মুকু টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল। বই খাতা সব সুন্দর করে সাজানো। একপাশে পড়ে আছে। পার্কার কলম। সুন্দর সুন্দর পেপারওয়েট। কিছুকাল হল বাবা মডেলিং নিয়ে মেতেছিলেন। মাটি দিয়ে তৈরি করছিলেন নানা মূর্তি। হেলাফেলার নয়। সুন্দর কাজ। টেবিলের ওপর সম্প্রতি তৈরি একটা মূর্তি রয়েছে। দু’হাত তুলে এক বাউল নাচছে। মুকু টেবিলল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিল। নীল সিল্কের কাপড়ের শেড। মায়াবী আলোয় একটা সুখের ভাব। মুকুর মুখে ছায়া পড়েছে। চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। মাথার দু’পাশে এলো চুলের ঢল। কলমটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে মুকুর চোখে আবার জল এসে গেল।
আমি কেন মুকুর মতো কাঁদতে পারছি না! আমার ভেতরটা ক্রমশই কেন শান্ত হয়ে আসছে! আমার অনুভূতি কি মরে যাচ্ছে! মুকু কলমটা সযত্নে সাবধানে রেখে শোয়ার ঘরের দিকে চলে গেল। আমি একটা অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে পড়ে খানিক পায়চারি করে নিলুম। তারপর মনে হল মুকুর খিদে পেয়েছে। কিছু একটা ব্যবস্থা করা দরকার।
বাবার বিছানায় মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে পড়ে আছে মুকু। আমি আস্তে আস্তে তার পিঠে হাত রেখে বললুম, কিছু একটা খাবে তো? তোমার খিদে পেয়েছে!
মুকু পাশ ফিরে বললে, আর আমার খিদে নেই।
মুকু এমন একটা ভঙ্গিতে শুয়ে আছে মনে হচ্ছে আমিও শুয়ে পড়ি তার পাশে, তারপর যা হয় হবে। যা ঘটে ঘটুক। ভবিষ্যৎ এখন আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আজই আমার বিয়ের রাত হোক না, ক্ষতি কী! আমাকে বাধা দেবার তো কেউ নেই। মন, ভেবে দেখো, মাত্র এক বিঘত দূরে এক মোহময়ী নারী। সারা শরীরে যার যৌবন খেলা করছে জোয়ারের জলের মতো। নির্জন, নিস্তব্ধ বাড়ি। একবার যদি সেইভাবে স্পর্শ করি ক্ষতি কী! স্বর্গসুখ তো কয়েক মুহূর্ত দূরে! হাতদুটো শুধু এগিয়ে যাক। কিছুক্ষণের মতো তুমি তোমার পরিবেশ ও জগৎ ভুলে থাকতে পারবে। দুঃখ ও দুশ্চিন্তার ওপর প্রেমের প্রলেপ নেমে আসবে। আবেগের ঝড়ে খড়কুটোর মতো সব উড়ে যাবে।
প্রায় আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছিলুম, এমন সময় মুকু ঝট করে উঠে বসল। গোলাপি আঁচল খুলে পড়ল। ভয়ংকর সেই দৃশ্য থেকে জোর করে চোখ সরালুম। প্রলোভন কী সাংঘাতিক জিনিস! চরিত্রকে দুর্ভেদ্য করতে হলে মানুষকে কোন লগ্নে জন্ম নিতে হয়! আজ বুঝতে পারছি, আমি সেইরকম কোনও লগ্নে জন্মাইনি। আমি শের নই, চুহা। বেড়াল আমাকে আধমরা করে একপাশে ফেলে রেখে নিজের থাবা চাটছে। আমার মনে হয় মূষিকলগ্নে জন্ম। আমি সকালেই আশ্রমে চলে যেতে পারতুম, স্বামী নির্মলানন্দজির কাছে। সেখানে গেলে, আজ আমি যে বিড়ম্বনায় পড়েছি তার চিরসমাধান হয়ে যেত। আমাকে তিনি শক্ত মুঠোয় ধরতে পারতেন। আমি সেই পথে না গিয়ে, গেলুম বিষ্টুদার কাছে পরামর্শ নিতে। সেখান থেকে বিষ্টুদার বাড়িতে। মনে জড়িয়ে নিয়ে এলুম টিপকে। আমার মনের খবর কেউ জানে না। একমাত্র আমিই জানি। মুকু কি জানে, এই মুহূর্তে আমার অন্তরআত্মা কীসের জন্যে আকুলি-বিকুলি করছে! আমি যেন এক চামচ ঘি, আগুনে পড়ার জন্যে ছটফট করছি। একটা দেয়ালি পোকা!
