ঠাকুর বলেছেন, না পলাশ! তাকে জেনে– এক হাত ঈশ্বরের পাদপদ্মে রেখে আর এক হাতে সংসারের কার্য করো। যেকালে যুদ্ধ করতেই হবে, কেল্লা থেকেই যুদ্ধ ভাল। তোমরা ত্যাগ কেন করবে? বাড়িতে বরং সুবিধা, আহারের জন্য ভাবতে হবে না। সহবাস স্ব দারার সঙ্গে তাতে দোষ নেই। শরীরের যখন যেটি দরকার কাছেই পাবে। রোগ হলে সেবা করার তোক কাছে পাবে। জনক, ব্যাস, বশিষ্ঠ জ্ঞানলাভ করে সংসারে ছিলেন। এঁরা দু’খানা তরবারি ঘোরাতেন– একখানা জ্ঞানের, একখানা কর্মের।
তা হলে! আমার দশ কাঠা জমি, রাস্তার ধারের বাড়ি, চল্লিশ ভরি সোনা, হার্ড ক্যাশ সত্তর হাজার, কোম্পানির কাগজ! জ্ঞান-সূর্যের উদয়ে, পিতৃদেবের অভিমান-শিশির উবে যাবেই। তিনি জ্ঞানী, হঠকারী নন। ফিরে তিনি আসবেনই, সংসারের টানে। অপেক্ষা করে দেখতে দোষ কী? হঠকারিতার আর এক নাম মূর্খতা।
বেশ, তা হলে তাই হোক। মুকুকে এনে কয়েকদিন পাহারায় রেখে, আমি অনুসন্ধানে বেরোই। চমৎকার সিদ্ধান্ত! মনের কথা শুনতে হয়! মনই তো ঈশ্বর! তা হলে বাঁ দিকেই ঘুরি।
২.০১ Does the road wind up-hill all the way?
জগৎ যেমন চলছিল, ঠিক সেইরকমই চলছে। একজন মানুষের যাই হোক না কেন, বহু মানুষের তাতে কিছু যায় আসে না। পৃথিবী বড় উদাসীন। রাজপথ খোলা ফিতের মতো সুদূরে উধাও। ব্যস্ত মানুষ। ব্যস্ত যানবাহন। সবাই যাচ্ছে। কোথাও-না-কোথাও যাচ্ছে। দোকানপাটে গিজগিজ করছে মানুষ। রোদ যেন রুটি সেঁকছে। কাঁচের মতো আকাশ।
আমি হনহন করে অনেকটা হাঁটলুম। কোথায় যাব তা জানি না। পরামর্শ নেবার মতো কেউ নেই। হাঁটছি আর ভাবছি, থানায় যাব নাকি! একটা ডায়েরি করা যায়। তাতে যে ঘরের কথা বেরিয়ে আসবে। লজ্জার কথা। অফিসার প্রশ্ন করবেন, একজন প্রবীণ মানুষ হঠাৎ ভোররাতে বাড়ি ছেড়ে প্রায় একবস্ত্রে চলে গেলেন কেন? কী ঘটেছিল? একজন শিক্ষিত, সর্ব অর্থে সম্পন্ন মানুষ কেন চলে গেলেন? উপেক্ষা আর অত্যাচারের মাত্রা কতটা উঠেছিল? তুমি তো তার ছেলে? কী এমন করেছিলে? নেশাভাং করো? কোনও নারীঘটিত কেলেঙ্কারি? আমি তার কী উত্তর দোব? আমি তো বোঝাতে পারব না, মহাশয়, সে এক অদ্ভুত আত্মিক সংকট! মনের সেই অবস্থা, যখন মনে হয় আমার সব থেকেও কিছু নেই। আমি রিক্ত, শূন্য, শ্রান্ত।
তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না, করে শুধু মিছে কোলাহল
সুধাসাগরের তীরেতে বসিয়া পান করে শুধু হলাহল ।
এই তুমিকেই তো বোঝানো যাবে না। আমির সংসারে তুমি আবার কে? তারপর চাইবেন ছবি। জানতে চাইবেন, কোথায় যাওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি।
আরও আধ মাইলটাক হাঁটার পর সিদ্ধান্তে এলুম, থানায় যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। থানার পরিবেশে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ব। সিদ্ধান্তে আসার পর আমার গতি মন্থর হল– তা হলে আমি চলেছি কোথায়! সারাভারত পদব্রজে ঘুরে বেড়ালেই কি আমার পিতা হরিশঙ্কর ফিরে আসবেন? তিনি.হঠকারী নন। আবেগের বশে কোনও কাজ করেন না। ক্ষণে ক্ষণে তার মত, তার সিদ্ধান্ত পালটায় না। ইস্পাত-কঠিন এক মানুষ। সব ছেড়ে, সব ঝুট হ্যায়, বলে চলে গেছেন। আমি থেমে পড়লুম। পথের পাশে কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায়। এলোমেলো ভাবনা আমাকে উতলাই করছে, কোনও পথ দেখাতে পারছে না। পিতার খাতায় তারই হাতে লেখা সেই লাইন ক’টি ফিরে ফিরে আসছে ‘যে-কর্তব্যের মুখ চেয়ে এতকাল পুতুল খেলছিলে, তোমার সেই উত্তরপুরুষ আজ তৈরি। জীবনের সুপথ, কুপথ, ঘুরপথ সবই চিনতে শিখেছে। স্নেহের শিকল কেটে এবার পাখিটিকে উড়িয়ে দাও। তার স্বাধীন ইচ্ছে তৈরি হয়েছে। আর তাকে প্রদীপের মতো আগলে রেখো না। এবার তাকে সাবালক হতে দাও। হাবুডুবু না খেলে সাঁতার শেখা যায় না। জেনে রাখো এক জঙ্গলে দুটো বাঘ থাকতে পারে না। তুমি তো বৃদ্ধ বাঘ হে!
