দরজা বন্ধ করতেই জগৎ কাটা পড়ে গেল। ঘোলাটে আলো অন্ধকার। সঁতসেঁতে বাতাস। বিষণ্ণ দরজা জানলা। মরচে-ধরা সোজা সোজা গরাদ। ঝিঁঝি এখনও থেমে থেমে তাল ঠুকছে। উত্তরের বাগানে নিমগাছে বসে কাক ডাকছে খা খা করে। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে আলো-অন্ধকারের দিকে ফিরে তাকালুম। কী ভীষণ শূন্যতা! উধ্বাকাশে প্যারাচুট না খুললে, নিরালম্ব পড়ে যেতে যেতে মনের যেরকম অবস্থা হওয়া উচিত, আমার মনের অবস্থাও ঠিক সেইরকম। পৃথিবীর সঙ্গে নাড়ির যোগ কেটে গেছে। যার পা নেই তার বগল থেকে ক্রাচ কেড়ে নিলে এইরকমই হয়। পাশে দাঁড়াবার মতো কেউ নেই। একেবারে একা। পূর্ণ কুম্ভ থেকে শূন্য কুম্ভ। হঠাৎ মনে হল, সেই অসহায় মহিলাটির হলে কাল কেমন লেগেছিল! কী মন নিয়ে তিনি চলে গেলেন! আমি তো পুরুষ! তাও মনে হচ্ছে মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে।
পিতৃদেব! এ কি লঘু পাপে গুরুদণ্ড হয়ে গেল না! এইভাবে প্রতিশোধ নিলেন? ভয়ে, লজ্জায়, আমি যেন খুনির মতো এই আবছা আলোয়, নোনা বাতাসে সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। বিচারক-জগৎ বাইরে বয়ে চলেছে। কোনওক্রমে খবর একবার বাইরে রটে গেলে আমার ফাঁসি হয়ে যাবে। নিরুদ্দেশ সংবাদটিকে গুম করে দিতে হবে। তারপর সারাভারত আমি ছুঁড়ে ফেলব। কিন্তু! ভয়ে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। যদি আত্মহত্যা করে থাকেন! অসম্ভব! তিনি ভীরু ছিলেন না। জীবনের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার ক্ষমতা রাখেন। এইসময় কেউ যদি আমার পাশে থাকত। এমন কেউ যাকে সব কথা খুলে বলা চলে। যার পরামর্শ নেওয়া চলে। এমনকী মুকুর মতো কেউ থাকলেও এই শূন্যতা সহনীয় হত।
ধীরে ধীরে আবার ওপরে উঠে এলুম। নিজেকে মনে হচ্ছে, ট্রেন দুর্ঘটনার পর, কী বোমা বর্ষণের পর একমাত্র জীবিত মানুষ! প্রতিদিনের অভ্যস্ত জগৎ উলটে পড়ে গেছে। সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর নেই, পদশব্দ নেই, উত্তাপ নেই, চাহিদা নেই। অন্যদিন এতক্ষণে চা বসে যেত। বাথরুমে জল পড়ার শব্দ হত। চটি ঘুরে বেড়াত ফটফট করে। বিশ্বাস হচ্ছে না। এ কোনও রসিকতা নয় তো! কিছু তো একটা বলে যাবেন? কী সাংঘাতিক মানুষ! কত বড় একজন অভিনেতা! কাল রাতে এতটুকু বুঝতে দিলেন না। মনে হল পুরনো সেই মানুষটি ধীরে ধীরে ফিরে আসছেন। বজ্রের মতো কঠোর, আবার কুসুমের মতো কোমল। লাস্ট সাপারের অভিনয় করে গেলেন। নিজে বেঁধে শেষ আহার করে গেলেন আমার সঙ্গে। পরিকল্পনাটা কী, একবারও যদি বুঝতে পারতুম! শেষরাতেই