কোণের দিকে ঠকাস করে একটা শব্দ হল। বলাইবাবু উলটে গেছে। যাবার আগে বলাইবাবুর একটা ব্যবস্থা করে যেতে হয়। পুকুরে ছাড়লে সর্বগ্রাসী মানুষ খেয়ে শেষ করে দেবে। নদীতে ছাড়লে অনিশ্চয়তায় হারিয়ে যাবে। চলো, তুমি যেখান থেকে এসেছিলে সেইখানেই ফিরে চলো। নাটক শেষ হয়ে গেছে বলাইবাবু। যবনিকা নেমে গেছে। দর্শকের আসন শূন্য। অভিনেতারা সবাই চলে গেছে। শূন্য মঞ্চে শুধু তুমি আর আমি। চলো, আর না। এখানে এবার শুরু হবে নতুন নাটক। সে কাহিনিতে তোমার আর আমার স্থান নেই।
বারান্দার কোণে ঝুড়িতে বলাইবাবুর খাদ্য। শাকপাতা, পাকা কলা। মানুষের হাতে শেষ খাওয়া খেয়ে যাও। বলাইবাবুর বেশ খিদে পেয়েছিল। শরীরের পাশ দিয়ে বিচিত্র মুখটি বের করে শাকের কুচি, কলার টুকরো টেনে নিতে লাগল। অবোধ জীব জানে না, এরপর কী হবে! কে-ই বা জানে! আমি-ই কি জানি, একটু পরে আমার কী হবে! কাল কি জানতুম, আজ আমার কী হবে!
খাওয়া হয়ে গেল? চলো, লক্ষ্মী ছেলে। তুমি ছেলে, না মেয়ে!
বলাইবাবুকে বুকের কাছে ধরে, পেছনের অন্ধকার-অন্ধকার, ভাঙা-ভাঙা-সিঁড়ি বেয়ে নীচে পাতকোতলায় নেমে এলুম। নতুন দিনের আলো লেগেছে গাছের পাতায় পাতায়। বহুকাল পরে বউ কথা কও এসে বসেছে নিমগাছের ঝিরিঝিরি পাতার আড়ালে। বড় অদ্ভুত ডাক। তার হলদে শরীর এক ঝলক নেচে গেল চোখের সামনে ঈশ্বরের খুশির মতো। কুয়োর স্থির জলে নিজের মুখের প্রতিচ্ছবি। বহু দূর থেকে বিষণ্ণ একটি মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সত্যিই আমি যেন জলে পড়ে গেছি। মন-কেমন করা একটা শীতলতা ওপর দিকে ঠেলে উঠছে।
বলাইবাবু আজকাল আর খোলের ভেতর মুখ ঢুকিয়ে নেয় না। গলার কাছে তার মুখ খেলছে। ভিজেভিজে স্পর্শ। ভেষজ-ভেষজ গন্ধ। বলাইবাবু, ওই যে তোমার বর্তুলাকার জগৎ। ওইখান থেকেই তুমি এসেছিলে এক বর্ষার দুপুরে। যাও, আবার তুমি তোমার জল-জগতের নিঃসঙ্গ গভীরতায় ফিরে যাও। বড় মনকেমন করছে বলাইবাবু। আর কোনওদিন তোমার সঙ্গে হয়তো দেখা হবে না। না, ওপর থেকে তোমাকে দুম করে ফেলব না। বালতিতে রেখে ধীরে ধীরে নামাব।
বলাইবাবু কিছুক্ষণ ভেসে রইল জলে। কূলকিনারা পাচ্ছে না। মাথাটা বৃত্তাকারে জলে ঘুরে গেল। একবার, তারপর ডিগবাজি খেয়ে বলাইবাবু তলিয়ে গেল জলে। একরাশ বুড়বুড়ি ভেসে উঠল জলের ওপর। পিতৃদেব লিখে গেছেন, আমরা সব সময়ের বুদবুদ।
গোটাকতক কাক ডেকে উঠল খা-খা করে। সমস্ত পৃথিবী যেন শুকিয়ে গেছে। বড় তৃষ্ণার্ত ডাক।
দেখতে দেখতে বেলা বাড়ছে। পিতৃদেব যে-উদ্দেশ্যেই যাত্রা করুন, আমার সঙ্গে ব্যবধান তার ক্রমশই বেড়ে চলেছে। কোথায় যেতে পারেন? হরিদ্বারে? বৃন্দাবনে? বিন্ধ্যাচলে? এই এত বড় একটা দেশ। হারাব মনে করলে অতি সহজেই হারিয়ে যাওয়া যায়।
