কী আছে খামে?
খুলে দেখো।
খামটা খুলতেই হাফ সাইজের একটা ছবি বেরিয়ে এল। কনক! কনক আর সুদর্শন চেহারার এক যুবক পাশাপাশি। কাঁধে কাধ লেগে আছে। কতদিন পরে কনককে আবার দেখতে পেলুম! সেই উজ্জ্বল ধারালো মুখ। টানাটানা চোখ, বাঁশির মতো নাক।
ছেলেটি কে মুকু?
বুঝতে পারছ না?
কী? সেই?
হ্যাঁ সেই। আমার সন্দেহই ঠিক হল। সেই হোমচৌধুরী। যার কথা তোমাকে আমি চিঠিতে লিখেছিলুম।
বিয়ে হয়ে গেছে?
কী মনে হচ্ছে?
কনক তা হলে বেঁচে আছে?
বহাল তবিয়তে। আমার দিদি অত সহজে হার স্বীকার করার মেয়ে নয়।
কোথায় আছে?
জাহাজে।
তার মানে?
দিদির বর রেডিয়ো অফিসার। প্রচুর টাকা মাইনে। বিশ্ব-ঘোরা চাকরি। আজ এ বন্দরে, কাল ও বন্দরে। কী মজা! সারাপৃথিবী দেখে বেড়াবে।
কাদের জাহাজ?
পি. ও. লাইনার।
কত টাকা মাইনে মুকু?
দশ-বারো হাজার তো হবেই।
মাসে?
হ্যাঁ গো মাসে। পুরো মাইনেটাই সেভিংস, কারণ সবই তো ফ্রি।
ঈর্ষায় সারাশরীর জ্বলে উঠল। কী করলুম জীবনে? ইডিয়টের মতো কল্পবিলাসে জীবনটা নষ্ট করে ফেললুম। সময় চলে গেছে। আর নতুন করে সুরে বাঁধতে চাইলেও বাঁধা যাবে না। যে বীজ বুনেছি সেই ফসলই তুলতে হবে। কেউ ফলায় জাফরান, কেউ খেসারি। যার যেমন বরাত।
মুকু চামচে দিয়ে ওমলেট কাটছে। ডিশের সঙ্গে চামচে লেগে কড়াশ কড়াশ শব্দ হচ্ছে। আঁতে ঘা লাগছে। মুখ তুলে বলল, কী, মন খারাপ হয়ে গেল?
না না, মন খারাপ হবে কেন?
সত্যি বলো তো, দিদিকে তুমি ভালবেসেছিলে কি না?
ভালবাসা অনেক উচ্চস্তরের জিনিস। বেসেছিলুম কি না জানি না, তবে ভাল লেগেছিল। বিয়ের কথা ভাবিনি।
সে তুমি কোনও দিনই ভাবতে পারবে না। তুমি সপ্লিট পার্সোন্যালিটিতে ভুগছ। কেউ যদি তোমার দুটো সত্তাকে কোনওদিন জোর করে এক করে দিতে পারে, তবেই তুমি সুখী হবে। যে বোঝে সে বোঝে।
তার মানে?
তোমার মুখের কথা এক, তোমার মনের কথা আর এক। যে তোমার মুখের কথা শুনে চলে যাবে সে তোমার ওপর অবিচার করবে, তোমার ক্ষতি করবে। তোমাকে বাঁধতে হবে, যেমন করে মানুষ নদীকে বাঁধে।
আমার সন্ন্যাস, আমার পরমার্থ!
রাখো তোমার সন্ন্যাস, তোমার পরমার্থ। সন্ন্যাস কাকে বলে জানো?
অ্যাঁ!
সন্ন্যাস কাকে বলে জানো?
সন্ন্যাস মানে ত্যাগ।
কী ত্যাগ?
কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য।
তা হলে মানুষের আর রইলটা কী? ধরো বাঘ যদি আলোচালের হবিষ্যি খায়, সিংহ যদি কলাপাতা চিবোয়, গন্ডার যদি জাবনা চিবোয়, তাতে বাঘত্ব, সিংহত্ব, গন্ডারত্ব বজায় থাকে?
তোমার ব্যাখ্যায় সন্ন্যাস তা হলে কী?
