নিজেকে তৈরি করছি।
থাক আর তৈরি করতে হবে না। তৈরি হয়েই আছ।
কথাটার মধ্যে অশ্লীল একটা ইঙ্গিত আছে।
শব্দটা তুমিই প্রথম বলেছ।
আমার মানেটা ছিল অন্যরকম, তোমার মানেটা একটু যেন কেমন কেমন!
তোমার আজ কী হয়েছে বলো তো?
ভূতে ধরেছে।
সে ভূত কি আমি?
তুমি ভূত হতে যাবে কেন? তুমি ভগবান।
পাঞ্জাবি ড্রাইভার ট্যাক্সির পেছনের দরজা খুলে দিল। মুকু আগে ঢুকল, পরে আমি। আমার আসনে তার আঁচল বিছিয়ে আছে। কী যে হয়েছে কে জানে! কোনও দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। মেয়েদের ব্যাপার আমি কিছুই বুঝি না। শুনেছি, এই বয়েসটা খুব খারাপ। ফাঁদে পড়ার বয়স, ফঁদে ফেলার বয়েস। জয় গুরু! তুমি আমায় রক্ষা করো। এতকালের শক্ত মন থ্যাসথেসে হয়ে আসছে।
চালক মিটার-ফ্ল্যাগ নামালেন। রিনরিন করে শব্দ হল। আমাদের অন্ধকার কেঁপে উঠল। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। হাওড়ার ব্রিজে উঠছে। গঙ্গার বাতাস যেন আরও উতলা। সারি সারি আলোের মালা মাথার ওপর দিয়ে সামনে চলে গেছে। গঙ্গার দু’কূলে আলোর খই ছড়িয়ে আছে।
মুকু ডান দিকে, আমি বাঁ দিকে সম্মানজনক দূরত্বে। মাঝে ফুলের মতো ছড়িয়ে আছে শাড়ির আঁচল। আলোর ঢেউ খেলে যাচ্ছে। সামনে পাথরের মতো মুখ করে গাড়ি চালাচ্ছেন পাঞ্জাবি ভদ্রলোক। গঙ্গাবক্ষে আলোকিত একটি স্টিমার সাগরের দিকে চলেছে।
কঁহা যাইয়েগা জি?
কোথায় যেতে হবে মুকু?
বিবেকানন্দ রোড।
গাড়ির গতি বাড়ছে। সর্দারজি পোল থেকে নেমে ডান দিকে স্ক্র্যান্ড রোড ধরলেন। আমাদের বাঁ পাশে টাঁকশালের বিরাট বাড়ি। মুকু হঠাৎ বাঁ দিকে হেলে আমার কাঁধে মাথা রাখল।
মনে মনে বললুম, ঈশ্বর তুমি দেখো, আমি কিন্তু কিছুই করিনি। জলজ্যান্ত একটি যুবতী মেয়ে আমাকে একা পেয়ে কীভাবে প্রলুব্ধ করছে! আমিও তো মানুষ! দেবতাও নই, বৃদ্ধও নই।
মুকু আমার ডান হাতটা দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে বললে, পলাশ, বি সিরিয়াস।
তার মানে?
মুকুর মুখে আলো পড়েছে। উলটো দিক থেকে আসা গাড়ির হেডলাইট। আমাদের চালক রেগে গিয়ে বললেন, আঁরে তেড়দেনি।
কী অর্থ কে জানে! মুকুর মুঠোর জোর বাড়ছে, পলাশ, বি সিরিয়াস। গলাটা ধরাধরা শোনাল। এ আবার কী খেলা রে বাবা! চোখে যেন জল এসেছে! এসবের অর্থ কী?
বি সিরিয়াস বি সিরিয়াস করছ, তার মানেটা কী?
তুমি আমাকে ফেরাতে পারবে না।
তার মানে?
আমি তোমার জন্যেই কলকাতায় পড়তে এসেছি। আমি আর ফিরে যাব না।
কেন মিছে কথা বলছ! তোমার কথা আমি বিশ্বাস করি না।
মুকু আমার শার্টের বুকের কাছটা খামচাতে লাগল, কী করলে বিশ্বাস করবে?
বড় কঠিন প্রশ্ন। সত্যিই তো, কী করলে আমি বিশ্বাস করব!
মুকু বললে, আমি আমার বাবাকে ঘৃণা করি।
কী যা তা বলছ? বাবাকে ঘৃণা করো বলে আমাকে, আমার মতো অপদার্থ একটা ছেলেকে ভালবাসতে হবে?
