দু’হাত মাথার ওপর তুলে খোঁপা ঠিক করতে করতে বললে, কী গো সন্ন্যাসী! দেখি, কে হারে কে জেতে? উনি বলে গেলেন, পবিত্র হও। আমি যে অপবিত্র হবার জন্যেই এসেছি।
আবার হাসি।
মুকু প্লিজ। তোমাকে আমার ভয় করছে। ওরকম করছ কেন?
ভয় করছে? তুমি না পুরুষমানুষ? যে-মানুষ মাতৃগর্ভে জন্মেছে সে মানুষ কখনও পবিত্র হতে পারে না।
কী বলছ তুমি? ড্যামেজিং কথাবার্তা!
ভেবে দেখো। জীবনের সব মুহূর্ত একজায়গায় জড়ো করে করে, বেছে বেছে দেখো সাদা, কালো, হলদে, সবুজ। জীবন বহু বর্ণের মুহূর্তের মালা।
মুকু কফিতে চুমুক চালাল। ফুড়ুত করে পাখি উড়ে যাবার মতো শব্দ হল। চোখ মুখ উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করছে। ছোট্ট কপালের চারপাশে চুল ঝুলে পড়েছে। অসাধারণ দেখাচ্ছে। মানবীকে মনে হচ্ছে দেবী। মনের কী মতিভ্রম! একটু ভালবাসার কথা শুনেই কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। মেয়েটা আমাকে ঠকাতে আসেনি তো?
প্রশ্ন করলুম, হঠাৎ এই উদ্ভট খেয়াল চাপল কেন, আমাকে বিয়ে করবে?
শুনবে তা হলে, তোমার জন্যে নয়, তোমার বাবার জন্যে।
সে আবার কী?
তোমার বাবাকে আমি ভালবাসি। অমন চরিত্র লাখে এক মেলে। উপায় থাকলে আমি তাকেই বিয়ে করতুম।
মুকুর কথা শুনে ঠোঁটের কাছে ধরে থাকা কাপ হাত ফসকে পড়ে যাচ্ছিল। মেয়েটা বলে কী? সত্যিই পাগল হয়ে গেল নাকি?
১.৭১ I am no prophet
দুন এক্সপ্রেস স্টেশন ঝাড়পোঁছ করে নিয়ে চলে গেল। দু-একজন পোর্টার আর রেলকর্মী ছাড়া আর কেউ পড়ে রইল না। আমরা দু’জনে পাশাপাশি হেঁটে স্টেশনের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালুম। আজ খুব হাওয়া ছেড়েছে। চুল উড়ছে। শাড়ির আঁচল উড়ছে। সুবাস উড়ছে। কোথা থেকে এই ওমর খৈয়ামের রাত এল শহরে!
প্রায়-শূন্য ট্রাম চলেছে এঁকেবেঁকে, ঘণ্টা বাজিয়ে। একটা-দুটো ট্যাক্সি পড়ে আছে শেষ যাত্রীর অপেক্ষায়। পাঞ্জাবি ড্রাইভার বনেটে হেলান দিয়ে সিগারেট টানছে অলসভাবে। কাঠের গোল ড্রামের ওপর নিঃসঙ্গ পুলিশ। শহর এবার শুয়ে পড়বে।
কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে মুকু আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার অনাবৃত ওপর-বাহু আমার হাত স্পর্শ করছে। পাথরের মতো শীতল। ভেতরে যার আগুন জ্বলছে তার আধার কী করে এমন স্নিগ্ধ হয়! মানব শরীর ঈশ্বরের এক অদ্ভুত সৃষ্টি! একই সঙ্গে গদ্যময়, কাব্যময়। জলে যেন। আগুন জ্বলছে। কেবলই মনে হচ্ছে, এ রাত যেন শেষ না হয়। ভেতরে এক পূর্ণতার ভাব : আসছে। অর্ধাঙ্গ যেন পূর্ণাঙ্গ হয়ে গেছে। মনের সঙ্গে মনের লড়াই চলেছে। আচ্ছা, তন্ত্রে তো প্রকৃতি নিয়ে