বাড়ির সদরে যখন এসে পৌঁছেলুম তখন প্রায় রাত দশটা। সদর হাট খোলা। এমন তো বড় একটা হয় না। পিতৃদেব তো এত উদাসীন নন। কী জানি, কী ব্যাপার! ওপরে একটি মাত্র আলো জ্বলছে। আলোর আভা অসুস্থ বৃদ্ধার মতো ঘষটে ঘষটে সিঁড়ি বেয়ে কিছু দূর নেমে এসে এলিয়ে পড়েছে। সিঁড়ির শেষ ধাপে এটা আবার কী! বলাইবাবু! খোলের বাইরে মুখটি বের করে একপাশে চুপ করে বসে আছে।
বলাইবাবু, তুমি তো কোনওদিন নীচে নামো না, আজ হঠাৎ নেমে এলে?
বলাইবাবুর মুখটি নড়ে উঠল। কচ্ছপও পোষ মানে। পোষ মানে না মানুষ। কাকিমা চলে গেছেন। ছোট্ট এই প্রাণীটি খুঁজতে খুঁজতে টাল খেতে খেতে নীচে নেমে এসেছে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে বসে আছে সেই পরিচিত পদশব্দের অপেক্ষায়। কাকিমা বলাইবাবুকে রোজ একবার করে পালিশ করতেন। খোলটি বহু বর্ণে চিত্রিত হয়ে উঠেছে।
চলো, ওপরে চলো। বলাইবাবু, আমরা তো আছি! এক যায়, আর এক থাকে। মানুষের মতো ভুলতে শেখো। এই দেখো, একে একে আমার তো সবাই চলে গেছেন। যান না, আমি ধীরে ধীরে সব ভুলে যাব। একে একে নতুন চরিত্র এসে আমার চারপাশে ঘিরে বসবে। মাইফেল চলবে দিনের পর দিন। তারপর আবার একদিন সব ভোজবাজি! শুন্য কার্পেট, ছেঁড়া ফুলের মালা, ঘুঙুরের দানা, বাতি ম্রিয়মাণ, ভোরের পানসে আলো, ঘুলঘুলিতে তন্দ্রাতুর পায়রার ডানার ঝটপটি, মৃতের নিশ্বাসের মতো ফিকে বাতাস। ছিল সব, নেই কিছু। নদীর এক পাড় ভাঙে, আর এক পাড় গড়ে। চলো। বলাইবাবু, ওপরে চলো। তুমি আমার কোলে উঠে চলো। বর্ষার দুপুরের স্মৃতি। মাতামহ একেই বলতেন– সব ধুস।
১.৭২ যে কথা ফোটে না গানে
সিঁড়ির ধাপে পা রাখতেই এসরাজের সুর উঠল। বাগেশ্রীর ধরতাই। বড় সুন্দর ধরেছেন, যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে। সুরের টানে শূন্য বাড়ি যেন কেঁদে উঠছে। আরও দু’ধাপ উঠতেই নাকে একটা সুন্দর গন্ধ এসে ঢুকল। এমন একটা কিছু রান্না চেপেছে, যাতে ঘি আছে, গরমমশলা আছে। বুকের কাছে বলাইবাবু খোলে ঢুকে পড়েছে।
সেই হলঘর। একটি মাত্র আলো জ্বলছে। যে-ঘর একসময় গাইয়ে, বাজিয়ে আর শ্রোতায় ভরে থাকত সেই ঘরে একপাশে ছোট্ট একটি জাজিম পেতে পিতৃদেব এসরাজ নিয়ে বসেছেন। দক্ষিণের জানলা দিয়ে বাতাস ঢুকছে। দেয়ালে ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ছে। মেঝেতে বলাইবাবুকে রাখতেই গুটিগুটি এগিয়ে চলল পাতা জাজিমের দিকে। বেশ সংগীতরসিক হয়ে উঠেছে।
বাজাতে বাজাতে চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, সব হল?
