পরিষ্কার পাট করা একটা গামছা টিপ আমাকে এগিয়ে দিল। একেবারে মুখোমুখি দুজনে। বাদাম-চেরা চোখ, বড় বড় পাতা ঘেরা। যেন নারকেল কুঞ্জের মধ্যে টলটলে নীল দিঘি। হাত মুছে গামছাটা ফিরিয়ে দিতে দিতে আমি একটু মুচকি হাসলুম। মুখে কোনও কথা সরছে না। বিস্ময়কর কিছু দেখলে মানুষের এমনই বাক্যহারা অবস্থা হয় বোধহয়।
টিপ বললে, চান করে উঠে চুল আঁচড়াতে ভুলে গেছেন। দাঁড়ান, চিরুনি আর আয়নাটা নিয়ে আসি।
চুল আঁচড়াইনি বুঝি? তাড়াতাড়ি এসেছি তো!
না আঁচড়েও বেশ ভাল দেখাচ্ছে।
টিপ একটা মেয়েদের চিরুনি, খুবই পরিষ্কার, তবুও দুই আঙুল চালিয়ে, ফুঁ দিয়ে, চোখের সামনে তুলে পরীক্ষা করে আমার হাতে দিল। চুল আঁচড়াতে গিয়ে বুঝলুম, মাথাটা মুছতেই ভুলে গেছি। চিরুনি চালানো মাত্রই টসটস করে জল গড়িয়ে পড়ল।
টিপ বললে, একী মাথাটাই তো মোছা হয়নি! জল টসটস করছে। এইবার নির্ঘাত একটা অসুখে পড়বেন। গামছাটা এগিয়ে দিতে দিতে বললে, আগে মুছুন শুকনো করে।
আমার পেছন দিকটা ভিজে গেল চুলের জলে। একটু লজ্জা লজ্জা করছিল নিজের নোংরামির জন্য। টিপ কী ভাবছে! ভাবছে, ছেলেটা একটা জড়ভরত। চুল আঁচড়াবার পর টিপ বললে, দেখুন। তো, কী সুন্দর দেখাচ্ছে এইবার! টিপ পেছনে এসে জামার ওপর গামছা চেপে চেপে জল শুকোবার চেষ্টা করল। দু-একটা চুল লেগেছিল, দুআঙুলে তুলে দিল।
বিষ্টুদা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ঠিক পাল্লায় পড়েছ এইবার।
টিপ বললে, তোমার এই ছেলে এবার একটা শক্ত অসুখ বাধাবে। মাথা ডবডবে ভিজে। মুছতেই ভুলে গেছেন।
আমরা পাশাপাশি খেতে বসলুম দু’জনে। খুবই পরিচ্ছন্ন আয়োজন। টিপ আর বউদি পরিবেশন করছেন। মুখে ভাত তুলতে গিয়ে হাত থেমে গেল। মনে হল, আমি তো বেশ পরিপাটি আহারে বসলুম, আমার বাবা এখন এই মুহূর্তে কোথায়? তার কি কিছু জুটবে! বারেবারে চা খেতে ভালবাসতেন। খাওয়ার তরিবাদিও বেশ ছিল। যেখানে সেখানে, হোটেলে রেস্তোরাঁয় খেতে পারেন না। আজ মনে হয় উপবাস!
