কী বলব মুকু?
কাটলেট আর চা।
লোকটি মুকুর দিকে তাকিয়ে আছে হাঁ করে। মেয়েরা ক্রমশই স্বাধীন হচ্ছে। প্রেম ছাড়া পেয়েছে বাজারে। রেস্তোরাঁর কেবিন এখন কুঞ্জবন। সারাদিনে জোড়ায় জোড়ায় আসে আর চলে যায়। ভদ্রলোক দেখছেন, এ জোড়াটা কেমন!
দেয়াল আর মুকুর মাঝখানের খোপ থেকে আমি বলে উঠলুম, কাটলেট আর চা।
মুখ অদৃশ্য হল। পরদাটা দুলতে লাগল।
মুকু আমার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললে, বলল, কেমন লাগছে তোমার? কী ভাল, তাই না!
আমি তখনই মুকুকে সব কথা বলতে শুরু করলুম। দু’হাতে মুখ রেখে মুকু শুনছে। তার সব চপলতা চলে গেছে। মুকু যখন সিরিয়াস, তখন তার চেহারা একেবারে অন্যরকম হয়ে যায়।
সব শুনে মুকু বললে, তিনি চলে গেলেন? এইভাবে চলে গেলেন?
বলতে বলতে মুকু কেঁদে ফেলল, অমন একজন মানুষ চলে গেলেন। আমি তা হলে কী নিয়ে বাঁচব! মুকু মুখ নিচু করে আছে, টপটপ করে জল পড়ছে চোখ থেকে। টেবিলের পাশে, কোলে। হঠাৎ উঠে পঁড়াল। হাত বাড়িয়ে বললে, তোমার রুমালটা দাও। রুমালটা নিয়ে চোখ মুছে বললে, চলো।
সেকী, আমরা যে অর্ডার দিলুম।
দাম মিটিয়ে দাও। আমরা খাব না। খাওয়ার আর মুড নেই। তুমি জানো না মেসোমশাই আমার কতটা অধিকার করে আছেন! অমন ফ্যান্টাস্টিক মানুষ হয় না। আর দ্বিতীয় নেই। তোমার বাবা তো, তাই তুমি চিনতে পারোনি। তুমি একটা ছাগল। দেবতার আসন তুমি টলিয়ে দিয়েছ।
ছাগল বলায় রেগে যাওয়াই উচিত ছিল, কিন্তু মুকুর ওপর আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। ওর উগ্র সাজ চটুল ব্যবহারের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর একটা মন। আমার পিতাকে যে এত শ্রদ্ধা করে সে আমারও শ্রদ্ধেয়।
ভদ্রলোক কাটলেট হাতে সামনে দাঁড়িয়ে। থতমত হয়ে গেছেন। বুঝতে পারছেন না ব্যাপারটা কী! খুব ভদ্রভাবে বললেন, তেমন তো দেরি করিনি! উঠে পড়লেন?
আমি বললুম, দেরির জন্যে নয়। অন্য ব্যাপার। আপনি একটা প্যাকেট করে দিন। আমি দামটা দিয়ে দিই।
প্যাকেটটা হাতে নিয়ে আমরা বাইরে বেরিয়ে এলুম। হনহন করে কিছু দূর হাঁটার পর জিজ্ঞেস করলুম, তুমি এখন কোথায় যাবে মুকু?
তোমাদের বাড়িতে।
বেশি রাত হয়ে গেলে তোমাকে তো আবার হস্টেলে ঢুকতে দেবে না।
সে আমি বুঝব। তুমি একটু কম চিন্তা করো।
আমরা একটা বাসে উঠে পড়লুম। বেজায় ভিড়। মানুষের চটকাঁচটকি। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুকু একটা বসার জায়গা পেয়ে গেল। বাস যেন আর নড়তেই চায় না। দু’কদম যায় তো থেমে পড়ে। তিরিশ মিনিটের পথ যেতে এক ঘণ্টা লেগে গেল। গলদঘর্ম হয়ে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালুম। অন্ধকারে পঁড়িয়ে আছে ভূতের বাড়ির মতো। সদর দরজায় বিশাল এক তালা। বাইরের রকের একপাশে দুটো কুকুর শুয়ে আছে।
মুকু বললে, প্যাকেটটা ফেলে দাও না! বিশ্রী গন্ধ বেরোচ্ছে।
পয়সার জিনিস ফেলে দেব?