যদি চলে গিয়ে থাকেন, কতদূর আর যেতে পেরেছেন? শহর থেকে বেরোবার তো মাত্র দুটি দরজা, হয় শেয়ালদা, হয় হাওড়া। চাকরিতেও কি ইস্তফা দিলেন! আমার তেমন লোকবল থাকলে এক্ষুনি দিকে দিকে সকলকে ছুটিয়ে দিতুম। পালানোর সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যেত! থানায় গেলে কেমন হয়? সে বড় লজ্জার। চারপাশে টিটি পড়ে যাবে। ধূর্ত প্রতিবেশীর দল সান্ত্বনা জানাবার ছলে এসে জল আরও ঘোলা করে দিয়ে যাবে। কী আমি করতে পারি? এই বাড়ি ফেলে কোথায় আমি দৌড়োই? কায়ার। পেছনে ছায়ার মতো! আমার সব পরিকল্পনা এক ধাক্কায় চুরমার হয়ে গেল।
টেবিলের আলোটা নিবিয়ে দিই। এ বাড়িতে আলো আর জ্বলবে না। মাতামহের ভাষায়, সব ধুস হয়ে গেল। পঙ্কজবাবুর কাছে গেলে কেমন হয়? পাকা মাথা থেকে পাকা পরামর্শ বেরোতে পারে। একদিন অকারণে পিতৃনিন্দা করেছেন। না যাওয়াই ভাল। মানুষটির মনে তিন-চার রকমের অহংকার প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। অর্থের, রূপের, সুন্দরী স্ত্রী কন্যার। স্বপ্নে আছেন, স্বপ্নেই থাকুন। জাগিয়ে লাভ নেই। বরং অক্ষয় কাকাবাবুর কাছে যাওয়া চলে। মাতুলকে খবর দিতে পারা যায়। তবে তিনিও কি কম বিব্রত! বোঝার ওপর শাকের আঁটি চাপিয়ে লাভ কী!
হাতলঅলা মেহগনি কাঠের ভারী চেয়ার টেবিলের দিকে আড় হয়ে আছে। এইমাত্র কেউ যেন ঠেলে উঠে চলে গেছেন। টেবিলঘড়ি প্রবল শব্দে টিকটিক করে চলেছে। উপলখণ্ডের ওপর দিয়ে সময়ের টাটু ঘোড়া যেন দুলকি চালে ছুটছে ভবিতব্যের সওয়ার নিয়ে। যে-চাবি নিয়ে এত লাঠালাঠি সেই চাবির গোছা পড়ে আছে টেবিলে অনাদরে, অবহেলায়। একটি নোটখাতার মাঝামাঝি জায়গায় কলম গোঁজা। কিছু কি লিখছিলেন! পাঁচখণ্ড সদ্গুরু সঙ্গ একপাশে পরপর সাজানো। আর এক পাশে কথামৃত।
খাতাটা খুলতেই চোখে পড়ল কী লিখছিলেন! নিজেকেই লেখা নিজের চিঠি–
হরিশঙ্কর, অনেকদিন হল পৃথিবীতে এসেছ। কেন এসেছ জানো কি? আমার নির্দেশ কি তুমি বোঝো না! সংসার তোমার জন্যে নয়। যতবার তুমি গড়তে চেয়েছ, ততবারই আমি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছি। তোমার জীবনে ভোগ নেই, আছে দুর্ভোগ। আর কতকাল ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবে! তেল পুড়ে আসছে। আলোটা এবার নিজের দিকে তুলে ধরো। অন্ধকারে এসে অন্ধকারে কেন বিদায় নেবে! প্রস্রবণের মুখ চাপা আছে। পুরুষকার দিয়ে সামান্য একটু উসকে দাও। কী সব বাজে অন্তঃসারশূন্য জিনিস নিয়ে মেতে আছ! বিজ্ঞানীর গর্ব তোমার সাজে না। তুমি আইনস্টাইন নও, তুমি রাদারফোর্ড নও। শুল্ক দফতরের