তার মানে? এ কথার অর্থ কী! কোথায় তিনি? আমার সমস্ত শরীরে ঝাঁকুনি মেরে কে আমায় জাগাল? আমার কোনও আতঙ্ক! মশারি তুলে তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে পা জড়িয়ে টান লেগে একপাশের ফিতে ছিঁড়ে গেল। মুখ থুবড়ে পড়ে যাইনি এই আমার ভাগ্য!
টেবিলের আলো তখনও জ্বলছে। রাত-জাগা পাণ্ডুর রুগির মতো। বইপত্র সামান্য এলোমেলো। আলো না নিবিয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে যাবার মানুষ তো তিনি নন। তাঁর জগৎ তো কারণ-জগৎ। কার্য ছাড়া কারণ, কারণ ছাড়া কার্য হয় না। অকারণে আলো জ্বলুক, এ তো তিনি চাইবেন না। বিছানায় শুয়েছিলেন বলে মনে হয় না। চাদর টানটান। মশারি ফেলে চারপাশ গুঁজে রেখেছিলেন, সেইভাবেই গোঁজা রয়েছে, টেনে খোলার চিহ্ন নেই। মাতামহ যে-ঘরে জীবনের শেষ ক’টা দিন কাটিয়ে গেলেন, সে ঘরের দরজা খুললেই, সুন্দর অপার্থিব একটা গন্ধ নাকে এসে লাগে। এ ঘরেও তিনি নেই। বিছানার ওপর একটি ফুল পড়ে আছে। চাঁদরের মাঝখানে। রান্নাঘর শূন্য। বিভিন্ন খাদ্যবস্তুর চাপা গন্ধে গুমোট হয়ে আছে। শুকনো, খসখসে, স্নেহহীন মেঝে। কোনও কোনও জায়গা চাটনি কিংবা টক পড়ে সাদা সাদা হয়ে গেছে। এই ঘরে কনক বেঁধে গেছে, এখন সে কার ঘরনি। কাকিমা তাঁর নতুন গন্তব্যস্থলে এতক্ষণে মনে হয় পৌঁছে গেছেন। বাথরুমের দরজা বন্ধ। দরজা খুলতেই ভস করে একটা বন্দি হাওয়া বেরিয়ে চলে গেল। ঘষা কাঁচ লাগানো পুবের জানলায়। রোদ এসে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।
দোতলার সব দেখা হয় গেল। কোথাও তিনি নেই। অথচ মনে হচ্ছে আছেন। ধূপের গন্ধের মতো। এইমাত্র জ্বলছিল। জ্বলতে জ্বলতে নিবে গেছে। শেষ ধোঁয়া এখনও যেন বাতাসে সরু সুতোর মতো পাক খাচ্ছে। ছাদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে আর একবার ভাবার চেষ্টা করলুম, কী হতে চলেছে? কী মানে ওই লাইনটির? ইংরেজিরই বাংলা তর্জমা, স্ট্রাইক হোয়াইল দি আয়রন ইজ হট। কোন লোহা? কে লোহা? মশারি তুলে বালিশের পাশে একটি কার্ড ফেলে রেখে তিনি গেলেন। কোথায়! এ আবার কী ধরনের রসিকতা! ভোরবেলা বাজার? জীবনে যাননি। মর্নিং ওয়াক! ওসব শৌখিন ব্যাপারে আদৌ অভ্যস্ত নন।
খোলা ছাদ চারপাশে দৌড়োদৌড়ি করছে। ঝলমলে পৃথিবী সকালের বাতাসে দু’বাহু তুলে যেন নাচছে। আলোয় আলোকিত। সেই পায়রার ঝক উড়ছে পুব আকাশে ঘুরে ঘুরে। একটা-দুটো পাখি খুব নিচু দিয়ে ফুড়ত করে উড়ে গিয়ে এ গাছ থেকে ও গাছে গিয়ে বসছে। দিন এল বলে প্রকৃতিতে যেন শোরগোল পড়ে গেছে। আশা ছিল, হয়তো পিতৃদেবকে দেখব পরিচিত ভঙ্গিতে। সার সার ফুলগাছের টবের সামনে উবু হয়ে বসে আছেন। শীত আসছে। ফুল আসবে। ছাদ ফাঁকা। প্রতিবেশীরা জেগে উঠেছেন। কলরব কানে আসছে। জলের বালতি জোরে বসাবার ধাতব শব্দ। এক মহিলা রোদের আলসেতে হলদে শাড়ি মেলছেন পরিপাটি করে। মাটি খোঁড়ার যন্ত্রটি