সাধনার ইঙ্গিত আছে! ইঙ্গিত কেন, নির্দেশ আছে। পঞ্চ মকার ছাড়া তন্ত্রসাধনা হবেই না। তন্ত্রের পথও তো সাধনার পথ, ঈশ্বরলাভের পথ। মুকু তো আমার ভৈরবীও হতে পারে। যার চুল কোঁকড়া, গুরুনিতম্ব, সে তো আদর্শ ভৈরবী। কিন্তু তন্ত্র যে বলছে শ্যামা রমণী না হলে ভৈরবী করা যায় না! ও ওরকম বলে! গাত্রবর্ণে কী এসে যায়! আসল বর্ণ তো মনে! কবি বলেছেন, ওপরে যত কালো আর ধলো, ভেতরে সবার সমান রাঙা। আচ্ছা, আমিই বা এত ঈশ্বর ঈশ্বর করছি কেন? দেরাদুনে একটা প্রোমোশন নিয়ে চলে যাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আমাদের লাইনে অভিজ্ঞতা যত বাড়বে, মাইনেও তত বাড়বে। ফ্রি কোয়ার্টার। চিফ হলে গাড়ি। মুকুকে বগলদাবা করে নিয়ে গেলেই তো হয়। ওপাশে হরিদ্বার, এপাশে অরণ্য, মাথার ওপর মুসৌরি।
মুকু হঠাৎ দু’হাতে আমার ডান হাত ধরে ঝুলে পড়ল। মাথাটা আমার ডান কাঁধে। আর একটু হলেই কেতরে পড়ে যেতুম। কোনওক্রমে সামলে নিলুম।
তখন থেকে কী দুষ্টুমি করছ বলল তো!
মুকু হিহি করে হেসে বললে, শীত করছে। কেন বলো তো! জ্বর এল নাকি!
তোমার গা বরফের মতো ঠান্ডা।
শীত কেন করে আমি জানি। স্নায়ুর শিহরনে মনে হয় জ্বর আসছে। আমি যে পুরুষ, এ প্রমাণ পেয়ে বড় ভাল লাগছে। আগুন যদি আগুন লাগাতে না পারে, তা হলে সে তো জোনাকি। আলো
আছে, দাহিকা শক্তি নেই। আমারও একদিন শীতে এইরকম গা কেঁপে উঠেছিল। সে রাতের কথা এখনও ভুলতে পারিনি।
মুকু বললে, অনেক রাত হয়ে গেল। হস্টেলে ঢুকতে দেবে তো!
তোমার হস্টেল তুমিই জানো। না দেয়, আমাদের বাড়িতেই থাকবে।
মেসোমশাই আজ কেমন যেন হয়ে আছেন! প্রথমে বেশ ভালভাবেই কথা বলছিলেন, হঠাৎ কী হল উঠে চলে গেলেন।
মাঝে মাঝে উনি ওরকম হয়ে যান, এতক্ষণে ঠিক হয়ে গেছেন। তুমিই তো একটু আগে কী সব বলছিলে? তুমি গিয়ে সামলাবে।
তোমাকে তো তা হলে আমায় মা বলে ডাকতে হবে। পারবে?
তোমার মাথায় একটা গাঁট্টা মারব।
মুকু হিহি করে হেসে উঠল। পাশ দিয়ে একজন রেলের ভদ্রলোক যাচ্ছিলেন, ঘুরে তাকালেন। নাঃ, মুকুকে আর খোলা জায়গায় বেশিক্ষণ রাখা যায় না, বিপদের সম্ভাবনা আছে। মেয়েদের সাহস মানে দুঃসাহস। জবাকে মনে পড়ছে। স্রেফ একটা সায়া আর ছোট্ট একটা ব্লাউজ পরে পাঁচিল টপকে আমাদের ছাদে পালিয়ে এল। সুখেনের এত টান! এই টানটাকে নিজের মধ্যে এনে যদি ঈশ্বরকে টেনে আনতে পারতুম, তা হলে নিজের সঙ্গে এই দোটানায় পড়তে হত না।
মুকু বললে, আমার আর ট্রামেবাসে চাপতে ইচ্ছে করছে না, একটা ট্যাক্সি করো।
তুমি খুব এক্সপেনসিভ।
জানো আমার কোষ্ঠীতে কী আছে, বড়লোকের বউ হব।
সে যবে হবে তবে হবে। আগে লেখাপড়া শেষ করো। অত বউ হব বউ হব করছ কেন?
