না।
আমারও নেই। তুমি দেখছি একালের ছেলেদের কোনও গুণই পাওনি।
শুয়ে শুয়ে দেখছি, দেয়ালে ঝুলছে ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। সবচেয়ে বড় ছবি শরৎচন্দ্রের। বিষ্টুদা। শরৎচন্দ্রকে দেবতার মতো ভক্তি-শ্রদ্ধা করেন। অভিনেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি। জহর গাঙ্গুলী, অহীন্দ্র চৌধুরী, দুর্গাদাস, প্রমথেশ বড়ুয়া, ছবি বিশ্বাস, শিশির ভাদুড়ী। আরও অনেকে। আমি তাঁদের চিনি না। সাহিত্য আর নাটকে বিষ্টুদা মশগুল। ঐতিহাসিক আর পৌরাণিক নাটকের সংলাপ গলগল করে বলে যেতে পারেন। ঝকঝকে আলমারিতে পরিপাটি করে সাজানো বই। বিষ্টুদার নিজের চেহারাও নায়কের মতো। যখন দোকানে তখন একরকম সাজপোশাক। কথা বলার ধরনধারণ। পাক্কা চা-অলা। হাঁটুর ওপর তোলা মালকেঁচা মারা ধুতি। একটা গেঞ্জি। শীতকালে ওরই ওপর একটা পুলওভার। ভোরবেলা আর রাতের দিকে মাথায় একটা মাফলারের পাগড়ি। হৃষ্টপুষ্ট গোলগাল মানুষটিকে তখন সন্ন্যাসীর মতো দেখায়।
টিপ দু’গেলাস জল এনে টেবিলের ওপর চাপা দিয়ে রেখে গেল। যাবার সময় জিজ্ঞেস করলে, আপনি পান খাবেন?
না ভাই, পান আমি খাই না।
বিষ্টুদা বললেন, একটু মশলা দিয়ে যা।
টিপ পরক্ষণেই মশলা নিয়ে এল। আমি হাত পাতলুম। টিপের ফরসা হাত আমার ডান তালুতে কাত হল, মৌরি, বড় এলাচ, সুপুরির ছোট ছোট টুকরো। মেয়েটার আঙুলগুলো কী লম্বা লম্বা! শিল্পী হাত। আমার আঙুলও লম্বা লম্বা, কিন্তু শিম্পাঞ্জির মতো। নিজের হাত দেখে নিজেই ঘাবড়ে যাই। শয়তানের হাত মনে হয় এইরকম ছিল। ছিল বলছি কেন? শয়তান তো এখনও আছে। তা না হলে, আমার কেন ইচ্ছে করছে টিপকে ভালবাসি? ভীষণ ভালবাসা। একমাত্র টিপই আমার এই পথে বসা জীবনকে ঘরে তুলতে পারে। টিপের পাশে মুকু লাগে না। লেখাপড়ায় সাংঘাতিক হলেও, একটু পুরুষালি ভাব। টিপ হল কবিতা, মুকু হল গদ্য। টিপ পেছন ফিরে চলে যাচ্ছে, আমার চোখ যেন আটকে গেছে। আমার মতো মানুষকে কারও অন্দরমহলে ঢুকতে দেওয়া উচিত নয়। আমার মন বড় বেসামাল।
বিষ্টুদা বললেন, তোমার এখন প্রথম কাজ হবে সোনাদানা যা আছে সব ব্যাঙ্কে জমা করে দেওয়া। কোন ব্যাঙ্কে তোমাদের অ্যাকাউন্ট?
স্টেট ব্যাঙ্ক।
আজ তুমি একটা লিস্ট তৈরি করো, সাবধানে। কাল আমি তোমার সঙ্গে গিয়ে জমা করে আসব। তা হলে বিরাট এক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
আমার বাবাকে খুঁজে বের করার কী হবে বিষ্টুদা?
দেখো, থানার সাহায্য নেওয়া যায়। মিসিং পার্সনস স্কোয়াডে একটা ছবি দিয়ে ডায়েরি করালে ওরা অনুসন্ধান করবে। কাগজেও একটা বিজ্ঞাপন দিতে পারি আমরা। সেটা কিন্তু কেমন একটা বিদঘুঁটে ব্যাপার হবে। লোক জানাজানি। আমাদের পক্ষেও অপমানের, তার পক্ষেও অপমানের। পাঁচজনে পাঁচকথা বলবে। অনুসন্ধানটা আমাদেরই করতে হবে তলে তলে।
আমরা কী করে করব?
