আমি তা পারব না। কোথায় কোন সুদূরে আশ্রয়হীন এক মানুষ আকাশবৃত্তি করে দিন কাটাবেন, আর আমি থাকব সুখশয্যায়, যুবতীর নরম বুকে মুখ গুঁজে? এ হতে পারে না। তিনি পথে নেমে আমাকেও পথে নামার ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন।
ব্যস্তসমস্ত লোকজন আমার চারপাশ দিয়ে চলেছে পৃথিবীর কাজে। জীবনসমুদ্রে আমি দাঁড়িয়ে আছি নিঃসঙ্গ নাবিকের মতো। আমার জাহাজের হাল ভেঙে গেছে। কম্পাসের কাঁটা খুলে পড়ে গেছে। কিন্তু বিষয় কী সাংঘাতিক জিনিস! হঠাৎ মনে হল, বাড়িতে কয়েক লক্ষ টাকার জিনিস পড়ে আছে, আর আমি এক সামান্য তালার ভরসায় বাড়ি ফেলে রেখে কোথায় চলেছি! কতদিনের জন্যে চলেছি!
আমি যক্ষ। আমার পিতা আমাকে যক্ষ করে রেখে চলে গেলেন। এ কী ভয়ংকর শাস্তি! সকাল থেকে এক কাপ চা-ও পড়েনি পেটে। খিদেতে নাড়িভুড়ি জ্বলছে। ঠান্ডা জলে স্নান করার জন্যে শরীর ছটফট করছে। গাছের ছায়া ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছে। একভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেও আর ভাল লাগছে না। অবশেষে নিজের সঙ্গে একটা সমঝোতা হল। কোনও ব্যাপারেই হঠকারিতা ভাল নয়। আগে বাড়িটার একটা ব্যবস্থা করা দরকার। সোনাদানার একটা সুরক্ষার প্রয়োজন।
আবার আমি উলটো দিকে হাঁটতে শুরু করলুম। পরামর্শ নেবার মতো একজন কাছের মানুষের নাম মনে পড়েছে। তিনি হলেন বিষ্টুদা। এতক্ষণ ওই নামটা কেন মনে পড়েনি! মাইলটাক হেঁটে বিষ্টুদার দোকানে এসে হাজির হলুম। দোকান প্রায় খালি। আজ অফিসবার। এইসময় কে আর দোকানে থাকবে। বিষ্টুদা সবে টিফিন করতে বসেছেন। তার টুকটুকে ফরসা মেয়েটি খাবার এনেছে। বাড়ি থেকে। বিষ্টুদার প্রিয় খাবার, পরোটা, আলুর তরকারি। আমি ধপাস করে একটা বেঞ্চে বসে পড়লুম। আমার আর ক্ষমতা নেই।
একটা ঢোঁক গিলে বিষ্টুদা বললেন, কী হল? আজ তোমার ছুটি নাকি?
আপনার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে। সবার আগে এক কাপ চা চাই। সকাল থেকে আমার এক গেলাস জলও জোটেনি।
সেকী? পরোটা খাবে? কৌটোয় আছে। খুব ভাল খেতে হয়েছে। টিপের মা খুব ভাল রাঁধে।
বিষ্টুদার মেয়ের নামটা খুব সুন্দর, টিপ। পরোটা আমারও খুব প্রিয় খাদ্য। পেট খালি। আগুনের মতো জ্বলছে। বললুম, খাব। আরও বললুম এই কারণে, আজ আর অন্য কিছু জোটার আশা নেই। কে রাঁধবে! উনুন ধরিয়ে রান্না চাপাবার মতো মনের অবস্থা আমার নেই।
টিপ হাসিমুখে অ্যালুমিনিয়ামের গোল টিফিনকৌটোটা আমার হাতে তুলে দিল। টিপের বয়েস হবে তেরো থেকে চোদ্দোর মধ্যে। অপূর্ব সুন্দরী। এই মেয়ের জন্যে বিষ্টুদার ভাবনার শেষ নেই। চারপাশের পরিস্থিতি ক্রমশই খুব জটিল হয়ে উঠছে। যুবশক্তি জেগে উঠেছে তো! পুলিশ দিয়ে ঘুম পাড়াতে হয়। টিপকে দেখলে কেবলই মনে হয়, আমার যদি ওইরকম একজন বোন থাকত!
