কেন? অশান্তির কারণ তো সব চলে গেছে। এখন আমরাই তো একচ্ছত্র নৃপতি।
বড় ফাঁকা হয়ে গেল না!
সেইটাই তো আমাদের পরিবেশ!
সইয়ে নিতে কয়েকদিন সময় যাবে।
তা ঠিক! আমরা বড় জড়িয়ে পড়েছিলুম। ধীরে ধীরে নিজেদের হারিয়ে ফেলছিলুম। একেই বলে মন না মতিভ্রম। তুমি ঠিকই বলেছ, সংসার আমাদের ধাতে সইবে না। আমরা বেশ পুরোমাত্রায় একলফেঁড়ে হয়ে উঠেছি। আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর। হয় এইভাবেই আমাদের কাটাতে হবে, না হয় সন্ন্যাসীর ভেক ধরতে হবে।
ভেক বলছেন কেন?
না, রেগে যেয়ো না। তোমার কথা আমি বলিনি। আমি আমার কথা বলছি।
আপনি বিকেলেও আমাকে প্রায় একই কথা বলেছেন। অনেকটা চ্যালেঞ্জের মতো। আমার দ্বারা ভাল কিছুই কি করা সম্ভব নয়।
শোনো শোনো, ভাল কিছু এক জিনিস, আর স্বভাববিরুদ্ধ আর এক জিনিস। তোমাকে আমি যতটা চিনি, তুমি নিজেই হয়তো নিজেকে ততটা চেনো না! ছেলেবেলা থেকে শিবরাত্রির সলতের মতো তোমাকে আগলে আগলে মানুষ করা হয়েছে অনেকটা তুলোয় রাখা আঙুরের মতো করে। প্রকৃতি থেকে তুমি বিচ্ছিন্ন। ঝড় উঠলে ভয় পাও, বিদ্যুৎ চমকালে বালিশে মুখ গোঁজো। সামান্য। আরশোলা দেখলে নৃত্য করো। তুমি কেমন করে সব ছেড়ে সন্ন্যাসী হবে! মহাপুরুষদের জীবনী পড়ে দেখো, তারা কেউ আদুরে ছিলেন না। ওই তো বইয়ের র্যাকে গোপীনাথ কবিরাজজির লেখা। বিশুদ্ধানন্দ পরমহংসজির জীবনী রয়েছে, পড়ে দেখো। গেরুয়ায় সন্ন্যাস নেই, সন্ন্যাস আছে মনে।
কে যে কখন কী করে ফেলতে পারে, তা কি আগে থেকে বলা যায়!
পিন্টু, সে হল হঠকারিতা। হঠাৎ খুন করা যায়, আত্মহত্যা করা যায়, হাততালির লোভে ছোটখাটো বীরত্ব দেখানো যায়, নামের লোভে দাতা হওয়া যায়, সন্ন্যাসী হওয়া যায় না। আবার বলি পূর্বজন্মের অসীম সুকৃতি ছাড়া সন্ন্যাসী হওয়া অসম্ভব। তর্ক করে লাভ নেই, তিক্ততা বাড়বে। তৈরি হয়ে নাও, ঠান্ডা হয়ে যাবার আগেই খেতে বসতে হবে।
নীরবে আহারপর্ব শেষ হল। আজ আর পরিবেশনের ঘটা নেই। নানারকম পদ নেই। বেগুনভাজা আর খিচুড়ি। চোখে পড়ছে মাতামহের খড়মজোড়া। একটি জলচৌকির ওপর সযত্নে রক্ষিত। বারান্দার তারে ঝুলছে কাকিমার শাড়ি। সারাবাড়ি স্মৃতিতে স্মৃতিতে ছেয়ে আছে। স্মৃতিই বেদনার উৎস।
রান্না অতি উপাদেয় হয়েছিল। এমন মানুষ যে-কোনও মহিলাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন। সূক্ষ্ম সেলাই, রিপু, ফ্যান গালা, বাটনা বাটা, কুটনো কোটা, সবই জানেন। এমন জানেন যার কোনও তুলনা হয় না। মাতামহ থাকলে এতক্ষণ প্রশংসায় প্রশংসায় বাড়ি মাত করে দিতেন। সব ফাঁকা। সব ধুস হয়ে গেছে। কয়েকটি ব্যবহৃত জিনিস মাত্র পড়ে আছে। পাটকরা একটি গামছা। কীটদষ্ট একটি বই। সিন্দুকে কী আছে খুলে দেখা হয়নি। আমি নিজে কোনওদিন খুলবও না। খুলতে হলে মাতুলের সামনেই খুলব।
