মুকু বললে, আমি আর কিছুতেই বাবার সংসারে ফিরে যাব না পলাশ। তুমি তোমার বাবাকে বলো।
মুকু, তিনি তোমার গুরুজন।
গুরুজন? তুমি জানো, তিনি কী ধরনের নোংরা! তুমি ছেলেমানুষ, সেসব কথা তোমাকে বলা যাবে না। শুধু এইটুকু জেনে রাখো, তিনি আমাকে আর পিতার চোখে দেখেন না।
তুমি যা বলছ, সেকথা আমি কেমন করে বাবাকে বলব! আমারও তো লজ্জাশরম আছে!
তুমি না পারো, আমি বলব। এতে তো অন্যায়ের কিছু নেই! আমরা তো পাপ করতে ছুটছি না! তুমি শুধু অনুমতি দাও।
আজ আর ভাবতে পারছি না, আমাকে দু-একদিন সময় দাও। এত তাড়া কীসের?
তোমাকে আমি চিনি, তোমার সময় বড় দ্রুত চলে। তোমাকে এখুনি ধরতে না পারলে পিছলে যাবে।
আমি একটু ভাবি।
তোমার কি মনে হয় আমি খারাপ মেয়ে, তোমার অযোগ্য?
এ প্রশ্ন তো আমারও হতে পারে?
এর উত্তরে তোমাকে আমি একশোর মধ্যে একশো দিয়ে দিলুম।
লক্ষ্মীটি তুমি এবার সোজা হয়ে বোসো।
মুকু সোজা হয়ে উঠে বসল। খোঁপা ভেঙে পড়েছে। শাড়ির আঁচল অনেক আগেই খসে পড়েছে। নারী আর মৃত্তিকা প্রায় একই জাতের জিনিস। গাড়ি বিবেকানন্দ রোডে প্রবেশ করল। মোড়ের মাথায় একটি অলংকারের দোকান। আধপাল্লা তখনও খোলা। সোনার অলংকার পেছনের আয়না থেকে চোরা চাহনিতে তাকিয়ে আছে।
হস্টেলের প্রবেশ পথের দুপাশে দুটি সাবুগাছ প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে। গভীর বারান্দায় ফানুসের মতো আলো ঝুলছে। বাড়িটির চেহারায় সাবেক কালের গাম্ভীর্য। এক ধরনের বিষণ্ণতা লেগে আছে। গাড়ি ভাড়া বুঝে নিয়ে সোজা চলে গেল। মুকু আমার সামনে নায়িকার মতো দাঁড়িয়ে। তার দিকে তাকিয়ে মন ভবিষ্যতের ছবি আঁকছে। স্ত্রী নয়, তবু মনে হচ্ছে আমার স্ত্রী। সুন্দরী স্ত্রী যে-কোনও মানুষের গর্ব।
ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলুম, ঢুকতে দেবে তো?
হ্যাঁ দেবে।
আমি তা হলে চলি।
রোজ তোমার সঙ্গে দেখা হবে তো?
রোজ কী করে হবে?
তা না হলে আমি মরে যাব।
কীভাবে হবে?
তুমি আসবে। এসে আমার খোঁজ করবে।
দেখি।
কোনও কথাই কি তুমি স্পষ্ট করে বলতে পারো না?
তোমার কাছে আজ যা স্পষ্ট কালই যে অস্পষ্ট হয়ে যাবে না, কে বলতে পারে?