ময়ান দেওয়া ময়দার বাদামি করে ভাজা পরোটার একটা টুকরো মুখে তুলতে গিয়ে আমার হাত। থেমে গেল। কেমন করে খাব! কেবলই পিতার কথা মনে পড়ছে। এই মুহূর্তে তিনি কোথায়! তিনি তো পথেঘাটে দিন কাটানোয় অভ্যস্থ নন। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে অতিশয় খুঁতখুঁতে। বারেবারে চা খেতে ভালবাসেন। নিজস্ব বাথরুম ছাড়া অস্বস্তি বোধ করেন। মানুষের সঙ্গে তেমন মিশতে পারেন না। গ্রাম্য আলাপ-আলোচনা অপছন্দ করেন। এমন একজন মানুষ কেমন করে সন্ন্যাসী হবেন! সহসা গুরু বলে কারওকে মানতে পারেন না। তার পক্ষে আশ্রমজীবন তো অসহ্য হবে! অভুক্ত, অস্নাত সেই মানুষটির মুখ আমার চোখে ভেসে উঠেছে। পরোটা খাই কেমন করে! হাত ঠোঁটের কাছে উঠছে, আবার নেমে আসছে।
টিপ দেখছিল। বললে, তুমি খেতে পারছ না কেন? ঘেন্না করছে?
আমি তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলুম। চোখে জল এসে গেল।
তুমি কাঁদছ?
বিষ্টুদা আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললেন, একী? সত্যিই তো তুমি কাঁদছ। কী হয়েছে?
পরোটার টুকরোটা আলুর তরকারি সমেত মুখে ঢুকিয়ে দিলুম। এককথায় উত্তর দেবার মতো সহজ ঘটনা ঘটেনি
বিষ্টুদা বললেন, ব্যাটাছেলে যখন কাঁদে তখন বুঝতে হবে সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটেছে।
পরোটা দু’খানা কোনওরকমে খেয়ে ফেললুম। টিপ বাটি, কৌটো, যাবতীয় সব নিয়ে বাড়ি চলে গেল। বিষ্টুদা বেশ তরিবাদি করে দু’কাপ চা করলেন। চা খেতে খেতে পুরো ঘটনাটা বিষ্টুদাকে বললুম। কোনও ঝগড়া নয়, কথা কাটাকাটি নয়, তেমন কোনও ভুল বোঝাবুঝি নয়। হঠাৎ সব ছেড়ে, যতদূর মনে হয় একেবারে শেষরাতে আমার সর্বাধিক প্রিয়, শ্রদ্ধেয় বাবা, কোনও নির্দেশ না রেখে, কোনও হদিস না দিয়ে চলে গেলেন।
আমাদের দুজনের জীবন খুব একটা সুখের ছিল না। অর্থের জন্যে নয়। অর্থের অভাব আমাদের ছিল না। ধনী না হলেও গরিব ছিলুম না আমরা। মৃত্যু। মৃত্যুর পর মৃত্যু আমাদের সংসারের খোঁটা নড়িয়ে দিয়ে গেছে। সব এলোমেলো, ছত্রাকার। কোথাও একটা আদর্শের সংঘাতও ঘটছিল। একটা সন্দেহ খেলা করছিল দুজনের মনে। সেই সন্দেহের উৎস নারী। বিষ্টুদাকে সব কথা বলা গেল না। বলতে পারা গেল না। সন্দেহের মধ্যে একটা নীচতা থাকে যে! যাকে সন্দেহ করা হয় তার কিছু নয়, যে সন্দেহ করে সে-ই ছোট হয়ে যায়, সংকীর্ণ হয়ে যায়। আমি কিছুতেই বলতে পারলুম না, তবলাবাদক প্রফুল্লবাবু, যিনি আমার পিতার আশ্রয়ে ছিলেন, সন্দেহজনক অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন, সেই ভদ্রলোকের স্ত্রীকে ঘিরে পিতা-পুত্রে একটা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হচ্ছিল। বলতে পারলুম না আমি নিজে একটা কামুক, লম্পট। ভাবটা দেখাই সন্ন্যাসী হতে চাইলেই হতে পারি। আমি এক মহা ধার্মিক, বেদান্তবাদী, ত্যাগী। সাধুসঙ্গ করি। এটা আমার মুখোশ। আসলে আমি এক দুর্বলতম যুবক। কোপন