিনিস তুমি কতদিন ধরে থাকতে পারো, হিসেব করে দেখেছ?
বেশিদিন পারি না।
তোমার স্বভাব হল মাছির স্বভাব। একবার এখানে বসছ, একবার ওখানে বসছ। কখনও ফুলে, কখনও গুয়ে। নতুন নতুন খেয়ালের পেছনে ছুটছ। নতুন নতুন মেয়ে। গলে যাওয়া আইসক্রিমের মতো বসে না থেকে উঠে পড়ো। বাথরুমে গিয়ে চান করো ভাল করে। ঠাকুরের জায়গায় প্রদীপ জ্বালো। ধূপ দাও। কিছুক্ষণ চুপচাপ আসনে বসে থাকো চোখ বুজিয়ে। রুটিন থেকে সরে গেলে চলবে না। আমি এই শাড়িটা পরছি।
তুমি হস্টেলে ফিরবে না?
একবার বলেছি, না। বারেবারে একই প্রশ্ন আমার ভাল লাগে না। কাল সকালে গিয়ে আমার মালপত্র সব নিয়ে চলে আসব চিরকালের জন্যে।
আমাকে তো দেরাদুনে ট্রান্সফার করেছে।
সে তো আরও ভাল। দু’জনেই যাব।
তোমার এম এ?
বিয়ের পর চিন্তা করা যাবে। দেরাদুন থেকে হরিদ্বার খুব কাছে। হৃষিকেশ, লছমনঝোলা, রুদ্রপ্রয়াগ, দেবপ্রয়াগ। আমরা বাবাকে খুঁজতে বেরোব। আশ্রমে আশ্রমে। ঠিক পেয়ে যাব। পাহাড়, নদী, ঝরনা, এই তিনের মধ্যেই তো তিনি ঈশ্বরকে দেখেছিলেন। তাড়াতাড়ি বাথরুমে যাও। তোমার পরে আমি যাব।
সদরের কড়া নড়ে উঠল। আমরা দু’জনে স্তব্ধ হয়ে গেলুম। তিনি ফিরে এলেন নাকি? আমি ফিসফিস করে বললুম, কে বলো তো? বাবা?
কড়া নাড়ার ধরন দেখে বুঝতে পারছ না! এলোমেলো। ছন্দ নেই। কড়া নাড়ার ধরন দেখে ব্যক্তিত্ব বোঝা যায়। নতুন কেউ। ভয়ে ভয়ে নাড়ছে। যাও দেখে এসো।
দরজা খুলে অবাক হয়ে গেলুম। দাঁড়িয়ে আছেন টিপ আর টিপের মা।
বউদি বললেন, কত রাত হয়ে গেল! আরও একটু আগে আসা উচিত ছিল।
টিপ বললে, মাকে আমি সেই সন্ধে থেকে তাড়া লাগাচ্ছি, চলো, চলো, চলো। কাজ যেন আর শেষই হয় না।
বউদি বললেন, চলো, তোমার কোথায় কী আছে, সব গুছিয়ে নিয়ে একেবারে চলে যাই। তোমার জন্যে একটু অন্যরকম রাঁধতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। বেশিরভাগ রান্নাই অবশ্য টিপ বেঁধেছে। বললে, পিন্টুদাকে আজ জন্মদিনের খাওয়া খাওয়াব।
আমার গলা শুকিয়ে আসছে। মুকু তো আমাকে যেতে দেবে না। সবাই ওপরে উঠে এলুম। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে মুকু রাজমহিষীর মতো। টিপ, ইতু বউদি দু’জনেই থতমত খেয়ে গেছেন। মুখেচোখে একটা অপ্রস্তুত ভাব। সেই ভাবটা কাটাবার জন্যে আমি তাড়াতাড়ি পরিচয় করিয়ে দিলুম, আমার মাসতুতো বোন মুকু। মুকু দু’হাত তুলে নমস্কার করল।