বুকটা কেমন যেন হুঁত করে উঠল। সব হল, মানে? যা হল, সে হওয়া তো ওঁর আশঙ্কাকেই। সমর্থন করে। ভেতরে ভেতরে হয়তো এমন শক্তি অর্জন করে বসে আছেন, যাকে বলা চলে থার্ড আই। গাড়ির পেছনের আসনের মাথার ওপর দুটি অদৃশ্য চোখ। ভাবতেই ভেতরটা আবার কেঁপে উঠল।
কাঁপাকাঁপা গলায় বললুম, আজ্ঞে হ্যাঁ।
বেশ।
বেশ, বলে মাথা নাড়লেন। এসরাজ বাজতে লাগল, সব যে হয়ে গেল কালো।
সামনে গিয়ে বসার সাহস হল না। নিজেকে বড় অশুচি মনে হচ্ছে। যেন নিজেকে সৎকার করে শ্মশান থেকে ফিরে এলুম। রান্নাঘরই ভাল। নির্জনে উনুনের ওপর ছোট্ট একটি হাঁড়িতে খিচুড়ি ফুটছে। বড় মধুর সুবাস। বহুদিন পরে পিতৃদেব আবার রন্ধনের হাত খুলেছেন। আহা! মাতামহ নেই। সমঝদার চলে গেছেন। খিচুড়ি বড় প্রিয় বস্তু ছিল। প্রিয় ছিল মোহনভোগ। আর ছিল তেলেভাজা। রান্নাঘরের চারপাশে তাকিয়ে কাকিমার অনুপস্থিতি প্রথম অনুভব করলুম। বিশাল এই জগতে নিঃসঙ্গ এক মহিলা ক্রমশই দূর থেকে দুরে অনিশ্চিত এক পরিবেশের দিকে এগিয়ে চলেছেন। আবার নতুন করে সকলের মন জয় করতে হবে। নিজের সংসার আর পরের সংসারে অনেক তফাত। এই যাওয়ার ব্যাপারে আমার কথা বলা অনুচিত হয়েছে। কেন আমি সব তছনছ করে দিলুম? বলা যায় না, ওই নারীপাগল মামাশ্বশুর হয়তো খুঁজে খুঁজে ওইখানেই গিয়ে হাজির হবেন। পাশে দাঁড়াবার মতো আমাদেরও আর কেউ রইলেন না। মাতামহ তার রাজসিকতা নিয়ে আর এগিয়ে আসবেন না। মাতুল প্রবাসী। প্রতিবেশীরা ঈর্ষাপরায়ণ।
এসরাজ থেমে গেল। পিতা উঠে এলেন।
কী, খুব খিদে পেয়েছে?
আজ্ঞে না।
বিকেলে কিছু খেয়েছিলে?
একেবারে সরাসরি দুম করে মিথ্যেই বললুম, আজ্ঞে না।
তা হলে তো খিদে পাওয়া উচিত। এই তো তোমার খাবার বয়েস। আজ আর বেশি হ্যাঁঙ্গাম করলুম না, বুঝলে? লাগিয়ে দিলুম ডালেচালে। অনেকদিন রাঁধিনি, জানি না কী বস্তু দাঁড়াল!
দারুণ গন্ধ বেরিয়েছে।
গন্ধ কিন্তু ভাল রান্নার পরিচয় নয়। ঘি আর গরমমশলা, অনেকটা কীরকম জানো, ধাপ্পামারা মানুষের মতো। মুখে না দিলে বোঝা যাবে না। টেস্ট অফ দি পুডিং ইজ ইন দি ইটিং।
খিচুড়ির হাঁড়িতে পিতৃদেব হাতা চালাতে লাগলেন। তলা ধরে গেলে সব বরবাদ হয়ে যাবে। দেয়ালে ছায়া নাচছে। হাতাটা হাঁড়ির মুখে শুইয়ে রেখে পিতা বললেন, বাড়ি একেবারে পরিষ্কার, কী বলে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কোথা থেকে উড়ো সব ঝামেলা এসে তালগোল পাকিয়ে দিয়ে চলে গেল। একেই বলে গ্রহ। আবার সেই পুনর্মুষিক ভব। পিতা আর পুত্র। তুমি এখন সুখী তো?
সুখী?
প্রশ্নকে প্রশ্ন দিয়ে ঠেকালুম। সুখী কি না, অত সহজে বলা চলে। দুঃখের অভাব যদি সুখ হয়, তা হলে সুখী! এইবার মনে হয় একটি সত্য কথা বলছি, আজ্ঞে সুখী কি না বলতে পারব না।