আমার বাবাকে তুমিও ঘৃণা করো, আর সেইজন্যে তুমি আমাকেও ঘৃণা করো।
আগে করতুম, আজ এই মুহূর্ত থেকে আর করি না।
আমি তোমাকে প্রথম থেকেই ভালবাসি পলাশ। সত্যিই বাসি।
মুকুর গলা ভেঙে এসেছে। ভালবাসা শব্দটা এমনিই এলানো, আরও যেন এলিয়ে গেল ভাঙা গলার গুণে।
কোনওরকমে বললুম, আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।
তোমার ওই বইয়ের ভাষা ছাড়ো। ওতে মন ভরে না। কাম আউট পলাশ। তুমি বেরিয়ে এসো।
এ কি নাটক হচ্ছে? চলমান মঞ্চে! এমন নাটক করে যদি ভালবাসতে হয়, বেসে কাজ নেই। ঘৃণা অনেক বেশি বাস্তব! আমার জামা খামচে ধরা মুকুর হাত ক্রমশ শিথিল হয়ে এল। শরীরে শরীর এলিয়ে পড়ল। আমার দক্ষিণ অঙ্গ এখন মুকুর দখলে। বেশবাস বিভ্রস্ত। দীর্ঘনিশ্বাস পড়ছে। চুল উড়ে উড়ে এসে চোখেমুখে লাগছে। কী আর করি! তার পিঠের পেছন দিয়ে আমার ডান হাত প্রসারিত করে, ডান হাতের তলা দিয়ে হাত ঘুরিয়ে মুকুর শরীরকে ঘনিষ্ঠ করে নিতে হল। সামান্য শিহরন খেলে গেল মুকুর শরীরে। জানি আমার এ সাহস দুঃসাহসেরই সামিল, কিন্তু উপায় নেই। ডাকে সাড়া না-দেওয়া এক ধরনের উপেক্ষা। মেয়েরা বড় অভিমানী হয়। তা ছাড়া শরীরের যখন যে-অঙ্গ কাজ করে, তখন সেই অঙ্গের আলাদা একটা মগজ তৈরি হয়। মিটারের যেমন সাবমিটার! মেন লাইনের যেমন এক্সটেনশন লাইন। পা যখন লাথি মারে, পায়ের একটা মগজ হয়। হাত যখন কিছু স্পর্শ করে হাতের একটা মগজ হয়।
মানুষের আবেগ বাঁধ বাধা নদীর মতো। জল কেবলই পথ খোঁজে, কোথায় একটা ছিদ্র পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে চাপ বেড়ে একসময় বাঁধের দেয়াল চৌচির হয়ে যায়। এতদিন জমে থাকা মুকুর আবেগ বন্যার জলের মতো তেড়ে বেরিয়ে এল। সমস্ত শরীর যেন দুমড়ে মুচড়ে উঠছে। আমি না জেনে বড় স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে ফেলেছি। এ যন্ত্রণা, না সুখ! হাতখানেক ব্যবধানে অপরিচিত একজন মানুষ। পাথরের মতো মুখ করে গাড়ি চালাচ্ছেন। আলোর ঝটকা আসছে, চলে যাচ্ছে। মুকু পা দিয়ে আমার পা খুঁজছে। ভুলে গেছে আমরা বসে আছি ট্যাক্সির পেছনের আসনে।
মুকুর মাথা এখন কাঁধ ছেড়ে আমার বুকে নেমে এসেছে। আমি ভাবতেই পারছি না, রক্তমাংসের এক যুবতী আমার বক্ষলগ্না! যে-ইচ্ছা কল্পনায় উঁকি মেরে যেত, রাতের স্বপ্নে এসে ঘুরপাক খেত, তা এখন বাস্তব। ঈশ্বরলাভ হলে কী হয় আমার জানা নেই। তুলতুলে যুবতীলাভ হলে যা হয়, তা যার হয় সেই জানে। মনে হচ্ছে স্বর্গে ভেসে চলেছি পুষ্পক রথে। বৃষ্টি থেমে যাবার পর গাছের ডালে বসে দোয়েল যেরকম পুচ্ছ তুলে ডাকে আর নাচে, আমার মনও যেন বুকের কাছে সেইভাবে নাচছে। খোঁপা হয়ে ভেঙে পড়ছে। দেহ হয়ে দেহের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। কোথায় আমার তীর্থ বারাণসী! কোথায় আমার পিতৃদেব! কোথায় আমার মৃত মাতামহের জন্যে শোকাকুল মন! সব এই দেহে নিমজ্জিত! চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি পথ ঘুরে যাচ্ছে। হিমালয় সরে যাচ্ছে।
