বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর মনে হল, সংসারের যে ছেঁড়া টুকরোটি অবশিষ্ট ছিল, আমিই সেটাকে শেষ করে দিয়েছি। আর কিছু করার নেই। উঠে এলুম নির্জন দোতলায়। বাবার পড়ার টেবিলে রাজ্যের বই, নোটখাতা। একটু গোছগাছ করে রাখার চেষ্টা করলুম। যদি কোনওদিন ফিরে আসেন হঠাৎ। জানি সে সম্ভাবনা খুবই কম। তিনি এগোতে জানেন। পেছোবার মানুষ তিনি নন।
যে-মেয়েটি কাজ করে সে এসে তালা ঝুলতে দেখে ফিরে গেছে। গত রাতের এঁটো থালাবাসন সব পড়ে আছে। ওগুলোর একটা ব্যবস্থা করা দরকার। আমার এখন গুটোবার সময়। ফলাও করে ফেঁদে বসার দিন চলে গেছে।
বেশি না, গোটাকতক বাসন। কুয়োতলায় টেনে নিয়ে মাজতে বসে গেলুম। একবার গভীর জলের দিকে তাকালুম। এই কূপ থেকেই ঘনঘোর এক বর্ষার দুপুরে বলাইবাবু উপচে পড়েছিল। কচ্ছপ। কেমন পোষ মেনেছিল? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলুম! কচ্ছপ, কিন্তু ভীষণ ভদ্রলোক। সারা বাড়িতে আপন মনে ঘুরে বেড়াত। আবার কেমন? বলাইবাবু বলে ডাকলে, যেখানেই থাকুক, গুটিগুটি ঠিক ছুটে আসত। বাড়ি ছেড়ে চিরতরে চলে যাচ্ছি ভেবে, সকালে বলাইবাবুকে আবার কুয়োর মধ্যেই নামিয়ে দিয়েছিলুম। এখনও সে কি ওইখানেই আছে! বহুদিন জল ছাড়া। মরে গেল না তো! বহুক্ষণ তাকিয়ে রইলুম, যদি একবার দেখা দেয় ক্ষণিকের জন্যে! বারকতক ডাকলুম, বলাইবাবু, বলাইবাবু! জল এক অন্য জগৎ। শব্দ সেখানে পৌঁছোবে না। ওই ছোট্ট কুপে বলাইবাবু কি বেঁচে থাকবে! তেমন পরিসর তো নেই! মরেই যাবে হয়তো! তার জীবনে এতকাল আমরাই হয়েছিলুম সঙ্গী। কত কী খেত! তার জন্যে বিশাল বড় মাটির গামলায় জল রাখা হত টইটম্বুর। মাঝে মাঝে সেই জলে নেমে সাঁতার কেটে আসত। ওই কুপে তার তো কোনও খাদ্য নেই!
বাসন মাজা হয়ে গেল। ভাল করে মুছে যথাস্থানে সাজিয়ে রাখলুম। বেশ বুঝতে পারছি, এই বাড়িতে একা আমার পক্ষে থাকা সম্ভব হবে না। সে প্রশ্নও নেই। চাকরিটা আমি যদি না ছাড়ি, তা হলে আমাকে দেরাদুনে গিয়ে নতুন দায়িত্ব নিতে হবে। সেইখানেই ফেঁদে বসব নতুন ব্যবস্থা। উত্তরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি সম্ভব-অসম্ভব নানা কিছু ভাবতে লাগলুম। কোনও হদিশ না রেখে বাবার এই চলে যাওয়া, এ তো মৃত্যুরই সামিল। তিনি নেই। যদি সন্ন্যাস নেন, তা হলেও নেই। সংসারের কাছে তিনি অবর্তমান। তা হলে? তা হলে আমাকে তো আমার স্বাধীন পথেই চলতে হবে। এ সংসারে কে কার? একমাত্র আমিই আমার। তার অভিমান থাকতে পারে, আমার অভিমান থাকতে পারে না! পিতাই এখন আমার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। আমার জ্যাঠামশাইয়ের ভায়রাভাইয়ের ছোট মেয়ে মুকু। মুকুর দিদি কনককে আমি ভালবেসে ফেলেছিলুম। সে ছিল আমার মনের মতো। তার চাবুকের মতো শরীর। তার রসবোধ, পরিমিতিবোধ, আপন করে নেবার ক্ষমতা আমাকে বিমুগ্ধ করেছিল। আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল। সেই কনক কিন্তু