বাবা, তোমার গরম জল কি এখন আনব?
গরম জল? আচ্ছা নিয়ে আয়।
আমার পিতার হঠাৎ খেয়াল হল কনকের পিতার এই অসময়ে গরম জল আবার কী হবে? প্রশ্ন করলেন, গরম জল কী হবে? চান করবেন?
না না। গরম জল খাব।
কেন চা?
চা আমার চলে না। যৌবনে বিশ কাপ, পঁচিশ কাপ ডেলি খেয়েছি। লিভার পাকতেড়ে মেরে গেছে। রোজ সন্ধের দিকে অম্বল। ডা. রায়ের প্রেসক্রিপশন– গরম জল।
চায়ে লিভার খারাপ করে এ থিয়োরি আপনি কোথায় পেলেন?
প্র্যাকটিক্যাল করে সিদ্ধান্তে এসেছি।
আপনার লিভার তো মশাই ডাক্তারের বাবার ক্ষমতা নেই খুঁজে বের করে। সাত-আট লেয়ার চর্বির তলায় যেভাবে চাপা পড়ে আছে! ওটাকে ওভাবে বাড়তে দিলেন কেন? উত্তরপ্রদেশ বড় করুন। কাজে লাগবে। মগজটাই তো সব। অবশ্য ভারতবর্ষের জিওগ্রাফিতে মধ্যপ্রদেশই বড়।
এ কি আর ইচ্ছে করে করেছি দাদা! মেড বাই অম্বল। আপনি কিন্তু চেহারাটাকে বেশ ফিট রেখেছেন!
রাখার কৌশল আছে। জানতে হয়। সবকিছুই সাধনার ব্যাপার। আছেন তো এক মাস। আপনাকে একটা চেহারা দেখাব।
ওসব ব্যায়ামবীরদের কথা আমাকে বলবেন না। এনাফ অফ দেম। ফ্যাশানেবল স্ত্রী আর মাসলম্যান, দে আর গুড ফর নাথিং।
আরে না মশাই, ওসব দেহধর ফেহধরদের আমিও জানি। তেল মেখে আলোর সামনে দাঁড়িয়ে পেশি নাচানো ছাড়া তারা আর কিছু জানে না। আপনাকে একটা সিস্টেম দেখাব। আমাদের ন্যাশন্যাল ফুটের মতো ঝনঝনে।
ন্যাশন্যাল ফুট কী জিনিস? কাঁঠাল? যা আমরা এতকাল ধরে পরস্পর পরস্পরের মাথায় ভেঙে আসছি। যা চিরকাল গাছেই থেকে গেল আর আমরা গোঁফে তেল দিয়ে দিয়ে তেল ফুরিয়ে। ফেললুম।
মন্দ বলেননি। কাঁঠালের জাতীয় ফল হবার সব গুণই আছে। তবে আমি জাতীয় ফল করে রেখেছি আমড়াকে। আদর্শ বাঙালি চরিত্র। আঁটি চর্মসার। দাঁতে ঠেকান, বাপ বলে লাফিয়ে উঠতে হবে। ওই যে বসে আছে। তাকিয়ে দেখুন। নিশ্চিন্ত আরামে। হাত পা এলিয়ে। চোখের দৃষ্টি দেখুন। উদাস, নিরালম্ব। যেন এন্ড অফ দি ওয়ার্লডে পৌঁছে গেছে। গান ধরলেই হয়, হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল। ওই হল দিশি আমড়া।
ওর সিস্টেম কি খুব ভাল?
