কেন?
ট্রামটা ভাল নয়।
এর চেয়ে ভাল ট্রাম কলকাতায় পাবে কোথায়?
হঠাৎ অক্ষয় কাকাবাবু উঠে দাঁড়ালেন। আমি যতদূর সম্ভব মুখটা নিচু করে রাখলুম। পাশ দিয়ে চলে গেলেন দরজার দিকে। আমার গা ছুঁয়ে গেল তার পাঞ্জাবির পকেট। পকেটে মনে হয় হাত দেখার লেনসটা রয়েছে। ঠকাস করে আমার কাঁধে লাগল। সাবধানের মার নেই। আমি মাথা তুলিনি।
মুকু বললে, কাকে দেখে অমন করছ? পাওনাদার?
মাথা না তুলেই বললুম, এখন চুপ। আমাকে আড়াল করে রাখো।
ট্রাম থামল। থেমে আবার চলল। তখন আমি সাহস করে মাথা তুললুম।
মুকু বললে, ব্যাপারটা কী? অমন চোরের মতো লুকোলে কেন?
অক্ষয় কাকাবাবু।
কে অক্ষয় কাকাবাবু?
আমার বাবার বন্ধু।
তাতে হলটা কী? আমার সঙ্গে দেখলে তোমার চরিত্র খারাপ হয়ে গেছে ভাববেন? তুমি এইরকম ভয়ে ভয়ে মেয়েদের সঙ্গে মেশো নাকি? তোমার সাহস নেই? ডরপুক! আমার যেমন বেণি তেমনি রবে চুল ভিজাব না। ভুখ লাগাব, ভুখে মরব তবু আমি জানতে দেব না। রাঁধিব বাড়িব, ব্যঞ্জন বাটিব তবু আমি হাঁড়ি ছোঁব না। পলিসিটা তোমার ভালই। তোমার বাবাকে বলে দেবেন, এই ভয়? আর কত দিন বাবার কাছে গোপালটি সেজে থাকবে? এইবার একটু উড়তে শেখো না! জীবনটাকে একটু দেখো না!
মুকু রাগে মুখ ঘোরাল জানলার দিকে। একটু রোগা হয়ে আগের চেয়ে দেখতে যেন আরও সুন্দর হয়েছে। আমার বন্ধু আশিসের কথা মনে পড়ছে। আশিস বলত, দেখ পিন্টু, এমন একটা বিয়ে করব যেন নিয়ে রাস্তায় বেরোতে গর্বে বুক দশ হাত হয়ে যায়। তেমন একটা বউয়ের সন্ধান আজও পায়নি। আশিস যদি মুকুকে দেখতে পায় তো ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে। ডিগ্রি ডিপ্লোমার পেখম তুলে নাচবে। ওর ধারণা মেয়েরা এইসবেরই প্রেমে পড়ে। নিজেদের বাড়ি, সেকথাও বলতে ভোলে না। যেন বাড়ি আছে বলেই সুন্দরী মেয়েরা জামার বোতামের গর্তে গোলাপফুল হয়ে সেঁটে যাবে। মুকুর পাশে গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছি বলে আমার অবশ্য তেমন কিছু মনে হচ্ছে না।
ওয়াই এম সি এর রেস্তোরাঁয় ঢুকেই পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল। এই তো কয়েক বছর আগেই ছাত্রজীবনে আমরা প্রায়ই এখানে আসতুম। সস্তার খাওয়া ছিল, টোস্ট ওমলেট, চা। যেসব ভাগ্যবানের মেয়ে বন্ধু ছিল, তারা সোজা গিয়ে ঢুকত কেবিনে। লম্বা পরদার আড়ালে গল্প করার সুবিধে হত। এইরকম একটা কেবিনে আমাদের গ্রেট পার্থ আরতিকে চুমু খেয়েছিল। জীবনের প্রথম নারী-ওষ্ঠ চুম্বনের অভিজ্ঞতা। ছাদের নল দিয়ে অনর্গল বর্ষার জল বেরোবার মতো, টানা এক মাস গলগল করে কবিতা বেরোতে লাগল। খাতাপত্তর সব ভরে গেল। কখনও