আমাকে ছেড়ে চলে গেল। শুধু আমাকে নয়, চলে গেল সংসার ছেড়ে। মনে হয়েছিল কনকও আমাকে ভালবাসে। আমার সে ধারণা ভুল। নারীচরিত্র দুয়ে। আমাকে ভালবাসলে কী ক্ষতি হত তার! আমি যে তাকে ভীষণ ভালবাসতুম। যে ভালবাসে মেয়েরা তাকে ভালবাসবে না। কিছুতেই না, কোনও দিনও না। এইটাই নিয়ম। যে ঘৃণা করবে, তাকেই জয় করার জন্যে এগিয়ে যাবে। সব লিভিংস্টোনের জাত। ডার্কেস্ট আফ্রিকা ছাড়া কিছুই মনে ধরে না। মুকুকে আমি তেমন ভালবাসতুম না, অথচ সেই মুকুই আমার জন্যে কলকাতায় চলে এল কায়দা করে, এম এ পড়ার ছুতোয়।
এই মুকুকে আমি এই মুহূর্তে বিয়ে করে, দেরাদুনে গিয়ে শুরু করতে পারি আমার সর্বোত্তম নতুন জীবন। তোষা জীবন। পাহাড়ের কোলে সুরম্য বাংলো। টিয়াপাখি রঙের একটা গাড়ি, দু’পা দূরে মুসৌরি। তিন পা দূরে হরিদ্বার।
মাঝে মাঝে মানুষ দিবাস্বপ্ন দেখে। কল্পনায় প্রাসাদ রচনা করে। কারও কল্পনা বাস্তব হয়, কারও হয় না। ভেলভেটের বাক্সে জড়োয়ার অলংকারের মতো সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে। মাঝে মাঝে জীবনের অলস মুহূর্তে বের করে নাড়াচাড়া করে। আবার তুলে রেখে দেয়। তাতেও কত সুখ! পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার আনন্দ প্রভূত। বিষণ্ণতার চেয়ে একান্ত উপলব্ধি আর কী আছে! আমার বন্ধুর লেখা একটি কবিতা মনে পড়ছে:
শুরু না সমাপ্তি ভাল অথবা খারাপ
প্রতিটি প্রহর পল অনুপল মৃত্যু না জীবন
পৃথিবী যশোদা মাতা অথবা পুতনা
ভালবাসা শেষ হলে স্বস্তি না বিষাদ
কে আগে লক্ষ্যের কাছে পৌঁছে যায় পঙ্গু না সক্ষম।
২.০২ Good night? ah! no, the hour is ill
স্মৃতির চেয়ে বেদনাদায়ক আর কিছু নেই। বাথরুমের দরজার ফ্রেমে একটা ছোট পেরেক। সেই পেরেকে ঝুলছে টুথব্রাশ। বাবার টুথব্রাশ। নিয়ে যাননি সঙ্গে করে। বাড়িতে পরার চটি দরজার পাশে। কলম, রুমাল, পকেটঘড়ি। প্রিয় বই, নোটখাতা। হিসেবের খাতা। বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করামাত্রই কী অদ্ভুত এক নির্জনতা নেমে এল। হিমশীতল জল। যেন মৃত্যুর সঙ্গে, বিচ্ছেদের সঙ্গে কোলাকুলিগায়ে জল ঢেলে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলুম। বিশাল বড় গোলমতো গায়ে মাখার সাবান জলে গলছে। গোলাপের গন্ধ। এই সাবান বাবার খুব প্রিয়। ইংরেজ আমলে সাবান আসত বিলেত থেকে। টার্কিশ বাথ সোপ। কেমিস্ট মানুষ। সাবান, পারফিউম, ট্যালকম পাউডার, ফেসক্রিম– এইসব খুব ভাল বুঝতেন। নিজে তৈরিও করতে পারতেন। সাবান তৈরির উপায় ছিল না, বড় প্ল্যান্টের প্রয়োজন। বয়লার চাই। বাষ্প খাওয়াতে হয় সাবানকে। আমাকে শেখাতেন, সাবানের সিজনিং কাকে বলে! সাবানে বুড়ো আঙুলের নখ বসিয়ে দেখবে, কড়কড় করে গুঁড়ো গুঁড়ো উঠলে বুঝবে, সিজনড সাবান। জাত ভাল। বাজার ছুঁড়ে দিশি সাবানের মধ্যে এই সাবানটাকেই তার মনে হয়েছিল প্রায় বিদেশির মতো। কত শৌখিন মানুষ ছিলেন! সবাই বলত, এ ম্যান অফ টেস্ট।