পিতৃদেব বললেন, সারাদিন খুব খাটাখাটুনি করেছ, এইবার শুয়ে পড়ো। আমি আমার পুরনো অভ্যাসটা আবার ফিরিয়ে আনি। একা একা রাত জাগা। কত কী পড়ার রয়েছে! জমে জমে পাহাড় তৈরি হয়েছে।
টেবিলে আলোর সামনে গিয়ে বসলেন। একদিকে থাক থাক বই, আর একদিকে ছোট বড়। নোটখাতা। মাঝে একফালি কাঁচে-ঢাকা জায়গা। আজ আর আমার লেখাপড়ার মেজাজ নেই। শুয়ে শুয়ে চোখের সামনে দেখছি অনন্ত আকাশ। তারার ফুল ছড়িয়ে আছে। সামনে পড়ে আছে জীবনের অনন্ত পথ। কনকের কথা মনে পড়ছে। সে ঠিকই করেছে। আমার দুর্বলতাকে আদৌ পাত্তা দেয়নি। দিলে বিপদেই পড়ত। যে নিজে চলতে পারে না, সে অপরকে চালাবে কী করে! মুকু মনে বড় টোল ধরিয়েছে। কী সব ঘটছে জীবনে? আগামীকাল আমি অফিসফেরতা স্বামী নির্মলানন্দের কাছে যাব। য পলায়তি স জীবতি। আর এখানে নয়। ওই কাকিমা অবশ্যই আবার ফিরে আসবেন। পিতার এই নিঃসঙ্গতা অবশ্যই ঘুচে যাবে। সংসার কারুর জন্য বসে থাকে না। সব যেমন চলার তেমনি চলে। মায়ের অভাবে পিতার জীবন তো কই অচল হয়নি! আমার অভাব, অভাব বলেই মনে হবে না। কর্মী মানুষ, কাজে কাজেই ঠিক চালিয়ে দেবেন। কিন্তু আমি কীভাবে ছেড়ে থাকব! যেখানেই যাই। মন যে আমার কাদবে। মুকুর কথার কোনও মাথামুন্ডু নেই। মুকু আমার মা হবে, সৎ মা! সত্যিই যদি হয়, আমার আর কোনও পিছুটান থাকে না। অপরিসীম ঘৃণায় বৈরাগ্যের পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। তা কি আর হবে? ঘটনা আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে পথে নামাবে না। আমাকেই নামতে হবে। ধাক্কা মেরে।
চোখ কখন বুজে এসেছিল জানি না। গভীর রাতে এসরাজের সুর শুনেছিলাম মনে হয়। জয়জয়ন্তী বেজেছে কেঁদে কেঁদে। মুখে যা প্রকাশিত হয়নি, হয়েছে সুরে সুরে। ধড়মড় করে বিছানায় যখন উঠে বসলুম, তখন যথেষ্ট বেলা হয়েছে। এভাবে কোনওদিন তো ঘুম ভাঙে না। কে। যেন ঠেলা মেরে উঠিয়ে দিল। অনেকটা হাত ধরে ঠেলে তুলে দেবার মতো করে। আলোয় চোখ ক্রমশ সয়ে এল। বাইরে কাকের কর্কশ চিৎকার। বালিশের পাশে পোস্টকার্ডের মতো ছোট্ট একটা কী পড়ে আছে। প্রথমে ভেবেছিলুম, জানলা দিয়ে আসা রোদের টুকরো। না, তা তো নয়! মুক্তোর মতো কয়েকটি অক্ষর ভাসছে। তুলে চোখের সামনে ধরলুম। সাতসকালে চিঠি ডেলিভারি হল বিছানায় বালিশের পাশে। কে সেই পিয়ন।
একটি মাত্র লাইন, লোহা গরম থাকতে থাকতেই হাতুড়ি মারা উচিত। হরিশঙ্কর।