সৎ জীবন, কর্মময় জীবন।
পাশের টেবিলের সেই প্রৌঢ় ভদ্রলোক আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, আপনার রুমাল পড়ে গেছে।
নিচু হয়ে রুমালটা তুলছি, প্রৌঢ়া বললেন, তোমাকে চেনাচেনা লাগছে। তুমি কি স্বামী নির্মলানন্দের কাছে যাও?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
ঠিক ধরেছি। মুকুকে দেখিয়ে বললেন, এ তোমার কে হয়?
উত্তর দিতে গিয়ে দু’বার ঢোক গিলতে হল, আমার বোন হয়।
বাঃ, বেশ মেয়েটি। কী পড়ছ মা?
মুকু মুখে ওমলেট তুলছিল, নামিয়ে রেখে বললে, এম এ।
ভদ্রমহিলা চোখের ভঙ্গি করে বললেন, তাই নাকি? বাঃ এত কম বয়েসে এম এ করছ? প্রৌঢ় মানুষটিকে বললেন, হ্যাঁগা, একবার তাকিয়ে দেখো, আমাদের সুজয়ের সঙ্গে ভারী সুন্দর মানাত, তাই না?
ভদ্রলোক সরাসরি মুকুর দিকে না তাকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। বলে হাসতে লাগলেন আপন মনে, তৃপ্ত মানুষের মতো। দাঁতগুলি বড় সুন্দর। মুক্তোর মতো সারি সারি বসানো। হাসি থামিয়ে ভদ্রলোক ঘড়ি দেখলেন। তাড়াতাড়ি আসন থেকে উঠে বললেন, চলো চলো, সময় হয়ে গেছে। এখুনি ট্রেন ইন করবে।
ভদ্রমহিলা মুকুর পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে মুকুর মাথায় হাত রেখে বললেন, পবিত্র হও, পবিত্র হও। আমাকে বললেন, একদিন তোমার বোনকে স্বামীজির ওখানে নিয়ে এসো।
দু’জনে আগে পরে বেরিয়ে গেলেন। মুকু ওমলেটের ডিশের পাশে টেবিলের ধারে মাথা ঠেকিয়ে ফুলে ফুলে হাসতে লাগল। ঘাড়ের কাছে এলিয়ে-থাকা খোঁপা দুলে দুলে উঠছে। চওড়া পিঠে ব্লাউজের ভি-অংশ হাসির দমকে হুক ছেড়ে খুলে যাবার মতো হচ্ছে। মায়াবী মেয়ে, মায়াবী রাত, পাপীর চোখ।
ওয়েটার ভদ্রলোক দু’কাপ কফি এনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। কোথায় রাখবেন? মহাসমস্যা। বোঝা মুশকিল, মুকু হাসছে না কাঁদছে। জলের গেলাসদুটো একপাশে সরিয়ে কাপদুটোর জায়গা করে দিলুম। ভদ্রলোক সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে, কফি রেখে চলে গেলেন।
মুকু মাথা তুলল। জিজ্ঞেস করলুম, হাসছ কেন?
গম্ভীর মুখে বললে, আমার বাজারটা একবার দেখলে?
কথা শেষ করেই আবার হাসতে লাগল। মেয়েদের এই এক দোষ। শুরু করতে জানে, শেষ করতে জানে না। হাসলে হাসি থামে না। কাদলে কান্না থামে না। এইভাবে ফুলেফুলে হাসলে, আর পাঁচজন কী ভাববেন!
হাসির ফাঁকে ফাঁকে বলতে লাগল, ভদ্রমহিলা আমাকে ছেলের বউ ঠিক করে ফেলেছেন, আমি এদিকে আর একজনের বউ হব বলে মনে মনে ঠিক করে ফেলেছি।
কার?
টেবিলের ওপর দিয়ে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে সরু সরু আঙুল তুলে খিলখিল হেসে বললে, তোমার, তোমার।
হাতের চারটে আঙুল সাপের ছোবলের মতো মুখের এখানে ওখানে লাগছে। হাতের চুড়ি দু’গাছা দুলছে, ঝিলিক মারছে। মুকু পরিবেশ ভুলে গেছে। চারপাশে এত লোকজন! পাগল হয়ে গেল নাকি? ফিসফিস করে বললুম, অ্যায় মুকু, কী হচ্ছে কী?