স্বভাবের ভয়ংকর এক চরিত্র। বয়স, সম্পর্ক কিছুই আমি মানি না। দেহবাদী শয়তান আমি। সুযোগ পেলে যে-কোনও কুকর্ম আমি করতে পারি। আমার মুখ দেখে মনের ভাব পড়ার উপায় নেই। আমার ভেতর দুটো মানুষ বাস করে, সাধু আর শয়তান। সেই শয়তান কিন্তু প্রফুল্লবাবুর স্ত্রীতে আসক্ত। সেই নারী আবার পিতার ওপর নির্ভরশীল। দুৰ্জেয় নারীচরিত্র। ব্যাপারটা অতিশয় জটিল। পিতা হরিশঙ্কর পর্বতের মতোই অচল অটল। তাঁর মন বোঝার সাধ্য কারও নেই। তিনি গুপ্তযোগী। কিন্তু! এর মধ্যে একটা কিন্তু এসে হাজির হয়েছে। হঠাৎ আমার মনে হয়েছে, ব্রহ্মচারী পিতা কিঞ্চিৎ দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। আমার পরলোকগতা মাতার স্মৃতি ক্রমশ ম্লান থেকে ম্লানতর হয়ে আসছে। সংসারের সমস্ত কর্তৃত্ব চলে যাচ্ছে ওই মহিলার হাতে। ওই মহিলা আমার পিতাকে প্রায় গ্রাস করে ফেলেছিলেন। ওই নিঃসন্তান মহিলার কামনা বাসনা নির্বাপিত হয়নি। যৌবন বিদায় নেয়নি তার শরীর থেকে। মুহূর্তে তিনি বাঘিনী হতে পারেন। একদিন ওই মহিলা আমারই এক দুর্বল মুহূর্তে আমাকে শরীর দান করেছিলেন। অক্লেশে। সেই দুর্বার আকর্ষণে আমি বড় অসহায় বোধ। করেছিলুম। সেই ছিল আমার জীবনের প্রথম যোষিৎ সংসর্গ। একই সঙ্গে প্রচণ্ড পাপবোধ আর পরমানন্দে আমি দীর্ণ হয়েছিলুম। সেইরাতেই একটা বোঝাঁপড়া হয়েছিল, সম্পর্ক যাই হোক আমরা স্বামী-স্ত্রী। বয়সের ব্যবধান বিচারের বিষয় নয়। আমি ভালবাসি, তুমিও ভালবাসো। কী অবিশ্বাস্য ব্যাপার, সেই মহিলা এক ত্রিভুজ তৈরি করে বসলেন। পিতার কঠিন বর্ম ভেদ করে জয় করে ফেললেন তার মন। আমার মায়ের আঁচলে যে চাবিয় গোছাটি বাঁধা থাকত সেটি চলে গেল তার আঁচলে। যেসব স্মৃতিতে আমরা ছাড়া বাইরের কারও হাত দেবার অধিকার ছিল না, সেই সব বস্তু তিনি নিঃসংকোচে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। আমার মায়ের জামাকাপড় সব টেনে টেনে বের করছেন, ঝাড়ছেন, গুছোচ্ছেন, প্রশ্ন করছেন। আমাদের সমস্ত গোপনীয়তার মধ্যে প্রবেশ করতে চাইছেন। একটা অধিকার প্রতিষ্ঠার অযাচিত প্রয়াস। অবশেষে আমাকে রূঢ় হতে হল। কেন হলুম! আজ এই মুহূর্তে, বিষ্টুদাকে বলতে বসে সেই প্রশ্নের উত্তর পেলুম। ঈর্ষা। প্রচ্ছন্ন কাম। প্রবল অধিকারবোধ। জৈব তাগিদ। হাড়ে মজ্জায় লুকিয়ে বসে থাকা রিরংসা। কেন এই বিকৃতি? সেই জিজ্ঞাসার উত্তরও আমি যেন দিতে পারছি নিজেকে। বড় আগলে আগলে মানুষ করা হয়েছিল। মা-মরা এই ছেলেটিকে। পৃথিবী থেকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা হয়েছিল। চেষ্টা করা হয়েছিল দেবোপম করার। নানাভাবে ঠেলার চেষ্টা হয়েছিল ব্রহ্মচর্যের দিকে। সন্ন্যাসীর আদর্শের দিকে। শৈশব থেকেই যে মা-হারা, যার পরিবারে শুধুই পুরুষ, নারী তো তার কাছে এক দুর্বার কৌতূহল। স্বাভাবিক থেকে যে বঞ্চিত, সে তো অস্বাভাবিকের দিকে ছুটবেই। মহাপুরুষ সে হবে কী করে? সে কি হওয়া যায়? হয়ে আসে।