সামান্য একজন রাসায়নিক। তোমার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জগৎ একটি কানাকড়িও পাবে না। জীবনসঙ্গিনীকে অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছি। যে কর্তব্যের মুখ চেয়ে এতকাল পুতুল খেলছিলে, তোমার সেই উত্তরপুরুষ আজ তৈরি। জীবনের সুপথ, কুপথ, ঘুরপথ সবই চিনতে শিখেছে। স্নেহের শিকল কেটে এবার পাখিটিকে উড়িয়ে দাও। তার স্বাধীন ইচ্ছে তৈরি হয়েছে। আর তাকে প্রদীপের মতো আগলে রেখো না। এবার তাকে সাবালক হতে দাও। হাবুডুবু না খেলে সাঁতার শেখা যায় না। জেনে রাখো এক জঙ্গলে দুটো বাঘ থাকতে পারে না। তুমি তো বৃদ্ধ বাঘ হে! লোলচর্ম, পলিত কেশ। স্বপ্ন ছিল? অনেক স্বপ্ন! কীসের স্বপ্ন হরিশঙ্কর? জীবনটাই তো দীর্ঘ এক স্বপ্ন! স্বপ্নের আবার স্বপ্ন কী? জীবন তো সময়ের বুদবুদ। কেন পড়োনি, ব্রহ্মই বস্তু, আর সমস্ত মায়া, স্বপ্নবৎ অবস্তু? অহংরূপ একটি লাঠি সচ্চিদানন্দ-সাগরের মাঝখানে পড়ে আছে। অহংলাঠিটা তুলে নিলে এক সচ্চিদানন্দ সমুদ্র। অহংলাঠিটি থাকলে দুটো দেখায়, এ একভাগ জল ও একভাগ জল। ব্রহ্মজ্ঞান হলে সমাধিস্থ হয়। তখন এই অহং পুছে যায়। ভেবে দেখো, এই জাগরণ অবস্থাও কিছু নয় হরিশঙ্কর। সেই গল্পটা মনে পড়ে? এক কাঠুরে স্বপ্ন দেখেছিল। একজন হঠাৎ তার ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়াতে কাঠুরে রেগে আগুন। তুই কেন আমার ঘুম ভাঙালি? আমি রাজা হয়েছিলাম, সাত ছেলের বাপ হয়েছিলাম। ছেলেরা লেখাপড়া, অস্ত্রবিদ্যা সব শিখছিল। আমি সিংহাসনে বসে রাজত্ব করছিলাম। কেন তুই আমার সুখের সংসার ভেঙে দিলি? যে ঘুম ভাঙিয়েছিল সে বললে, ‘ও তো স্বপ্ন, ওতে আর কী হয়েছে!’ কাঠুরে বলল, ‘দুর! তুই বুঝিস না, আমার কাঠুরে হওয়া যেমন সত্য, স্বপনে রাজা হওয়াও তেমনই সত্য। কাঠুরে হওয়া যদি সত্য হয়, তা হলে স্বপনে রাজা হওয়াও সত্য।’ সবই স্বপ্ন, হরিশঙ্কর! কোনওটা দীর্ঘস্থায়ী, কোনওটা ক্ষণস্থায়ী। শঙ্কর তো পড়েছ? অত বড় অদ্বৈতজ্ঞানী আর কি এসেছিলেন? স্বপ্নে স্বপ্ন সত্য, জাগরণে সব মিথ্যা। তোমার অজ্ঞান জগৎকে সত্য, অবিনশ্বর এইরকম একটা ভ্রম তৈরি করে তুলছে। আসলে তা নয়। সত্যদ্রষ্ট ঋষির বাক্যে বিশ্বাস রেখে এগিয়ে চলো। যখন জেগে আছ তখন স্বপ্ন মিথ্যা, যখন স্বপ্নে আছ তখন জাগরণ বৃথা, যখন তুমি গভীর নিদ্রায় তখন স্বপ্নও নেই, জাগরণও নেই। এইবার স্বপ্ন আর জাগরণকে এক করে ফেলো তখন নিদ্রাটাকেই মিথ্যা বলে মনে হবে। কী সুন্দর কথা! একবার অভ্যাস করে দেখো, পারবে, তুমি পারবে। আমি ধীরে ধীরে তোমার মোহ ছেদন করে দিয়েছি।
