আজ্ঞে না! তিনি আমাকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। পছন্দ করতেন না তোমাকে। তোমার ঘিনঘিনে শতখণ্ড ব্যক্তিত্বকে। তোমার ওই মাকড়সার জাল আমি ছিঁড়বই। যা হতে পারবে না কোনওদিন সেই হওয়ার চেষ্টা থেকে তোমাকে আমি ফেরাব। তুমি আমার চ্যালেঞ্জ। আমি এইখানে থাকব। ওই পাঁচজনের নাকের ডগা দিয়ে তোমাকে নিয়ে আমি ঘুরব। এমনভাবে ঘুরব, লোকে যাতে মনে করতে না পারে, আমরা ভাইবোন। মনে করুক চরিত্রহীন দুটো ছেলেমেয়ে। বিয়ে না করেই। স্বামী-স্ত্রীর মতো থাকছে।
আমাদের পরিবারের মুখে চুনকালি পড়বে!
কারা দেবে সেই চুনকালি? যাদের নিজেদের মুখেই কালি। সেই তারা, যারা মেসোমশাইকে নোংরা বই আর কুৎসিত চিঠি পাঠিয়েছিল? তোমার বাবা, তোমার দাদু কখনও ভয় পেতেন না। তারাই ছিলেন প্রকৃত সাহসী, মহাপুরুষ। কী তুমি গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীর কথা বলছ! তোমাকে আজ রাতেই গেরুয়া পরিয়ে দিলে, সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী হয়ে যাবে! তোমাকে যদি আমি জড়িয়ে ধরি? তোমার সামনে দাঁড়িয়ে যদি আমি একে একে সব খুলতে থাকি?
মুকুর হাবভাব দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলুম। মাঝে মাঝে ভয় হয় মানসিকভাবে ও সুস্থ কি না! ভয় হয় হিচককের ছবির চরিত্র না হয়ে ওঠে। কিছুই হয়তো বোঝা গেল না, ঝপ করে বুকে ছুরি বসিয়ে দিল, কি গলা টিপে ধরল! মনের ব্যাপার নদীর মতোই, কখন কোন ধারায় বইবে! এমন একরোখা মেয়ে সহসা দেখা যায় না। মুকু আমাকে হতবাক করে রেখে পাশের ঘরে চলে গেল। আলমারি খোলার শব্দ পেলুম। মুকু সবই জানে কোথায় কী আছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললে, একটা শাড়িটাড়ি কিছু দেবে তো! না কি এই বিয়ের পোশাকেই রান্নাঘরে ঢুকব?
তুমি তো জানেনা কোথায় কী আছে।
জানি বলেই জিজ্ঞেস করছি। শাড়ি এ বাড়িতে পাব কোথায়? শাড়ি পরার মানুষ কোথায়?
হঠাৎ মনে পড়ল কার বিবাহে উপহার দেওয়া হবে বলে একটা শাড়ি কেনা হয়েছিল, কিন্তু যাওয়া আর হয়নি। সেই শাড়িটা কি তা হলে মুকুর জন্যেই আছে! নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে রেখেছে। যেমন পুজো পাবেন বলে ঈশ্বর পৃথিবীতে ফুলের বাগান করে রেখেছেন।
২.০৪ What if the Universe wears a mask?
সেতারের রিমঝিম ঝালার মতো রাত বাড়ছে। স্বস্তি তো কিছুই ছিল না, অস্বস্তি আরও বাড়ছে। মুকুর উত্তম-মধ্যম তিরস্কারে আমার ভণ্ডামির মুখোশ খুলে পড়ে যাবার উপক্রম। সারা ঘরে পায়চারি করছে। কখনও থমকে দাঁড়াচ্ছে জানলার সামনে। বাইরে রাতের পরদা ঝুলছে, তারার চুমকি বসানো। মোড়ের মাথায় খেয়ালি সঙ্ঘ। সেখানে উত্তরা নাটকের মহলা চলেছে। প্রবীণ আর নবীনদের দল। এই প্রথম দলে একজন মহিলা এসেছেন। এ পাড়ার দুঃসাহসী সুন্দরী মেয়ে। তার নাম মুক্তি। মুকু আর মুক্তি প্রায় একরকম। দু’জনেই সমান স্বাধীন। সমান সুন্দরী। মুক্তি আমাদের ক্লাসেই পড়ত। স্কুল থেকেই সে আগুন জ্বালিয়ে আসছে। এক শিক্ষক মহাশয়ের কোচিং ক্লাস ছিল। আমরাও সেখানে পড়তুম। সেই শিক্ষকের খুব