কনক কাঁচের গেলাসে গরম জল এনে সামনের টেবিলে রেখে চলে যেতে যেতে আমার দিকে তাকাল। এক ফুটের গরম জল দেখলেই বোঝা যায়। বুজকুড়ি ভাসছে। অনেকটা মায়ার গালের যুবতী ব্রণের মতো। মেয়েদের গালে ব্রণ এলেই বুঝতে হবে আম গাছে মুকুল এসেছে। মউ মউ সুবাস। ভ্রমরের ভ্যানর ভ্যানর। তোমার মুখে জুতো। কেন? কে তুমি? আমি তোমার সাত্ত্বিক মন। এত তুলোধানা হয়েও তোর শিক্ষা হয় না রে! মন ছুটছে মায়াপুর।
কাআ তরুবর পঞ্চবি ডাল
চঞ্চল চীত্র পইঠো কাল ॥
তোর দেহ থেকে পাঁচটা ডাল পাঁচ পাশে হাত বাড়িয়ে উদম নৃত্য করছে, মনের অঙ্গনে ঢুকে বসে আছে মহাকাল। মন তুই কৃষ্ণ কথা বল, কৃষ্ণ কথা বল।
ওর সিস্টেম? পিতা চায়ে চুমুক দিয়ে এমন একটা মুখ করলেন যেন পৃথিবীর বাইরে অন্ধকার মহাশূন্যে ভেলায় চেপে বেড়াতে বেরিয়েছেন। দু’হাতে কাপডিশ। কাপ ডিশ থেকে ইঞ্চিখানেক ওপরে ঝুলছে। আবার বললেন, অনেকটা ঘুমঘোরে, ওর সিস্টেম? আহারে অনাহার, শ্রমে বিশ্রাম, চিন্তায় নিশ্চিন্তা, দর্শনে অদর্শন, ভাবে বিভাব, উনি এক শাপভ্রষ্ট মহাপুরুষ। দয়া করে পাটকাঠি সদৃশ এক দেহাধারে ধরা পড়েছেন। একদিন মট করে ভাঙবেন আর উড়ে চলে যাবেন। আমি যার কথা বলছি তিনি এ পাড়ায় থাকেন, নাম মেনিবাবু। জীবনে একবারও অসুস্থ হননি। শরীর কঞ্চির মতো। মন ধারালো তলোয়ারের মতো। বায়ুর বেগে চলেন। তড়িৎ বেগে কথা বলেন। খাদ্য? চা আর জর্দাপান। কী আপনি লিভার লিভার করছেন? জেনে রাখুন শরীরের নাম মহাশয়, যা সহাবে তাই সয়।
মেসোমশাই গরম জল খেতে লাগলেন। পিতা উঠে পড়লেন চেয়ার ঠেলে। বসবার সময় কোথায়? কথায় কথায় বলেন, আই হ্যাভ নো টাইম টু স্ট্যান্ড অ্যান্ড স্টেয়ার। রান্নামহল থেকে হাঁক এল, চলে এসো। অন্যদিন হলে এই ডাকে আমার ময়দা মাখা শুরু হবার কথা। দু’কৌটো ময়দা, মাঝে গাব্ব তৈরি করে দু’চামচে ভাদুয়া, একটু নুন। নাও ঠেসে যাও। ঠাসতে ঠাসতে হাতের কবজি, কাধ টনটন করতে থাকবে। ততক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে যতক্ষণ না হুকুম হয়, স্টপ।
ভেতরের দরজার পাশে কনক চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, এখন কী হবে?
একের পর এক নাটকের অঙ্ক হয়ে চলেছে সেই উত্তীর্ণ সন্ধ্যা থেকে। পরদা পড়ছে আর উঠছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ছড়ানো-ছেটানো জিনিস দেখে বললেন, একী, এয়াররেড হয়ে গেছে নাকি? কনক, মুকু আর মেসোমশাইকে সামনে দেখে বললেন, আপনারা আবার কে? চেনাচিনি হয়ে যাবার পর হাওয়া মোটামুটি ধীরেই বইছিল। আবার ঝড় বইতে শুরু করেছে।
সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বেশ উঁচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন, দুপুরে অতিথিদের কী ব্যবস্থা করেছিলে? কিছু জুটেছিল?
আজ্ঞে হ্যাঁ। সবই তো ছিল। ওঁরাই সব তৈরিটৈরি করে নিলেন।
তা হলে রাতের ব্যবস্থা করা যাক। ওঁরা কী আহারাদি করবেন জানতে পারলে ভাল হত।
অন্ধকার থেকে কনক সাহস করে এগিয়ে এল। পিতা যেন আশার আলো দেখতে পেলেন, এই যে কাঞ্চন, তোমরা রাতে কী খাবে?
উত্তর দেবার আগে কনক নামটা সংশোধন করাবার জন্যে বললে, আজ্ঞে আমি কনক।
