কী বলে রে? আমি কার ছেলে? কত বড় আমাদের বংশ। ইচ্ছে করলে আমি কী না হতে পারি! ওকালত, কালোয়াত। ইচ্ছে করি না তাই! নাবালিকা। লঘুগুরু-জ্ঞানশূন্য।
উঠে পড়ি বাবা! সন্ধেটন্ধে দিতে হবে।
টিনের বাক্স হাতে মায়া ঘরের দিকে চলেছে। আঁচল লুটোচ্ছে মাটিতে। শাড়ি একটু উঁচু করে পরা। কত পাপ যে করেছি! লুকিয়ে লুকিয়ে বিদ্যাসুন্দর পড়েছি। তাকাতে গিয়ে যে সেই লাইনটাই মনে আসছে,
নিবিড় বিপুল চারু যুগল নিতম্ব।
কাম-পারাবার-পার-সার-অবলম্ব ॥
মন্দ মন্দ গমনে যদ্যপি বাঁকা চায়।
মনোভাব পরাভব লইয়া পলায় ॥
বাড়ি ফিরতেই কনক বললে, তুমি তো আচ্ছা। কথা আটকে গেল। তোমার কপালে ওটা কী?
মরেছে। সেই কাঁচপোকার টিপ। বৈষ্ণব পদাবলির সেই দৃশ্য। অভিসার শেষে রাধা ফিরছেন কুঞ্জ হতে। অধরের তাম্বুল বয়ানে লেগেছে। ঘুমে ঢুলুঢুলু আঁখি। কপাল থেকে চট করে টিপটা খুলে নিয়ে পাকা অভিনেতার মতো বললুম, কিছু লেগেছিল বোধহয়! ভাগ্যিস সময়টা সন্ধে। নয়তো ধরা পড়ে যেতুম।
মেসোমশাই ডাকছেন, কনক, কনক। সন্ধে হল।
আসি বাবা। কনক যেতে যেতে বললে, তাড়াতাড়ি হাত পা ধুয়ে এসো। প্রার্থনায় বসতে হবে।
সে আবার কী? সে তো বহুকাল আগের কথা! অস্পষ্ট স্মৃতি। সকালে হাত জোড় করিয়ে হাঁটু মুড়ে বসিয়ে এক নারীমূর্তি আমাকে প্রার্থনা করাচ্ছেন,
সকালে উঠিয়া আমি মনে বলি
সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি।৷
তিনি হয়তো আমার মা ছিলেন কিংবা জ্যাঠাইমা। এই ছাড়া-গোরুকে কে আবার গোয়ালে তুলতে চায়! সাঁঝাল দিতে চায়। সব তো চুকেবুকে গেছে। আমার মনে যে বড় বেদনা! আমার যে কেউ কোথাও নেই। আমি ঈশ্বরকেই চাই, তবে পুরুষের বেশে নয়। নারীর বেশে। যত মত তত পথ। তুমি আমার প্রেমিকা হয়ে এসো।
তোমার দিন কি এইভাবেই কাটে পিন্টু! মেসোমশাই সামনে দাঁড়িয়ে। তুমি কি লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছ?
আজ্ঞে না! এই একটু লাইন চেঞ্জের সময় তো!
তার মানে? তুমি রেলগাড়ি, না কলকাতার ট্রামগাড়ি! দুপুরবেলা বন্ধুবান্ধব নিয়ে হইহল্লা করছ। সন্ধে উতরে যাবার পর বাড়ি ফিরছ!হরিদা সারাদিন অফিসে থাকেন। ব্যাপারটা তাঁকে জানাতে হচ্ছে!
ডাক্তারবাবু বিকেলে আমাকে একটু বেড়াতেই বলেছেন।
ফাজিল ছেলেদের মতো মুখে মুখে তর্ক কোরো না। যাও ঠাকুরঘরে যাও।
প্রদীপের শিখা স্থির। ডগার দিক মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। গরদের কাপড় পরে মেসোমশাই আসনে বসেছেন। ধূপের ধোঁয়া উঠছে পাকিয়ে পাকিয়ে। পেছনে আমরা তিনজন। সামনে পেতলের ওঁ-এর মধ্যে রাধাকৃষ্ণ দাঁড়িয়ে আছেন। পটে মা লক্ষ্মী। মায়ের হাতে লাগানো সিদুরের দাগ এখনও লেগে আছে। নিস্তব্ধ। দূরে, বহুদূরে কোনও মন্দিরে আরতির ঘণ্টা বাজছে। প্রদীপের শিখা মাঝে মাঝে ফটফট করে উঠছে।
হঠাৎ আমরা সংগীতে ভেঙে পড়লুম, ভবসাগর তারণ কারণ হে, গুরুদেব দয়া করো দীন জনে। সুর ঢেউয়ের মতো একবার করে উঠছে, একবার করে পড়ছে। মন বলছে, ঈশ্বর, মেসোটি যেন রাতে ভিমরুলের চাকে খোঁচা না মারেন!