ক্ষমতা ছিল। তিনি টেস্ট পরীক্ষা ও ফাঁইনাল ম্যাট্রিক পরীক্ষার প্রশ্ন আউট করতে পারতেন। তাই তার খুব পসার ও প্রতিপত্তি ছিল। একদিন মহা হইচই। শোনা গেল, সেই শিক্ষকমহাশয় মুক্তিকে কোলে বসিয়ে খুব ঘাঁটুঘাটু করছেন। আমরা, যারা কাঙালের দল, চেল্লাচিল্লি শুরু করে দিলুম। আমাদের স্কুলে ছাত্র-আন্দোলনের সেই সূত্রপাত। চরিত্রহীন শিক্ষকের পদত্যাগ চাই। শুধু পদত্যাগ নয়, শিক্ষকমহাশয়ের মাথা কামিয়ে ঘোল ঢেলে মিছিলে ঘোরানো হবে। বামপন্থী রাজনীতি তখন মাথা তুলতে শুরু করেছে। ছাত্রদের আর সেই প্রাচীন মেজাজ নেই। শিক্ষাগুরুর সামনে কেঁচো হয়ে থাকার দিন শেষ। প্রথমে হল ছাত্র ধর্মঘট। চিৎকার, চেঁচামেচি। ছাত্রনেতার জ্বালাময়ী বক্তৃতা। প্রধানশিক্ষক ঘেরাও। অতঃপর চেয়ার টেবিল ভাঙাভাঙি, অবশেষে ছোট মাপের কয়েকটা বোমা ফাটানো। সেই সময় স্কুলে একটা শাস্তি প্রচলিত ছিল, রাস্টিকেট করা। তিন নেতাকে সেই শাস্তি দেওয়া হল। ছাত্র-আন্দোলন আরও জোরদার হল। দিনের পর দিন স্কুল বন্ধ। শেষে সেই মুক্তিকামী শিক্ষককে স্কুলের কম্পাউন্ডে ঘেরাও করা হল। কুৎসিত গালিগালাজ, দু’-একটা চড়চাপড়। ব্রহ্মতালুতে চাটা। শিক্ষকের ভাবমূর্তি চটকানো। শিক্ষককে শেষপর্যন্ত অপমানের বোঝা নিয়ে সরতে হল। পরে জেনেছিলুম, ব্যাপারটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। একটা ষড়যন্ত্র। অপূর্ব সেই রহস্যজাল! শিক্ষকমশাই যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন, সেই বাড়িটা ছিল পুরনো আমলের বিশাল বাড়ি। মুক্তির বাবা ওষুধের কারবার করে বেশ দু’পয়সা করেছিলেন। তিনি বেশ দাও মেরে বাড়িটা কিনলেন। ভেতর ভেতর হাত বদল। মাস্টারমশাই গোটা চল্লিশ টাকা ভাড়ায় অত বড় একটা বাড়ি ভোগ করছিলেন। তাকে তো তুলতে হবে। যেমন বাপ তার তেমন মেয়ে। টাকার চেয়ে বড় দুনিয়ায় আর কী আছে! আমাদের সঙ্গে হেমন্ত বলে একটা ছেলে পড়ত। মহা তেওঁটে। সেই প্রথম রটালে। সন্ধের মুখে ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখে।
কী দেখে!
সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল। আদিরসই শ্রেষ্ঠ রস। কোথায় লাগে খেজুর রস! হেমন্ত মনে মনে যা করতে চায়, সবই করিয়ে দিলে সেই নিরীহ সৎ শিক্ষককে দিয়ে। হেমন্ত আড়াল থেকে দেখছে মুক্তির অন্তর অঙ্গ। আমাদের ধমনীতে রক্ত টগবগ করে উঠল। কান গরম, চোখ লাল। সেই অঙ্কুরিত বয়সে ওইসব বর্ণনায় মানুষ পাগল হয়ে যায়। শুনতে শুনতে প্রদ্যোত আমাকে জড়িয়ে ধরে গাল। কামড়ে দিলে, যেন আমিই মুক্তি। মাঝখান থেকে হল কী? হেমন্তর নতুন একটা সাইকেল হল। ঠেলাগাড়িতে রাজ্যের মাল তুলে শিক্ষকমশাই চলে গেলেন পাড়া ছেড়ে। সেই দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসছে। চৈত্রের দুপুর। গাজনের গেরুয়া সন্ন্যাসীরা পথে হাঁকছেন, বাবা তারকনাথের চরণের সেবায় লাগি। ঠেলা চলেছে, পেছনে বিবর্ণ একটি ছাতা মাথায় মাস্টারমশাই হাঁটছেন। আর মুক্তি রাতারাতি হয়ে গেল নায়িকা। গৌরব বেড়ে গেল তার। ছেলেদের মধ্যে লাঠালাঠি, ফাটাফাটি। সবাই মুক্তির প্রেমিক হতে চায়।