হ্যাঁ দেবে। ও আর কে খাবে? বাসে অত লোকের নিশ্বাস আর ছোঁয়াছুঁয়ির মধ্যে ছিল। খেলেই। অসুখ করবে। ওই কুকুরদুটোকে দিয়ে দাও।
কুকুরদুটো অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। কাটলেটের গন্ধে গা ঝাড়া দিয়ে উঠল।
তালাটা খুলে গভীর অন্ধকারে আমরা দুজনেই হাতড়াতে লাগলুম। সুইচবোর্ড আন্দাজ করে পায়ে পায়ে এগোতে লাগলুম। ভয় করছে, সাপ থাকা অসম্ভব নয়। নীচের তলাটা একেবারেই ব্যবহার হয় না। হামেশাই সাপের সঙ্গে আমাদের দেখাসাক্ষাৎ হয়। মুকুর একটা হাত আমার কাঁধে। আমাকে ধরে ধরে আসছে। তার শাড়ির নীচের অংশ আমার পায়ে মাঝে মাঝে জড়িয়ে যাচ্ছে। আমার শরীরে তার শরীরের ভার। একটু অস্বস্তি হচ্ছে। মন একটু উতলা হচ্ছে। কেউ কোথাও নেই। থকথকে আলকাতরার মতো অন্ধকার। মানুষের মন যখন ভাল থাকে না, তখনই সে দুটো ম খোঁজে। মদ আর নারী। এতকাল শুনেছিলুম, আজ অনুভব করছি। মনে হচ্ছে, কী আর হবে, যা হয় হবে! যতরকম অন্ধকার আছে, তাতেই জীবনটাকে ডুবিয়ে দিই। আলোর পথিক তো হওয়া গেল না। আঁধারকেই চিনি ভাল করে। এখন তো আমারই দিন। এই অন্ধকার ইমারতের আমিই সম্রাট।
অবশেষে সুইচবোর্ডে হাত ঠেকল। আলো যেন লাফিয়ে পড়ল মল্লবীরের মতো। সেই আলোয় মুকুকে মনে হল বেসামাল কোনও রাজনৰ্তকী। দু’পা এগোলেই দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সিঁড়ির তলায় বাগান করার যন্ত্রপাতি। নানা মাপের শাবল, কোদাল, খুরপি, ঝুড়ি, বালতি, ঝাড়ু। মুকু সিঁড়ির হাতল ধরে ধরে ওপরে উঠছে। এইটুকু সময়ের মধ্যেই অক্লান্ত মাকড়সা এমাথা থেকে ওমাথা জাল বুনে বসে আছে। ভেবেই নিয়েছে, আর তো কেউ আসবে না। বিস্মৃতির সূক্ষ্ম পরদায় বাড়িটাকে ঢেকে দিই। অতি মিহি এক শবাচ্ছাদন। সিঁড়ির ধাপগুলো ভাঙাভাঙা। কথা হচ্ছিল, বাড়িটাকে ঢেলে মেরামত করার। সব ভেস্তে গেল।
সিঁড়ির প্রথম বাক পর্যন্ত নীচের আলো ছিল। দ্বিতীয় বাঁক পড়ে আছে অন্ধকারে। তৃতীয় বাঁক একেবারেই অনিশ্চিত। দ্বিতীয় বাঁকের মুখে মুকু থমকে গেল। আমি বললুম, দাঁড়াও, আমাকে আগে যেতে দাও। অন্ধকারে তুমি কোনও কিছুর হদিশ পাবে না।
সিঁড়ির ধাপ আমার মুখস্থ। তরতর করে উঠছিলুম। মুকু বললে, আমার কথা একটু ভাবো।
তুমি দাঁড়াও, আমি আলোটা আগে জ্বালি।
সব ঘরের আলো জ্বেলে দিলুম। সারাদিন বন্ধ ছিল। ঝাড়া-মোছা হয়নি। ধুলোধুলো লাগছে। প্রচুর চড়াই পাখি এ বাড়িতে আশ্রিত। তাদের এখন বাসা বাঁধার সময়। খড়কুটো এনে জড়ো করেছে। ভেন্টিলেটারে! সেইসব পড়েছে মেঝেতে। একটা ব্যাপারে মনে একটু খটকা লাগল। বাবা যে-টেবিলে বসে লেখাপড়া করতেন, তার সামনে একটা জানলা আছে। বেশ মনে পড়ছে জানালাটা আমি ভাল করে বন্ধ করে গিয়েছিলুম! এখন দেখছি একটা পাল্লা খোলা। কে খুলল? আমি তো ছিটকিনি বন্ধ করে গিয়েছিলুম। বেশ একটা ভয়ভয় করছে। এই বাড়িটার বদনাম আছে। নানা জনে নানা কথা বলে। অশরীরী কেউ ছিটকিনি খুলে বেরিয়ে যায়নি তো!