একপাশে পড়ে আছে। কালো পিঁপড়ের দল ভীষণ ব্যস্ত। মিছিল করে এগিয়ে চলেছে টবের পাশ দিয়ে দিয়ে। গাছের পাতা থেকে কাণ্ড থেকে এক ধরনের তিক্ত গন্ধ বেরোচ্ছে। বড় পরিচিত। গন্ধে যেন কীসের খবর ভাসছে। পুজো প্রায় এসে গেল। শিশিরের কাল আসছে। মাটির গভীরে, কোন অদৃশ্য লোকে কুঁড়ি জাগছে, এইবার তার মুখটি উঁকি দেবে পাতার ফাঁকে। পাশের নিমগাছ থেকে চকচকে দুটি কাঠবেড়ালি নেমে এসেছে। আলসে বেয়ে ন্যাজ তুলে ছুটছে।
শূন্যতার আঘাত এই প্রথম উপলব্ধি করলুম। কিছু না-থাকা যে কত বড় শাস্তি! পাখিদের কি এরকম মনে হয়! আতঙ্ক হয়! ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল! মৃত্যু সুস্পষ্ট একটা আঘাত। তবু সহ্য করা যায়। প্রাণ না থাকলেও সামনে একটা দেহ পড়ে থাকে। মৃত্যুর সঙ্গে জীবনের অনেকদিনের বোঝাঁপড়া। মনের একটা প্রস্তুতি আছে। কিন্তু শূন্যতা! রহস্যময় অনুপস্থিতি! বুকটা ধক করে ওঠে। ভীষণ আচমকা একটা আঘাত। সামলাতে কষ্ট হয়।
উদ্বেগ চেপে আবার নীচে নেমে এলুম। অসম্ভব রাগে শরীর জ্বলছে। পৃথিবীটা ক্রমশই যেন নাটুকে হয়ে উঠছে। একজন প্রৌঢ় মানুষ হঠাৎ এমন নাটকীয় হয়ে উঠলেন কেন? পুত্রের সঙ্গে মজা করছেন! অন্ধকার একতলায় চুঁইয়ে চুঁইয়ে দিনের আলো ঢুকেছে। অন্ধকারের স্তরে কোথাও এখনও একটা ঝিঁঝি ডাকছে থেমে থেমে। রাত যে ভোর হল, সে খবর এখনও পায়নি। কাকিমা যে-ঘরে রাঁধতেন, সেই ঘরে খুটুস খাটুস করে এক ধরনের শব্দ হচ্ছে। ইঁদুররা ফিরে এসেছে আবার। ঝিঁঝি থামলেই চারপাশ থেকে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা ফিরে আসছে। চিড়-খাওয়া সদর দুয়ার বাতাসে কাঁপছে। একপাশে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে খিল। আর কোনও সন্দেহ নেই। যতই খুঁজি না কেন, এ গৃহে তিনি নেই। দরজার বাইরে রাজপথ। এক বাহু পশ্চিমে চলে গেছে গঙ্গায়, আর এক বাহু পুবে, প্রসারিত অনির্দেশ যাত্রায়। আমি এখন কী করি!
১.৭৩ দুয়ার খুলে থাকি বসে
ধীরে, খুব ধীরে, ভয়ে ভয়ে সদর দরজার একটা পাল্লা সামান্য একটু ফাঁক করতেই বাইরের জগৎ যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ল। একঝলক পরিষ্কার বাতাস, শুভ্র রুপোলি আলো, শব্দের গমক ছুটে এল। কিছুই হয়নি যেন! উদাসীন বহির্বিশ্ব যেমন চলছিল ঠিক তেমনি চলছে। সাইকেলের হাতলে পাটপাট কাগজ ভঁই করে খবরের কাগজঅলা ছুটছে পুব থেকে পশ্চিমে। গয়লা চলেছে দুধের বালতি নিয়ে। খড়ের নুটি তালে তালে নাচছে। এপাশ থেকে ওপাশ, যত দূর দৃষ্টি যায় একবার তাকিয়ে দেখলুম। অজগরের মতো পথ চলে গেছে এঁকেবেঁকে। ভেঙে পড়া ঝাড়লণ্ঠনের মতো টুকরো টুকরো মানুষ এলোমেলো ছড়িয়ে আছে। রাতের মুঠো আলগা হয়ে দিনের পৃথিবী খুলে পড়েছে। পাউরুটির সাইকেল ভ্যান বিকট শব্দে চমকাতে চমকাতে চলেছে। হাফপ্যান্ট পরা চালক সিটের ডাইনে বাঁয়ে উঁচু-নিচু হয়ে প্যাডেল ঠেলছে।