মুকু সচেতন হয়ে গুছিয়ে নিল নিজেকে। বুঝতে পেরেছে আমি টলছি, যে-কোনও মুহূর্তে আঁপিয়ে পড়তে পারি।
মুকু বললে, তোমার রাতের কী ব্যবস্থা।
ব্যবস্থা মানে?
রান্নাবান্নার কী ব্যবস্থা করেছ?
কিছুই না!
সকালে কী করেছিলে?
নির্জলা একটা মিথ্যে কথা বেরিয়ে এল, কিছুই না। চর্ব-চুষ্য খেয়েছি, একথা বলা গেল না। নিজের শোক তা হলে যে তরল হয়ে যায়।
সারাদিন উপোস করে আছ?
ওই টুকটাক যা হয় কিছু খেয়ে নিয়েছি।
রান্নাঘরে কী মজুত আছে?
সবই আছে।
তা হলে চলো, রান্না বসাই। প্লেন অ্যান্ড সিম্পল খিচুড়ি।
ঘড়িটা দেখেছ? তোমাকে তো এখুনি ফিরতে হবে। তা না হলে তোমাকে আর ঢুকতে দেবে না।
মুকু চাবুকের মতো উত্তর দিল, আমি যদি আর না ফিরি? মেসোমশাই আমাকে এই বাড়িতেই থাকতে বলেছিলেন।
তখন তিনি ছিলেন, এখন যে আমি একলা! পাঁচজনে কী বলবে?
পাঁচজন? সেই পাঁচজন কারা?
পাড়াপ্রতিবেশী।
তারা তোমার চরিত্রে কলঙ্ক দেবে? তাই তো! ভণ্ড তপস্বী! সন্ন্যাসী হবে! ভগবানের সঙ্গে শেকহ্যান্ড করবে শয়তান! আমার পবিত্র শিউলি ফুল! তোমার সেই কাকিমার সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক ছিল! সাহস থাকে তো সত্য কথা বলবে? আমার দিদিকে তুমি কী চোখে দেখেছিলে? পবিত্র সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর চোখে? তুমি ভাবো তোমাকে আমি চিনি না! ভণ্ডামির একটা সীমা আছে। তোমার মস্ত সুবিধে করে দিয়েছিল ওই বাঁজা মেয়েছেলেটা। তোমার আদরের কাকিমা। তোমার ওই বকধর্মের চোটে তোমার বাবাকে সব ছেড়ে পালাতে হয়েছে। তুমি তাকে তাড়িয়েছ! আমি সব বুঝি। তুমি আমার দিদির পেছনে ঘেঁকছোঁক করতে। সেও আমি জানি। চোখ উলটে ধ্যান, সাধুসন্ন্যাসীর সঙ্গ, সব তোমার ভণ্ডামি। তুমি এক বেড়াল-তপস্বী। তুমি দেখবে, দেখতে চাও, এই মুহূর্তে তোমাকে আমি ফেলে দিতে পারি? সাতঘাটের জল খাইয়ে দিতে পারি? সে ক্ষমতা আমার শরীরের আছে।
একসঙ্গে অনেকগুলি তির এসে আমার বুক যেন ঝাঁঝরা করে দিল। ধরা পড়ে গেছি। রাগ হচ্ছে। উত্তর দেওয়া দরকার। আমি যদি বলি, তোমার জন্যেই তিনি চলে গেলেন? বুঝতে পেরেছিলেন, কী ঘটতে পারে। তার সমস্ত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বানচাল হতে বসেছে। তিনি তোমাকে পছন্দ করেননি।
