তোমাকে আমি খাঁটি গোরুর দুধের সিন্নি খাইয়ে খাইয়ে ইয়া মোটা করে দিতুম। আহা রে! শাসনে শাসনে ছেলেটা আমার শুকিয়ে গেল।
চুলের ঝুটি ধরে কোলের দিকে টানছে। ওম তৎসৎ, ওম তৎসৎ। প্ল্যাটফর্ম এগিয়ে আসার মতো কোল এগিয়ে আসছে। মায়ার দরজা পার করে দাও প্রভু।
বাঘিনি বাঘ নিয়ে খেলে
সিংহ নতজানু বিশেষ সময়ে
শৃগালের হাহা হাসি
হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া, ক্যা হুয়া, কেয়া হুয়া ॥
আমি জানি, এখন কী হবে! মায়ার আবেগ বড় সাংঘাতিক! বারকয়েক ওই আটচালায় তার প্রমাণ মিলে গেছে। অপত্যস্নেহে কোলে ফেলে তাল চটকান চটকাতে থাকবে। সারাশরীর কাঁপতে থাকবে। দেহের অনাবৃত অংশ ঘর্মাক্ত হবে। কেবল বলবে, দুষ্টু দুষ্টু, চটকে শেষ করে দেব। সুখেন, বাঁচা। দৈহিক নয়, বড় নৈতিক যন্ত্রণা। আমার ধর্ম গেল। সতীত্ব গেল। ধ্যার মূর্খ। শাক্ত থেকে বৈষ্ণব হয়ে যা, মাগুর মাছের ঝোল, যুবতী নারীর কোল, বোল হরি বোল, বোল হরি বোল ॥
রূপসির কালো ওড়নার মতো সন্ধ্যা ঘিরে আসছে। লোম উসকোখুসকো দুটো কুকুরের মতো মায়া আর আমি পাশাপাশি বসে আছি। খুব একচোট হয়ে গেল। কী থেকে যে কী হয়ে যায়! মনের কাঁধে পা ঝুলিয়ে আর একটা কী বসে আছে! সে যে দৃষ্টি এড়ায়, পালিয়ে বেড়ায়, যায় না তারে ধরা।
মায়া ঘর থেকে একটা আধ-ভাঙা টিনের বাক্স নিয়ে এল। সাজের সাজসরঞ্জাম। দাঁড়া-ভাঙা চিরুনি। চুল বাঁধার ফিতে। সোনালি টিপ, কাঁচপোকার ডানা কাটা। চিরুনি হাতে নিয়ে মায়া আমার সামনে মাটিতে দু’হাঁটু ফেলে খাড়া হয়ে বসে, বুকের দিকে মাথাটা টেনে নিয়ে ঘাড়ের দিকের চুলে চিরুনি চালাতে লাগল।
চুল নয় তো, জটেবুড়ির জটা। কী করে রেখেছ মাথাটা। দেখি মাথা তোলো।
সামনে ঝুঁকিয়ে, পেছনে হেলিয়ে, পাশে ফিরিয়ে মায়া আমার চুল ঠিক করতে লাগল। গোল হাতে বাঁধা তাবিজের লাল সুতো সাপের মতো ঝুলছে। মাঝে মাঝে ছোবল মেরে যাচ্ছে। একটু বাসি তেলের গন্ধ, জলের গন্ধ, বুকের গন্ধ। সন্ধ্যা আসে ঘিরে। পাতায় বাতাস লেগেছে। পৃথিবীরও একটা মোহিনী আঁচল আছে। অদৃশ্য সব ফঁকফোকর থেকে সুখ নেমে আসে। মহাকাশের মহা অন্ধকারে মাথা তুলে আছে নির্জন পর্বতশ্রেণি। ফাটল চুঁইয়ে বেরিয়ে আসছে জলবিন্দু, ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুর মতো। জমে উঠছে টোপা টোপা মুক্তোর দানার মতো। সূর্যের আলোয় অশ্রু হয়ে উঠবে হীরকের হাসি। সবই অলক্ষে। কখন কোথায় কী হয়ে চলেছে এই বিরাট বিশ্বে কে আর নজর রাখছে।
মায়া কোল থেকে আঁচল তুলে নিয়ে তেলতেলে মুখটা মুছিয়ে দিতে দিতে বললে, তুমি অনেক দেরিতে বুড়ো হবে। আমি মরে যাবার অনেক পরে তুমি মরবে। এখনও একবারে কচি আছ। দেখি একটা কাঁচপোকার টিপ পরালে কেমন দেখায়?