হাঁটতে হাঁটতে আমি বাস রাস্তায় এসে পড়েছি। এদিকে ওদিকে বাসের ছোটাছুটি। হাঁ করে দেখছি সব। আমি যেন অন্য জগতের মানুষ। এইমাত্র পৃথিবীতে বেড়াতে এসেছি অন্য কোনও গ্রহ থেকে। কোনও কিছুর সঙ্গেই আমার মনের যোগ নেই। জীবন্ত এক স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছি আমি। অভিমানে ভেতরটা ফুলে ফুলে উঠছে। পিতা পুত্রের সঙ্গে এমন ব্যবহার করতে পারেন! জগতের সামনে আমাকে কতটা ছোট করে গেলেন। তার মনে যাই থাক, পৃথিবী তো এর অন্য ব্যাখ্যা করবে! সবাই বলবে, আমি তাকে তাড়িয়েছি। সবাই বলবে, আমার জন্যেই তিনি আলাদা হয়ে গেলেন।
আমি এখন যাই কোথায়? অফিস তো মাথায় উঠল। কলকাতার হস্টেলে মুকু আছে। আমার প্রেমিকা। আমার জন্যেই সে কলকাতায় পড়তে এসেছে। ঠুনকো প্রেম নয়। অনেকদিন ধরেই লালন-পালন করছে। মুকুর কাছে যাব বলেই বেরিয়েছিলুম। এখন মনে হচ্ছে কী লাভ! প্রেম বড় সুখী। আমার জীবনের ভিত ভূমিকম্পে দুলে উঠেছে। পায়ের তলায় জমি আছে বলে মনেই হচ্ছে না। সুখের বাগানে বসেই প্রেমের বাঁশি বাজানো চলে। মরুভূমির তপ্ত বালিতে, মনসা গাছের ঝোঁপের পাশে বসে সুন্দরী রমণীর সোহাগের কথা ভাবা যায় না। মানুষ তখন কোনওরকমে বাঁচার কথাই ভাবে। সংসার মানে সমর্থন। একা একা হয় না। সবাই হাত তুলে সমর্থন জানাবে, তবেই না। আনন্দ। প্রেম মানে আনন্দ, প্রেমানন্দ।
আমি জানি, এখনই মুকুর সামনে গিয়ে দাঁড়ালে, সে চলে আসবে। কোনও কিছুর পরোয়া করবে না সেই বেপরোয়া মেয়ে। বাড়ির সদরের বিশাল তালা খুলে, মুকুকে নিয়ে আমি সেই নিরানন্দ পুরীতে গিয়ে ঢুকতে পারি। হাসতে পারি, গাইতে পারি, ভোজসভা বসাতে পারি। মনে মনে ভাবতে পারি কে কার পিতা! সাধ করে কেউ বৈরাগী হতে চাইলে, আমি কী করতে পারি। আমি সানাই বাজিয়ে, আলোর মালা ঝুলিয়ে মুকুকে বিয়ে করতে পারি। আমি চাকরি করি। আমার পদোন্নতি হয়েছে। দেরাদুনে আমি বদলি হয়েছি। সেখানে নতুন যে লেবরেটারি হচ্ছে, আমি তার ভারপ্রাপ্ত। ব্যাঙ্কে জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে সত্তর হাজার টাকা। ষাট-সত্তর ভরি সোনা বাড়িতে মজুত। আমি তো বড়লোক। আমি যদি সত্যসত্যই একটা স্কাউড্রেল হতুম আমার এই মনস্তাপ হত না। বরং আনন্দে নাচতুম, সব আমার। আমি রাজা। আমি মালিক।