বিষ্টুদা আমাকে লক্ষ করছিলেন। বললেন, বুঝতে পেরেছি, তোমার মনে কী হচ্ছে! তবু খেতে হবে। শরীরটাকে ঠিক রাখতে হবে। অসুস্থ দুর্বল হয়ে পড়লে তো চলবে না। নাও খেয়ে নাও। মনটাকে শক্ত করো। এখন তোমার ওপর অনেক দায়িত্ব।
কেবল মনে পড়ে যাচ্ছে বিষ্টুদা। চোখের সামনে তাঁর মুখটা ভাসছে।
দেখো পিন্টু, দুঃখ হল মনের ব্যাপার, আর খাওয়া হল দেহের ব্যাপার। তুমি তো নিজেই দেখেছ প্রিয়জনকে শ্মশানে দাহ করে এসে মানুষ কিছুক্ষণের মধ্যেই খাওয়ার চিন্তা করে। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী কি উপোস করে মারা যায়? না, স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বামী? মন কীরকম জানো, সমুদ্রের বেলাভূমির মতো। কোনও ছাপই চিরস্থায়ী নয়, কালের ঢেউ এসে মুছে দিয়ে যায়। নিজেকে শক্ত করো। একটা। ব্যাপার কী হয়েছে জানো, তোমাকে তোমার বাবা খুব আগলে আগলে মানুষ করেছেন। আসল পৃথিবীটা বুঝতে দেননি। এ বড় কঠিন ঠাঁই। লড়াইয়ের জায়গা। আমাকে দেখো। তোমাকে আগেই বলেছি, মামার বাড়িতে মানুষ। বিরাট পরিবার। জমিদারিই বলতে পারো। মামা আমাকে বলতেন, লেঠেল। যত কঠিন কাজ সব আমার ওপর। বাজার সরকার, ম্যানেজার, ঝাড়ুদার, কনট্রাক্টর। লেখাপড়ার দফারফা। শেষে মামার সঙ্গে শুরু হল আদর্শের লড়াই। বনিবনা হল না। নিত্য খিটিমিটি। একদিন দূর করে দিলেন। একটু হাতেপায়ে ধরলে আখের ফিরে যেত। চাই কী, একটা বাড়ির মালিক হওয়াও অসম্ভব ছিল না। আমি রফা করিনি। আমি আমার পথ ধরে চলেছি। জীবিকার জন্যে কী না করেছি! সিনেমা হলের গেটকিপার, ট্রেনে সঁতের মাজনের ফেরিঅলা, জমির দালাল, সবশেষে চা-অলা। গোলাগুলি অনেক চলেছে, দুর্গ কিন্তু ভেঙে পড়েনি। ভগবান যেমন সব কেড়ে নিয়েছেন আবার দিয়েছেনও। সবচেয়ে বড় দান ইতুর মতো বউ। ইতু না এলে, হয় আমি পাগল হয়ে যেতুম, নয় টিবিফিবি হয়ে পথের ধারে মরে পড়ে থাকতুম, কি আত্মহত্যা করতে হত। বিশ্বাস করো, আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী লোক অথচ আমার কিছুই নেই। দিন আনি দিন খাই। সুখে ঘুমোই। তুমি যদি সহজে কাবু হয়ে যাও, পৃথিবী তোমাকে আরও চেপে ধরবে।
টিপ আমার সামনে বসে আছে। ভারী করুণ মুখে বললে, লক্ষ্মীটি খেয়ে নিন, তা না হলে আমরা খেতে পারব না। মা উপোস করে আছে।
বেশ বুঝতে পারছি টিপ আমাকে দখল করে ফেলেছে। ইতুর মেয়ে টিপ। মায়ের মতোই তো হবে! গানটা মনে পড়ছে, যার কেহ নাই তুমি আছ তার। সেই তুমি দুঃসময়ে এইভাবেই পাশে এসে দাঁড়ায়। দেবতা তো মানুষের রূপ ধরেই আসেন।
রান্না এত অপূর্ব হয়েছে যে সব বাধা ভেসে চলে গেল। সামান্য মুগের ডাল তারই কী স্বাদ! কুচো কুচো নারকোল। লাল নটে শাক, কাবাব ফেলে খাওয়ার মতো। কতকাল আমি এত অপূর্ব রান্না খাইনি! নারকোলকোরা দিয়ে মোটার ঘণ্ট। মুচমুচে বেগুনি। বউদি কেমন করে জানলেন, আমি এইসবই ভালবাসি। বিষ্টুদার সংক্ষিপ্ত জীবনকাহিনি মনে একটা বল এনে দিয়েছে। খাওয়া শেষ হল। বেশ ভালই হল।
বিষ্টুদা ঘরে এসে বললেন, নাও, আধ ঘন্টাটাক একেবারে ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে থাকো। সব হজম হয়ে যাবে।
আমাদের পরামর্শ কখন হবে?
শুয়ে শুয়ে হবে। ধূমপানের অভ্যাস আছে?