চৌকির ওপর বসে চারপাশে একবার তাকালুম। কড়িকাঠে চারটে আংটা ঝুলছে। দূর অতীতে ওই আংটা থেকে ঝুলত একটা দোলা। সেই দোলায় শুয়ে শুয়ে হাতপা ছুড়ত একটি অসহায় শিশু। ওই যে ছবি, আমার মা। ডুরে শাড়ি পরে হাঁটু গেড়ে সেই দোলার পাশে বসে ধীরে ধীরে দোলাতেন, হাতের চুড়ি বেজে উঠত জলতরঙ্গের সুরে। ঘুমপাড়ানি গান গাইতেন চিরকালের সুরে, আয় ঘুম, যায় ঘুম, বর্গিপাড়া দিয়ে। তুমি আবার আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দাও মা। অতীতকে অলৌকিক কায়দায় টেনে আনো বর্তমানে। আবার একবার নতুন করে জীবন শুরু করি। যেসব ভুল এবারে করেছি, দ্বিতীয়বার আর তা করব না। না, তা বুঝি আর হয় না! জীবন টুথপেস্টের মতো। যা একবার বেরোয়, যতটুকু বেরোয়, ততটুকুই খরচ করে ফেলতে হয়।
পাশের অন্ধকার ঘর থেকে ঘড়ির চলনে টুপটুপ শব্দ ভেসে আসছে। এ শব্দ তো এতক্ষণ কানে আসেনি। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে উঁকি মেরে দেখলুম। নীল কাঁচ বসানো জানলা দিয়ে বিষাক্ত আলো এসেছে। দেয়াল-ঘেঁষে সার সার কালির বোতল। একটার মুখে বিশাল এক ফানেল। টুপটুপ করে নীল কালি পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা। হলাহলের মতো। কী আশ্চর্য! যাবার আগে ফিল্টারে কালিও চাপিয়ে গেছেন! এ এখন সারাদিন ধরে পড়বে। বলেছিলেন, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, সেইখানেই আবার তোমাকে ফিরিয়ে দিলুম। তুমি সুখী তো!
রাস্তায় বেরিয়ে সময়টা একবার দেখে রাখলুম। বেলা এগারোটা। সদরের দরজায় সবচেয়ে বড় তালাটা ঝুলিয়েছি। যক্ষপুরীর তালা। শূন্য বাড়িতে কিছু না থাক, সোনা আছে, দানা আছে, আর আছে স্মৃতির স্তূপ। মনের ঝুলিতে ভরে স্মৃতি বহন করা যায়, পার্থিব সম্পদের জন্যে সিন্দুক চাই, তালা চাই।
ক্রমশ ব্যবধান বাড়ছে। মোড়ের মাথায় এসে বাড়িটার দিকে তাকালুম। বিমর্ষ ইটের স্থূপ রোদে পুড়ছে। মাথার ওপর শরতের নীল আকাশ। সাদা ভেলার মতো ভাসছে মেঘখণ্ড। পায়রা উড়ছে চিকচিক করে। আমার বাড়ি। যতই এগোচ্ছি, ততই যেন লোভ বাড়ছে। অসংখ্য অদৃশ্য হাত পেছন থেকে টানছে। দশ কাঠা জমি, বাড়ি, চল্লিশ ভরি সোনা, ষাট-সত্তর হাজার নগদ টাকা, কোম্পানির কাগজ, আমার চাকরি, পদোন্নতি, দেরাদুন। সাবুগাছ লাগানো সেই বাড়িতে একটি মেয়ে। মুকু যার নাম। আজ বললে কালই যে জলে নামতে প্রস্তুত। আবার ওই আংটা থেকে দোলার চেন নেমে আসবে। নির্জন শ্মশানসম বাড়িতে কচি প্রাণের ক্রন্দন শোনা যাবে। চুড়ির জলতরঙ্গ বেজে উঠবে। রং-বেরঙের শাড়ি ঝুলবে। চুলে চিরুনি চালাবার দীর্ঘ শব্দ শোনা যাবে, ঝাউয়ের ডালে নীল সমুদ্রের বাতাসের মতো। আমার তো ভোগই হল না, ত্যাগ হবে কী করে! আমার লোটাকম্বলটি নিয়ে গেলেন যিনি পারেন তিনি। আমি হাঁটছি, হেঁটেই চলেছি, উদ্দেশ্যহীন হাঁটা। মনের প্রান্তরে খুলে গেছে দুটি পথ, ডান দিক গেছে স্বামী নির্মলানন্দের দিকে বৈরাগ্যের পথ, বাঁদিক গেছে সেই সাবুগাছ-ঘেরা মনোহর নিকেতনে। সেখানে আছে জীবনসঙ্গিনী। মন, তুমি বামাচারী হবে! মুকুকে রেখে তুমি তো ভারত ছুঁড়ে পিতৃদেবকে খুঁজে আনতে পারো। দেবসেবা, পিতৃসেবা দু’হাতে চালাতে পারো।
