বিষ্টুদা বললেন, মনমরা হয়ে বসে থেকো না। যা হয়েছে তা হয়েছে। যা হবে তার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করো। সবচেয়ে বড় ভুল করেছ ওই মহিলা, মানে তোমার পাতানো কাকিমাকে মামার সঙ্গে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়ে।
তা না হলে যে বাবার নামে যা-তা বদনাম হচ্ছিল। আপনি জানেন, ডাকে একটা পারসেল এসেছিল? এই পাড়ারই কোনও বদমাশ পাঠিয়েছিল। সেই পারসেলের মধ্যে ছিল যৌনবিজ্ঞান, আর একটা চিঠি। অশ্লীলতম সেই চিঠি। কী লেখা ছিল জানেন? ‘নিজে কিনতে লজ্জা পাবেন ভেবে আমরা উপহার পাঠালুম। যে বউভাত হল না, মনে করুন এটি সেই বউভাতেরই উপহার। খাওয়াটা পাওনা রইল মাইরি। অন্নপ্রাশনে যেন বাদ না পড়ি। বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখি!
বিষ্টুদা উত্তেজিত হয়ে টুল ছেড়ে উঠে পড়লেন। এগিয়ে গেলেন চা তৈরির টেবিলটার দিকে। নিজের মনেই বললেন, দুনিয়াটা শালা ভগবানের চিড়িয়াখানা। নেই কাজ তো খই ভাজ।
দু’কাপ চা তৈরি করে, এক কাপ আমাকে দিলেন, এক কাপ নিজে নিলেন, বুঝলে, এই পাড়াটা একেবারে থার্ডক্লাস হয়ে গেছে।
এটা করেছে, ওই মহিলার সেই লম্পট মামাশ্বশুটা।
মিস্টার বার্নিশ?
মিস্টার বার্নিশ মানে?
বার্নিশ করা জুতো পরে না? পাইপ লাগিয়ে সিগারেট খায়! গুরুদেব লোক। যুদ্ধের সময় মিলিটারি ইউনিফর্ম সাপ্লাই করে বহুত পয়সা কামিয়েছিল। তোমার ওই প্রফুল্লকাকা তো ওই বাড়িতেই ছিল। অনেকদিন ছিল, তারপর আর পারলে না। লোকটা একটা অমানুষ। আজ বাদে কাল ঘাটে যাবে এখনও খিদে গেল না। ভগবান এসব লোককেই বড়লোক করেন। কী বিচার মাইরি! সাধু মরে ভিক্ষে করে, শয়তানে মারে চামরমণি চাল।
বিষ্টুদা আবার টুলে এসে বসলেন। হাতে চায়ের কাপ। রাস্তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাকে তা হলে দেখাশোনা করার কেউ রইল না?
নাঃ, একেবারে একা। আপনি আমাকে বলুন, এখন আমার কী করা উচিত! আমি একটা তালা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। অনেক দূর চলেও গিয়েছিলুম, শেষে আপনার পরামর্শ নেব বলে ফিরে। এলুম। আমার মাথায় আসছে না কিছু। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আত্মহত্যা করি।
তোমার সঙ্গে আমার মনে হয় পূর্বজন্মের কোনও সম্পর্ক ছিল। আত্মহত্যার কথা মনেও এনো না। কাপুরুষতা। জানো তো আমারও কেউ ছিল না। একেবারে অনাথ। মামার বাড়িতে পাত কুড়িয়ে মানুষ। লেখাপড়া ছেলেবেলায় হল না কেউ স্কুলে ভরতি করলে না বলে। চেহারাটা ভাল ছিল, কিছুকাল যাত্রাদলে নায়ক হয়েছিলুম। চরিত্রটা খরচ হয়ে যাবার ভয়ে পালিয়ে এলুম। নিজের চেষ্টায় লেখাপড়া শিখলুম। ছাপছোপ নেই, কিন্তু খুব