যথা মৃদি ঘটো নাম কনকে কুণ্ডলাভিধা।
শুক্তৌ হি রজতখ্যাতিৰ্জীবসংজ্ঞা তথাপরে ॥
মৃত্তিকায় দিলে ঘট নাম, কনকে লাগালে কুণ্ডল নাম, শুক্তিতে নিয়ে এলে রজতের কল্পনা, তেমনি আত্মাকে দিলে জীবনের চেহারা। রঞ্জুতে সর্পভ্রম এনো না। ঘট মৃত্তিকাই, দেহ চিদাত্মময়। তোমার প্রারব্ধ ক্ষয় হয়েছে, এবার আত্মজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হও।
আর ঘুমাইও না মন।
মায়াঘোরে কতদিন রবে অচেতন।
কে তুমি কী হেতু এলে
আপনারে ভুলে গেলে
চাহ রে নয়ন মেলে
ত্যজ কুস্বপন ॥
সময় ঝুরঝুর করে বালির মতো ঝরে পড়ছে। দেহপিঞ্জর খুলে যাবার সময় আসন্ন। এতকাল স্নেহে অন্ধ হয়ে ছিলে। কর্তব্যের চাকা অবিরত ঘুরিয়েই গেছ, ঘুরিয়েই গেছ। কে তোমার আবেগের মূল্য দেবে! জগৎ বড় স্বার্থপর। কেউ কারুর নয় হরিশঙ্কর! আঁতে ঘা লাগলে সবাই বেঁকে বসবে, এমনকী সন্তানও! সমালোচনা এক জিনিস, সন্দেহ আর এক জিনিস। বার্ধক্যে যখন স্থবির হয়ে যাবে, চোখের দৃষ্টি কমে যাবে, বুদ্ধিভ্রংশ হবে, তখন কি তুমি অপমানের বোঝা নিয়ে পরাজিত সৈনিকের মতো যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করবে! ধিক হরিশঙ্কর, ধিক তোমাকে! সংসার এক ছোবড়া। যতই নিংড়োও এক ফোঁটাও রস বের করতে পারবে না। বৈরাগ্য হিসেব করে আসে না। মুহূর্তে উদয় হয়, মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। যেন ঝড়ের পাখি। বন্ধ জানলার কাছে এসে সরু ঠোঁটের ঘা মারে। খুলে। দাও, খুলে দাও, নয়তো উড়ে চলে যাবে। ঠাকুরের বলা সেই গল্পটি মনে পড়ছে! একজনের পরিবার বললে, ‘অমুক লোকের ভারী বৈরাগ্য হয়েছে, তোমার কিছু হল না। যার বৈরাগ্য হয়েছে, সে লোকটির ষোলোজন স্ত্রী,–এক একজন করে তাদের ত্যাগ করছে।’
সোয়ামি নাইতে যাচ্ছিল, কাঁধে গামছা, বললে, ‘খেপি! সে লোক ত্যাগ করতে পারবে না,– একটু একটু করে কি ত্যাগ হয়? আমি ত্যাগ করতে পারব। এই দেখ,–আমি চললুম!
সে বাড়ির গোছগাছ না করে–সেই অবস্থায়–কাঁধে গামছা–বাড়ি ত্যাগ করে চলে গেল। এরই নাম তীব্র বৈরাগ্য। যে ত্যাগ করবে তার খুব মনের বল চাই। ডাকাত পড়ার ভাব। অ্যায়!!!– ডাকাতি করার আগে যেমন ডাকাতেরা বলে– মারো! লোটো! কাটো!