১.০৬ বিবাদে বিষাদে প্রমাদে প্রবাসে
আপনার প্রথম চিঠি আমি পেয়েছি। কিন্তু আপনার দ্বিতীয় চিঠি, যে-চিঠিতে আপনি দিন, তারিখ লিখে জানিয়েছেন বলছেন, সে চিঠি আমি পাইনি। দেখুন পোস্ট করেছেন কি না!
কী বলছেন আপনি হরিদা? আমি নিজে হাতে লাল ডাকবাক্সের ঠোঁটে টুক করে গলিয়ে দিলুম, কোর্টে যাবার পথে। আমার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। আইনের ব্যাবসা করি। মক্কেল চরিয়ে খাই।
আপনি তো গোড়াতেই গলদ করে বসে আছেন বিনয়দা। যেসব ডাকবাক্স পথের ধারে ষাঁড়ের মতো বসে আছে, তাদের স্বভাব আপনার জানা নেই। কিছু গলায় রাখে, কিছু পেটে। চিঠি ফেলতে হলে কঁধ পর্যন্ত হাত ঢুকিয়ে দিয়ে ফেলতে হবে। সে চিঠি এখনও আপনার আটকে আছে। লেটারবক্স ডাইজেস্ট করতে পারেনি।
হতে পারে। পৃথিবীকে আমি আর বিশ্বাস করি না। এর অনেক মুখ। জাস্ট লাইক এ কারবাঙ্কল। তবে ডাকবাক্সে আমি আর জীবনে হাত ঢোকাব না। সে চিঠি যাক আর না-যাক।
অদ্ভুত প্রতিজ্ঞা। কারণটা কী?
সে এক কেলেঙ্কারি ব্যাপার। ডাকবিভাগের ইতিহাসে লেখা থাকবে।
কনক চায়ের কাপ হাতে ঘরে ঢুকছিল। তার গলা দিয়ে কুঁক করে একটা শব্দ বেরোল। যেন পাতিহাঁস একবার ডেকেই পেছন উলটে জলে গলা ডোবাল। সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিতে পেরেছে। এই যা রক্ষে। দুই অভিভাবকই ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছেন। দু’জনেই মনে হয় সমান ধাতের মানুষ। একই ধাতুতে তৈরি। টাকার এ পিঠ আর ও পিঠ। কনক আমার পিতাঠাকুরের সামনে খুব কায়দা করে চায়ের কাপ রেখে বললে, আপনার চা মেসোমশাই। দুধ কম, চিনিও কম।
দ্যাটস ফাইন। তুমি কী করে জানলে, আমি দুটোই কম পছন্দ করি?
আমি যে জেনে নিয়েছি আগেই।
তোমার সব দিকে এত নজর?
সবে আধঘণ্টাও পেরিয়েছে কি না সন্দেহ। পিতা অফিস থেকে ফিরেছেন। এর মধ্যেই কনকের নজরে অভিভূত। মেয়েদের এই একটা সুবিধে। সহজেই মন জয় করে নিতে পারে। পিতা এমনভাবে তাকিয়ে আছেন যেন সন্ধিপুজোর মুহূর্তে ধূপধুনোর ধোঁয়ার পাতলা আবরণের আড়ালে দেবী দুর্গাকে দেখছেন ভক্তের চাহনিতে। স্তোত্রটি পড়ে ফেললেই হয়, নমস্তে সিদ্ধসেনানী, আর্যে। মন্দরবাসিনী, কুমারী, কালী, কপালী, খগখেটকধারিণী।’ উপায় থাকলে লিঙ্গ পরিবর্তন করে পৃথিবীটাকে বাকি জীবনের জন্যে একবার দেখে নিতুম। ন্যাজে খেলানো কাকে বলে! মুকুর প্রশংসা তো আগেই এক পক্কড় হয়ে গেছে। গার্গী মৈত্রেয়ীর সমপর্যায়ে উঠে পড়ার টেবিলে গ্যাট হয়ে বসে, গনর গনর করে কী একটা মুখস্থ করছে। এলো চুল ছড়িয়ে আছে পিঠের ওপর। সুখেন হলে নেচে নেচে গাইত, এলো চুলে গৌরী আমার শাঁখা সিঁদুর পরেছে।