একটা অশিক্ষিত নই। জীবন হল ঠান্ডা মাথায় অঙ্ক। কষা। দেখেশুনে পথ চলা। গর্তটর্তে পড়লেই বিপদ, আর পথে অনেক গর্ত থাকবেই। আপাতত তুমি একটা কাজ করো। বাড়ি যাও। চান করো। দাড়ি কামাও। বাবার চলে যাওয়াটা পাঁচকান কোরো না। চেষ্টা করো নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে। যেন কিছুই হয়নি। আজ দুপুরে তুমি আমার বাড়িতে খাবে। খাওয়াদাওয়ার পর আমরা দুজনে একটা প্ল্যান করব।
আপনার বাড়িতে খেতে আমার লজ্জা করবে।
তার মানে তুমি আমাকে ঠিক আপন ভাবতে পারছ না। আর তা না হলে, আমাদের বাড়িতে খেতে তোমার ঘেন্না করছে। জাতের বিচার আসছে।
জাত আমাদের পরিবারের কেউই মানে না, বিষ্টুদা। ঠিক আছে, আমি সব সেরে আসছি।
সেই বিপুল বিশাল তালাটা খুলে আবার আমার গৃহপ্রবেশ। মন চাইছে না। পা যেন আর চলছে। না! এ যেন বইয়ের মলাট খুলে অক্ষর হয়ে যাওয়া। সারা বাড়িটা যেন স্তব্ধ সংগীতের মতো। প্রতিটি ইট যেন কথা বলতে চাইছে। প্রতিটি কোণে যেন ঘটনা জমে আছে। অজস্র ঘটনা। বিশাল এক উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি ছিঁড়ে ছত্রাকার হয়ে পড়ে আছে। বহুদিন আগের একটা ঘটনা আমার মনে পড়ছে। ইঁদুরকল পাতা হয়েছিল। ভোরে উঠে দেখি ছোট্ট একটা ইঁদুর সেই কলে পড়েছে। পুঁতির মতো উজ্জ্বল দুটো চোখ। ভেলভেটের মতো মসৃণ চকচকে গা। ইঁদুরটা একেবারে শেষ মাথায় বসে আছে ভয়ে ভয়ে। মৃত্যুকে সবাই চেনে। নির্বোধ ইঁদুরও। কলটার সামনে গিয়ে বসতেই করুণ চোখে ইঁদুরটা আমার দিকে তাকিয়ে রইল। বুঝতে পেরেছিল, আমি এক ঘাতক। ইঁদুরটাকে আমি মারতে পারিনি। ছেড়ে দিয়েছিলুম। কী আর করবে! কিছু বই আর কাগজ কাটবে। বাড়িতে পা দিয়েই মনে হল, আমি সেই কলে-পড়া ইঁদুর। বিশাল এক কলে একা পড়ে আছি।
ঘরের আলনায় বাবার জামাকাপড় হ্যাঁঙারে ঝুলছে। সমস্ত জামা আর কাপড় পাট করে আলমারিতে তুলে রাখলুম। কী পরে গেছেন বুঝতে পারছি না। চটিজোড়া পড়ে আছে। নিউকাটটা নেই। একবার সন্দেহ হল, বাড়ির কোথাও নেই তো? মন কত অবুঝ! সত্যকে মেনে নিতে পারে না। গোটা বাড়িটা আবার আমি ঘুরে এলুম। বাথরুমে উঁকি মারলুম। নীচের সমস্ত ঘর। নীচের যে-ঘরে কাকিমা থাকতেন, সেই ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলুম। চৌকি। তার ওপর পুরু বিছানা। নিপাট চাদর। কাকিমা সবই ফেলে রেখে গেছেন! সামান্য কিছু নিয়ে গেছেন, যা না নিলেই নয়। সাধের সেই আয়নাটা পড়ে আছে কুলুঙ্গিতে। চিরুনি। চুলবাঁধার ফিতে। বড় একটা পাউডারের কৌটো। সিঁদুর। একপাতা টিপ। মেয়েলি যত কিছু সব পড়ে আছে। এসবের আর কোনও প্রয়োজন নেই সেই মহিলার, কারণ তিনি বিধবা হয়েছেন। সম্পূর্ণ নিরাশ্রয়, নিঃসন্তান এক মহিলা।