ছোট্ট কৌটোয় ধুনোর আঠা। সেই আঠায় ঠেকিয়ে একটি টিপ ভুরুর মাঝখানে প্রথম আঙুলের চাপ দিয়ে পরাতে পরাতে বললে, তুমি আমার কে বলো তো!
এ বড় শক্ত প্রশ্ন! এই পৃথিবীতে কে যে কার। যার কেহ নাই, তুমি আছ তার। এই তো হালফিল যে ঘটনা ঘটে গেল পাড়ায়! হারু আর হারুর মা হারুর বাবাকে ঘাড় ধরে বাড়ির বার করে দিলে। বুড়ো ভাল দেখে না, কানে ভাল শোনে না। ঘষা কাঁচের ডাটি-ভাঙা চশমা চোখে। নাকের কাছে তুলো জড়ানো। বুড়ো কয়লার দোকানের পেছনে পড়ে রইল এক মাস। উঠতে পারে না, চলতে পারে না। দু’হাতে সেবা করে গেল কে? মেয়ে স্কুলের কর্মচারী মেনকাদি। বিয়ে করলে যে-কোনও রাজপুত্তুরকে বিয়ে করতে পারতেন। জীবন কাটাচ্ছেন আতুরের সেবায়। এক মাস সকাল বিকেল মেনকাদি জল, দুধবার্লি, কাঁথাকম্বল জোগালেন। বুড়ো দ্বিতীয়পক্ষের বউ প্রথমপক্ষের ছেলেকে রেখে একদিন শেষরাতে চলে গেলেন মহাযাত্রায়। কেউ এক ফোঁটা চোখের জল ফেলল না। মেনকাদি কেঁদে ভাসালেন। তবে? মায়া আমার কে? আমি মায়ার কে? কোথাও কোনও অদৃশ্য লিপিতে কি ভাগ্যবিধাতা লিখে রেখেছেন?
একটা ভাঙা আয়নায় পাকা বউয়ের মতো মুখ দেখতে দেখতে মায়া বললে, তোমার বাবার। তৈরি ব্রনর কোনও ওষুধ আছে?
বোরোফ্যাক্স আছে।
কাল একটু এনো তো।
ভাবতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। কার ওষুধ কোন গালে এসে লাগবে? যদি একবার জানাজানি হয়ে যায়! ন্যাড়া করে মাথায় ঘোল ঢেলে, গাধার পিঠে উলটো করে বসিয়ে, ঢাক ঢোল ফেস্টুন সহকারে নগর প্রদক্ষিণ করাবেন।
কই বললে না তো তুমি আমার কে?
তুমি আমার ভৈরবী।
সে আবার কী?
আমার একটা পরিকল্পনা আছে মায়া। একদিন শেষরাতে তুমি আর আমি গৃহত্যাগ করব। আমার এই বড় বড় চুল। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। পরনে রক্তাম্বর। এক হাতে চিমটে, আর এক হাতে ত্রিশূল। পাশে তুমি আমার ভৈরবী। রুক্ষ, এলো চুল। লাল শাড়ি। কপালে এতখানি গোল সিঁদুরের টিপ। যেতে যেতে যেতে যেতে, কোনও এক মহাশ্মশানের পাশে দু’জনে ধুনি জ্বালিয়ে বসব। একটু একটু করে মহামায়াকে জয় করে সিদ্ধ সাধক হয়ে বসব। জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু সব আমাদের পায়ের তলায়।
তার মানে বউ!
ঠিক বউ নয়। সে কীরকম এক ধরনের ব্যাপার, তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। আমি নিজে বুঝে, তোমাকে বুঝিয়ে দেব।
ওসব সাধুটাধু হতে পারব না বাপু। আমার ভীষণ মাছের লোভ। চুনোমাছ বেশ সরষেবাটা আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে গরগরে ঝাল তৈরি করে একথালা গরমগরম ভাত। তারপর একখিলি পান। ডুরে শাড়ি। ও গেরুয়া মেরুয়া সব ভণ্ডামি। চটকলে অনেক লোক নেবে শুনলুম। চেষ্টা করে দেখো না। তা হলে বেশ পালানো যায়!