হাসে, কখনও কাঁদে। পার্থর নিরীহ মা একদিন আমাদের সামনে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, ওরে আমার ছেলেটার কী হল! কেন এমন করছে! খেতে বসে, ডালেতে দুধেতে ঝোলেতে অম্বলেতে মিশিয়ে ফেলছে। জামার বোতাম ঘরে ঘরে মেলাতে পারছে না। সবাই বলছে, ছেলে তোমার সন্ন্যাসী হয়ে যাবে। কৃষ্ণ-বিরহে মহাপ্রভুর এই অবস্থা হয়েছিল। আমরা কুঁইকুই করে হেসে মরি আর কী! বলতে পারছি না, মাসিমা, কৃষ্ণবিরহ নয়, ওষ্ঠে ওষ্ঠ ঠেকিয়ে এই অবস্থা হয়েছে। সন্ন্যাসী নয়, ছেলে আপনার গৃহী হবে। পেখম তুলেছে।
আমরা ধারের দিকে একটা কেবিন পেয়ে গেলাম। মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা করতে ছাত্রজীবনে ভয় পেতুম। সেই ভয় এখনও যায়নি। কেউ যদি দেখে ফেলে, কেউ যদি বলে দেয় বাড়িতে। মনে হয় ছবির মানুষও জীবন্ত। হঠাৎ বলে উঠবে, অ্যায়, কী কচ্চিস! তোর বাবাকে বলে দেব।
মুকু কেবিনের পরদাটা টানছে। বললুম, থাক না, খোলাই থাক না।
কেন? খোলা থাকবে কেন? পরদাটা তা হলে আছে কীসের জন্যে?
মুকু আমার পাশে বসল। আমি বললুম, উলটো দিকে বোসো না!
কেন? তোমাকে পুলিশে ধরবে? আজ আমি তোমার ভয় ভাঙাব। তোমাকে আজ আমি মানুষ করব!
শক্ত পাথরের মতো হয়ে গেছে আমার শরীর। এখনই পরদা সরিয়ে বয় ঢুকবে। সে যখন দেখবে আমরা এইভাবে বসে আছি, ছি ছি, কী ভাববে! এইভাবে বসে থাকাকেই তো ইংরেজিতে বলে, কম্প্রোমাইজিং পজিশন। মুকু যে-ব্লাউজ পরেছে, সর্বাধুনিক ডিজাইনের। দুঃসাহসী মেয়েরা পরতে শুরু করেছে কলকাতায়। পরলেই লোকে কেমন কেমন নজরে তাকায়। আমিও তাকাই। ভেতরটা ছিঁড়েখুঁড়ে যায়। বিশ্রী একটা ভাব হয়। মুকুর কোমরের অনেকটা অংশ বেরিয়ে আছে। ধবধবে সাদা। গোলাপি ব্লাউজের তলা খাপ হয়ে বসে আছে। অস্বাভাবিক রকমের ভরাট বুক। যৌবন নয়, যৌবনের জোয়ার। ভয় আর লোভ দুটোই একসঙ্গে খেলা করছে আমার মনে। কখনও মনে হচ্ছে, আমি কী ভাগ্যবান! পরক্ষণেই মনে হচ্ছে, হায়, কী সর্বনাশ! মুকু টেবিলের ওপর দু’হাত রেখে সামনে ঝুঁকে মেনু পড়ছে। আমি দেখছি মসৃণ চওড়া পিঠ। নিখুঁত একটি ঘাড়। পিঠে ছড়িয়ে আছে রেশমের মতো চুল। মুকু ইচ্ছে করলেই ফিমে নামতে পারে। বম্বের এক নায়িকা, যার এখন খুব নামডাক, অবিকল তার মতো দেখতে।
মুকু বললে, এইবার কী হবে! তুমি পালাবে কোথায়! পড়েছ মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে। এইবার আমার কবলে তুমি। আমার যা প্রাণ চায় আমি তাই করব।
মুকু কঁধ দিয়ে আমাকে দেয়ালে ঠেসে ধরল। আর ঠিক সেই সময় দুলে উঠল পরদা। প্রবীণ এক মানুষের মুখ। মুখটা ভিতরে, দেহটা বাইরে। শুধু একটিমাত্র প্রশ্ন, বলুন?