তুমি না পারো, আমি পারি। মেয়েদের কামড় কচ্ছপের কামড়ের মতো।
দুটো সাবু গাছের মাঝখান দিয়ে মুকু ধীরে ধীরে ভেতরে চলে গেল। কোথাও কেউ একজন ভীষণ জোরে জোরে কাশছে। মনে হচ্ছে এখুনি দম আটকে যাবে। সাবু গাছের পাতায় পাতায় রাতের বাতাস শাড়ির আঁচলের মতো খসখস করছে। প্রায়-জনশুন্য পথে দু’কদম হাঁটার পরেই মনে হল, আমি বড় নিঃসঙ্গ। বাড়ি ফিরে যেতেও মন চাইছে না। পিতৃদেবের একটি কথা মনে বড় লেগেছে। মুকু তো তোমার কাছে এসেছে। তার মানে? কাকিমা সম্পর্কে সমালোচনার প্রতিশোধ তিনি কি এইভাবেই নিলেন? অতটা নীচে নেমে আসার মানুষ তো তিনি নন। ওঁর যত তর্জনগর্জন সবই তো ইন্টেলেকচুয়াল লেভেলে। কী জানি? মানুষের দুর্গম অঞ্চলের কোথায় কী যে ঘাপটি মেরে বসে আছে! পৃথিবীতে এমন কোনও লিভিংস্টোন নেই যে আবিষ্কার করেন! তৃপ্তি, অতৃপ্তি, সুখ, দুঃখ, দড়ির মতো পাকে পাকে এমন জড়িয়ে আছে, এককভাবে কোনওটাই পাওয়া সম্ভব নয়। একটু আগে বেশ লাগছিল। মনে হচ্ছিল, আমি একটা মহাদেশ জয় করে ফেলেছি। এখন মনে হচ্ছে নেপোলিয়ানের মতো সেন্ট হেলেনায় চলেছি নির্বাসনে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমি পুরোপুরি মুকুর ক্লাচে চলে গেছি। মন, সংস্কার সবকিছুই তখন নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। যতটা উচ্চে উঠেছিলুম তার চেয়ে ঢের নীচে নেমে গেছি। আবার আমি পরাজিত। পিতার তিক্ত কথাই সত্য হল। সন্ন্যাস আমার রক্তে নেই, সংস্কারে নেই। একবিন্দু রক্ত অণুবীক্ষণের তলায় ফেললে হয়তো চমকে উঠব। অক্টোপাসের মতো অসংখ্য প্রাণী লোভ লালসার শুড় নেড়ে নেড়ে ভোগের বস্তু খুঁজছে। কোথায় আমার সেই নির্বেদ! আজ যদি আমার কোথাও যাবার জায়গা থাকত! কিংবা, কোথায় চলে যেতে পারতুম চিরকালের জন্যে! এই নির্বান্ধব রাতের পৃথিবীতে সেই গৃহটি ছাড়া আমার আর কোনও আশ্রয় নেই। বেড়ালের মতো ঘুরে ঘুরে সেই একই জায়গায় ফিরে যেতে হবে ন্যাজ তুলে।
হেঁটেই চলেছি, হেঁটেই চলেছি। কোথায় যে যেতে চাই! যে-দিকেই যাই না কেন, বাড়ির দিকেই চলেছি। একেই বলে হোমিং ইনস্টিংক্ট। সানাইয়ের সুর ভেসে আসছে। শরবতের দোকানে রাতের লাইন পড়েছে। বরফের চাংড়ায় থলে জড়িয়ে কাঠের মুগুর পেটাচ্ছে। সুখস্বপ্ন ভেঙে যাবার মতো ঝুরঝুর শব্দ হচ্ছে। পাশ দিয়ে যাবার সময় বরফের বাতাস এসে গায়ে লাগল। ভিজেভিজে কাঠের গুঁড়ি ছড়িয়ে আছে চারপাশে।
সানাইয়ের উৎসস্থলে এসে পড়েছি। বেহাগের সুরে বিয়েবাড়ি জমে উঠেছে। সারাবাড়ির দেয়ালে লাল নীল টুনির মালা ঝুলছে। কাপড়-মোড়া টুঙির মাথায় বসে, মিহি পাঞ্জাবি পরে ওস্তাদজি সুর ছাড়ছেন। চারপাশে আলো আর ফুলের মালার ঘেরাটোপ। ছাদের ওপর বিশাল ম্যারাপ, আলোর চাঁদোয়া তুলেছে। তেরপলে মানুষের ছায়া নাচছে। হইহই উপচে পড়ছে, ফ্রাই, ফ্রাই। সামনের রাস্তাটা ভিজেভিজে। পেন্টকরা মুখ নিয়ে দু-তিনজন যুবক সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে গল্প করছে। সবচেয়ে লম্বা চওড়া স্বাস্থ্যবান যুবকটিই মনে হয় আজকের রাতের নায়ক। সিল্কের পাঞ্জাবি, কোঁচানো ধুতি, পায়ে নিউকাট। তিন-চার রকম গন্ধ, একসঙ্গে মিলেমিশে বিয়েবাড়ির গন্ধ তৈরি করেছে। রজনীগন্ধা, সেন্ট, লুচিভাজা, মাছ, জল, কলাপাতা, সব মিলিয়ে স্বপ্নগন্ধী এক রাত। পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চললুম। ফেলে দেওয়া পাতা আর গেলাসের গাদায় গুন্ডা চেহারার কুকুরের খেয়োখেয়ি লেগেছে। আরও দূরে খাঁটিয়ায় চিতপাত হয়ে পড়ে আছে ভুড়ি-খোলা এক দৈত্য।
