তা হলে ব্যাঙ্কে যাবার প্রয়োজন নেই?
খুব আছে। অত সোনাদানা বাড়িতে কেউ ফেলে রাখে! তোমাদের ওই বিশাল বাড়ি আর তুমি একজন মাত্র প্রাণী।
আর আমার চাকরির কী হবে?
চাকরি করবে। চাকরি না করার প্রশ্ন আসছে কেন?
আমাকে যে দেরাদুনে বদলি করে দিয়েছে।
তা হলে অবশ্য খুবই মুশকিল। তোমার তো এখন বাইরে যাওয়া কোনওমতেই চলবে না। তুমি কর্তৃপক্ষকে বলো। তারা নিশ্চয়ই অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করবেন।
আমার প্রোমোশনটা যে তা হলে হবে না। বাইরে পাঠাচ্ছিল বিরাট একটা প্রোমোশন দিয়ে।
ওই লোভটা তোমাকে ছাড়তে হবে ভাই।
আর একটা বাজে ব্যাপার আছে বিদা, ওই বাড়িতে রাত্তিরবেলা আমি একা থাকতে পারব না। ভূত আছে।
ভূতের ভয় অবশ্য আমারও আছে। তুমি এক কাজ করো, তুমি আমাদের বাড়িতে থাকো।
আমার লজ্জা করে।
লজ্জা? কীসের লজ্জা?
আমি কারও সামনে জামাকাপড় খুলতে পারি না।
এখানে কে তোমাকে উলঙ্গ হয়ে থাকতে বলেছে! পাজামা আর গেঞ্জি পরে শোবে।
আমি যে কারও বাড়ির বাথরুমে যেতে পারি না বিষ্টুদা।
আমাদের বাড়ির বাথরুম খুব ভাল জায়গায়। কারওকে জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজন নেই। আলো জ্বালবে, ঢুকে পড়বে। আজ রাত থেকেই তুমি এখানে থাকবে, কিন্তু দামি গয়নাপত্তর যা আছে সব আজই নিয়ে আসবে এখানে। রাতটা আমাদের আলমারিতে থাকবে।
একা আমি গোছগাছ করতে পারব না বিষ্টুদা। আপনিও চলুন না!
এসব ব্যাপার আমার চেয়ে ইতু আর টিপ ভাল পারে। ওরা তোমার সঙ্গে যাবে, তোমাকে সাহায্য করবে। যেভাবে বলবে, সেইভাবে। এখন তুমি একটু বিশ্রাম করো।
কুঁকড়েমুকড়ে খাটের এক ধারে কিছুক্ষণ শুয়ে রইলুম। বড় শান্ত সংসার। ইতু বউদির গলা তো শোনাই যায় না, টিপও সেইরকম। শালিকের কিচিরমিচির কানে আসছে। ঘুঘু ডাকছে উদাস সুরে। বিষ্টুদা আমার পাশেই শুয়ে আছেন চিত হয়ে, বুকের ওপর হাতদুটো জড়ো করে। বিষ্টুদার মনে হয় দুপুরে ঘুমোনোর অভ্যাস। শ্বাসপ্রশ্বাস দীর্ঘ হয়েছে। আমি ডাকলুম, বিষ্টুদা।
বলো।
কলকাতার সমস্ত হোটেলে একবার খোঁজ করলে হয় না?
হয়; কিন্তু তিনি যদি অন্য নাম নিয়ে থাকেন? আর সেটাই সম্ভব।
কাল সারাটা দিন তা হলে হোটেলগুলো ঘুরে ঘুরে দেখি।
দেখতে পারো, তবে ব্যর্থ হবে। এখন মনে হচ্ছে অমন একজন মানুষ হোটেলে থাকবেন না। তিনি বাইরেই গেছেন কোথাও।
মানে হিমালয়ের দিকে?
আচ্ছা, তোমার বাবা তো বড় সরকারি চাকরি করতেন?