তুমি তো বারেবারে এই জীবনেই নতুন করে জন্মাতে চেয়েছ। এই কূপ থেকে আর একবার বেরিয়ে পড়ো। স্লেটের লেখার মতো অতীতকে মুছে দিতে না পারলে, বর্তমানকে ফেলে দিতে না পারলে, ভবিষ্যতের মুখোমুখি হওয়া যায় না। কিছুকাল কিছু মানুষের সঙ্গে প্রারব্ধ ক্ষয় করে গেলে, এবার তবে চলো নতুন জন্ম নিতে।
কালির ফোঁটায় লেখা এইখানেই শেষ হয়েছে। এ কবেকার লেখা! কাল রাতের, না তারও আগের? মনে হয় কাল প্রথমরাতে এইসব লিখেছেন। তারপর জীবনের প্রিয় সঙ্গী এসরাজটিকে কাঁধে নিয়ে বসেছেন। শেষ ছড় টেনে জয়জয়ন্তীর করুণ সুরে রাতকে কাঁদিয়েছেন। আমি আধো-তন্দ্রায় সেই সুর শুনেছি।
ছোট্ট আর একটি নোট খাতা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সেই বিখ্যাত হিসেবের খাতা। পাতায় পাতায় পরম নিষ্ঠায় পাইপয়সা খরচেরও হিসেব লেখা। শেষ পাতায় নতুন একটি সংযোজন। গহনার তালিকা, বিছাহার, সাতনরি হার, বাজু, মানতাসা, টায়রা, রুলি, চুড়ি, ব্রেসলেট, আংটি। পরপর তালিকা নেমে গেছে নীচের দিকে। চল্লিশ ভরির মতো সোনা। গোটাকতক গিনিও আছে। সোনার রিস্টওয়াচ।
খাতার তলা থেকে ব্যাঙ্কের পাসবই উঁকি মারছে। জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে প্রায় সত্তর হাজার টাকা পড়ে আছে। বড় কোম্পানির কিছু শেয়ারও কেনা আছে। বছরে বছরে ডিভিডেন্ড আসতে দেখি। বুকটা হঠাৎ দুধের মতো উথলে উঠল। সব আমার, সব আমার। আমি ধনী, ভিখিরি নই। সব সাজিয়ে রেখে গেছেন আমার জন্যে। আমার সামান্য একটি কথায় একবস্ত্রে গৃহত্যাগ করলেন। কী অসম্ভব মনের তেজ! কী দুর্জয় অভিমান! দিনের পর দিন আমি বসে থাকব এই ভগ্ন অট্টালিকায়। যা দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দশ কাঠা জমির ওপর। যক্ষের মতো আগলাব এইসব সোনাদানা। আর সেই মানুষটি পড়ে থাকবেন অজানা অঞ্চলে। কোনও অরণ্যে, কি পর্বতে, কি কোনও আশ্রমে। শীত আসবে, বসন্ত বিদায় নেবে, বর্ষার আকাশ মাথার ওপর গর্জন করবে। এদিকে ছাতে ফুলগাছের টবে। টবে কুঁড়ির মুখ উঁকি দেবে। একটি-দুটি ফুল ফুটবে। আমি শুধু বসে থাকব সুখী যক্ষের মতো, আমার ভোগ নিয়ে, আমার ন্যাজে-খেলানো স্বভাব নিয়ে, আত্মদর্শন-ইচ্ছার মুখোশ পরানো দেহবাসনা নিয়ে। বিষকুম্ভ পয়োমুখং হয়ে বসে থাকব এই স্মৃতির সৌধে। ভাঙছে যখন ভাল করেই ভাঙুক। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক এই অভিশপ্ত বংশ। যা কিছু আছে সবই দান করে দিই আশ্রমকে। মানুষের চেষ্টায় যা গড়া সম্ভব হল না, গড়ে উঠুক ঈশ্বরের নামে। ওই লেখার পাশে আমিও তো লিখতে পারি, ঠাকুরের কথাতেই লিখতে পারি, বাপ কত বড় বস্তু! বাপ-মাকে ফাঁকি দিয়ে যে ধর্ম করবে তার ছাই হবে! মানুষের অনেকগুলি ঋণ আছে। পিতৃঋণ, দেবঋণ, ঋষিঋণ। এ ছাড়া আবার মাতৃঋণ আছে। সব ঋণ শোধ করে আমি অঋণী হয়ে যেতে চাই।
হরিশঙ্করের পুত্র হরিশঙ্করই হবে। এক প্রান্তে আপনি উঠুন, আর এক প্রান্তে আমি। সময় হলে দেখা হবে দু’জনে, কোনও অরণ্যে, কোনও পর্বতশীর্ষে, কোনও দেবালয়ে। তখন দু’জনেই দুজনকে যাচাই করে নোব। কে কত দুর এগিয়েছে বিচার করবেন সেই তিনি।