কোথায় কোথায় যাওয়া সম্ভব ভেবে দেখো। কোনও আত্মীয়ের বাড়ি? কোনও আশ্রম?
আমাদের তো তেমন কোনও আত্মীয় নেই। এক মামা।
সেখানে যেতে পারেন?
অসম্ভব। এই কারণেই অসম্ভব, কারও বাড়ি গিয়ে একটা রাতও কখনও কাটাননি। অস্বস্তি বোধ করেন। বহুবার আমরা বেড়াতে গেছি। যেখানে গেছি ইচ্ছে করলে পরিচিত বন্ধুর বাড়িতে ওঠা যেত। ওঠেননি। সোজা চলে গেছি হোটেলে। বলতেন, এক এক সংসারের এক এক সুর। সেই সুরে সুর মেলানো কষ্টকর। অনেকে পারে আমি পারি না।
তা হলে কোথায় যেতে পারেন?
একবার ভাবছি হরিদ্বার থেকে আমার দাদুর কাছে এক সন্ন্যাসী আসতেন। দাদুর সমাধির রাতে তিনি হঠাৎ এসে হাজির। যেন আগেই জানতেন। সেই সন্ন্যাসীকে বাবার খুব মনে ধরেছিল। সাধারণত সাধু-সন্ন্যাসী তেমন পছন্দ করতেন না। এক ধরনের নাস্তিক ছিলেন। সেই সন্ন্যাসীর আশ্রমে যেতে পারেন। যাওয়াটা অসম্ভব নয়।
সেই মহাপুরুষের নাম-ঠিকানা তুমি জানো?
না।
তোমার বাবা জানতেন?
সন্দেহ আছে। তিনি জানলে, আমিও জানতুম।
তা হলে সেখানে তিনি যাবেন কী করে? ঠিকানা না হয় না জানলেন, নামটা তো জানা দরকার।
তা ঠিক। তা হলে কোথায় যেতে পারেন?
এমনও হতে পারে সোজা কোনও হোটেলে গিয়ে উঠেছেন। কলকাতারই কোনও হোটেলে। সেখানে দিনকতক থেকে তোমাকে একটু শিক্ষা দিতে চাইছেন। সেটা রাগেও হতে পারে, আবার–ও হতে পারে। তোমাকে একটু হাত ছেড়ে দিয়ে স্বাবলম্বী হতে শেখাচ্ছেন। ছোট ছেলেকে মা যেমন হাঁটতে শেখান। সত্যিই তো তুমি তার হাতধরা ছিলে। বুক দিয়ে আগলে আগলে রেখেছিলেন।
সঙ্গে তো কিছুই নিয়ে যাননি!
টাকা?
সেইটা আমি বলতে পারব না।
শোনো, তিনি প্র্যাকটিক্যাল মানুষ, হিসেবি মানুষ, জেনেশুনে নিজেকে বিপদে ফেলবেন না। পথ চলতে কড়ি, একথা তিনি জানেন। সঙ্গে টাকা থাকলে আর কিছু নেওয়ার দরকার হয় না। মনে করে দেখো, আগের দিন তিনি ব্যাঙ্কে গিয়েছিলেন কি না!
মনে হয় গিয়েছিলেন।
বাড়ি গিয়ে চেক বইটা পাও কি না দেখো। কাউন্টার ফয়েলটা দেখো। কত টাকা কোন তারিখে তুলেছেন। ব্যস, প্রবলেম সলভড। উইদাউট টিকিটে ট্রাভেল করে জেলখানায় যাবার মানুষ তিনি নন। লোকের কাছে হাতপাতার মানুষও তিনি নন। আমার মনে হয় খুব একটা উতলা না হয়ে কয়েকদিন চুপচাপ দেখলে হয়। ফিরেও তো আসতে পারেন। কোনও বাবা তার ছেলেকে এত ভালবাসতেন না, তিনি যেমন তোমাকে বাসতেন। তোমার যেমন কষ্ট হচ্ছে, ছটফট করছ, তারও তো সেই একই অবস্থা।