হ্যাঁ, এই কয়েকমাস হল রিটায়ার করেছেন।
আইডিয়া। যেখানেই থাকুন, পেনশন নেবার জন্যে মাসে একবার তাকে কলকাতায় আসতেই হবে। ওঁর পেনশনের তারিখটা তুমি যেভাবেই হোক বের করো। আমরা তক্কে তক্কে থাকব, ঠিক ধরে ফেলব। একবার ধরতে পারলে কোনও কথা নয়, সোজা তার পায়ের ওপর, যদি কোনও অপরাধ করে থাকি ক্ষমা করুন।
আমি তো কোনও অপরাধ করিনি।
শোনো, তোমার মনে হচ্ছে করোনি, কিন্তু করেছ। একটা কিছু হয়েছে। ভীষণ একটা আঘাত পেয়েছেন মনে। সেই অভিমান তাকে ঘর-ছাড়া করেছে।
২.০৩ Love means never having to say you are sorry
একটু ভালবেসে ফেলেছিলুম, ঈশ্বর, এই কি আমার অপরাধ! তা হলে তুমি কেন নারী সৃষ্টি করলে! মুকু হস্টেল থেকে বেরিয়ে পড়েছিল কোথাও যাবে বলে। আমাকে দেখে অবাক।
মুকু বললে, একী, তুমি কোথা থেকে এলে? অফিস থেকে?
মনে হচ্ছে, আমাকে দেখে অবাক হয়েছ?
তা একটু হয়েছি। ভাবতেই পারিনি তুমি আসবে। তুমি তো ব্রহ্মচারী। তোমার বাবা গৃহী সন্ন্যাসী। তুমি একটা মেয়ের কাছে আসো কী করে! মেয়েরা তোমার কাছে যাবে, তোমার তপোভঙ্গ করাবার জন্যে। এ যেন মেঘ না চাইতেই জল!
তুমি কোথায় যাবে বলে সেজেগুজে বেরোলে?
যদি বলি একটা ছেলের কাছে!
তা হলে আমার অভিমান হবে।
যদি বলি সেই ছেলেটি হলে তুমি?
তা হলে আমার অভিমান হবে না।
আমি যদি আর একটু আগেই বেরিয়ে যেতুম, তা হলে তো তোমার সঙ্গে আমার দেখা হত না।
তা অবশ্য হত না। মন খারাপ করে ফিরে যেতে হত।
চলো তা হলে দু’জনে মিলে কোথাও যাই।
তখনই মুকুকে কিছু বলতে ইচ্ছে করল না। কেমন যেন একটা উড়ুউড়ু ভাব। অন্যের দুঃখের কথা মনে ধরবেনা। সুখে সে রয়েছে, সুখে সে থাকুক। মোর কথা তারে বোলো না, বোলো না। দেখলেই মনে হয় সুখী মেয়ে, আদুরে মেয়ে। দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার মানসিকতা নেই। মরশুমি ফুলের মতো বাহারি। বড়লোকের মেয়ে। বাবা বড় অ্যাডভোকেট। মুকুর সবটাই কেমন ভাসাভাসা। আজ খুব সেজেছে। পিঙ্করঙের শাড়ি। কাঁচুলি ধরনের ব্লাউজ। চুলে শ্যাম্পু করেছে। ফুরফুর করে উড়ছে। গা থেকে মিষ্টি একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। মুকু যথার্থই সুন্দরী। অন্য কোনও দিন হলে আমি হয়তো চনমন করে উঠতুম। যা আমার স্বভাব। আজ ভেতরটা কুঁকড়ে আছে।
মুকু বললে, আমাকে কিছু খাওয়াবে? ভীষণ খিদে পেয়েছে।
চলো। কোথায় খাবে বলো?
বেশ ভাল একটা জায়গায়, যেখানে নির্জনে কিছুক্ষণ বসা যাবে।
তা হলে তো পার্ক স্ট্রিটে যেতে হয়।
অত দূরে না, কাছাকাছি কোথাও।
হঠাৎ মনে হল ওয়াই এম সি এ রেস্তোরাঁয় গেলে হয়। দু’জনে ট্রামে উঠলুম। খালি ট্রাম। বসার জায়গার অভাব নেই। উঠে বড় অস্বস্তিতে পড়ে গেলুম। একটি আসনে বেশ আয়েশ করে বসে আছেন আমার পিতার প্রাণের বন্ধু, সেই জ্যোতিষী অক্ষয় কাকাবাবু। সামনের দিকে বসেছেন। আমরা পেছনে। কী একটা ভাবে তন্ময়। ঘাড় ঘোরালেই আমাদের দেখে ফেলবেন। দেখে ফেলুন। এটা আমি চাই না। মুকু এক বিস্ফোরক সুন্দরী। পাঞ্জাবি মহিলার মতো উগ্র সাজ। মুকুর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললুম, চলো পরের স্টপেজে নেমে যাই।
