রেলের ক্যান্টিনটি বেশ বড়। লোকজন রয়েছে, তবে বসার জায়গা পেতে অসুবিধে হল না। কোণের দিকে পাশাপাশি দুটি আসন। পাশের টেবিলে সৌম্য চেহারার এক প্রৌঢ় বসে আছেন। তাঁর উলটো দিকে বসে আছেন এক প্রৌঢ়া। কাঁচাপাকা চুল। হালকা রঙের সিল্কের শাড়ি। ধবধবে সাদা ব্লাউজ। রং আর স্বাস্থ্য যেন ফেটে পড়ছে। কপালের মাঝখানে লাল টিপ, ভোরের সূর্যের মতো ভাসছে। দু’জনেই কফির পেয়ালায় হালকা চুমুক মারছেন। মৃদু স্বরে নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। চারপাশে মৃদু একটি সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে। আমি অবাক হয়ে দেখছি। সুখ যেন মানুষের চেহারা ধরে এই রেলের ক্যান্টিনে কফির কাপ নিয়ে বসেছে। পৃথিবীতে সব আছে। যা চাইব, তাই দেখতে পাব। পমেড-মাথা কাকিমার মামাশ্বশুর। মানী মানুষের কাছে যৌনবিজ্ঞান পাঠাবার মতো কদর্য চরিত্র। মাতামহের মতো গৃহী সাধক। মাতুলের মতো আত্মভোলা শিল্পী। পিতার মতো নিঃসঙ্গ সৈনিক। স্বামী নির্মলানন্দের মতো সর্বত্যাগী জ্ঞানী সাধক। আলোয় কালোয় বেশ সাজিয়েছ ভগবান!
দু’হাতের তালুতে চিবুক ধরে মুকু বেশ বসেছে! যেন হাতের ফাঁকে পদ্ম ফুটেছে। অবাক হয়ে আমাকে দেখছে। চোখাচোখি হতেই মৃদু হাসল। চোখদুটো গভীর সরোবরের মতো কেঁপে উঠল। নাকের পাশের ছোট্ট নাকছাবি উৎসব রাতের চুমকির মতো ঝিলিক মেরে উঠল। বসন্ত নয়, তবু মনে হল মনের সব জানলা দরজা খুলে গেছে। দখিনা বাতাস বইছে। পাপিয়া বড় আকুল সুরে ডাকছে, পিউ কাহা! মরেছে, আমি প্রেমে পড়ে গেছি। মুকুর মুখের দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছি না। শুনেছি গভীর রাতে নির্জন পাহাড়ের ফাটল থেকে এক ধরনের রস বেরিয়ে আসে। যার নাম শিলাজতু। বড় দুর্লভ বস্তু। আমার মনের স্তরেও শিলাজতু জমছে ধীরে ধীরে। ধ্যাত, কী আমি সন্ন্যাস সন্ন্যাস করছি! জীবন্ত দেবী ছেড়ে মৃত ঈশ্বরের সন্ধানে মহামূল্য জীবন অপচয় করে ফেলছি। কে জানে আবার এই পৃথিবীতে আসা হবে কি না! শুদ্ধ কোনও পিতামাতার দৈহিক মিলনে, নির্জন কোনও প্রকোষ্ঠে, রজনীর গভীরে ছোট্ট একটি জ্বণের আকারে আবার এই জীবন কি ধরা পড়বে। বাইরে তখন শ্রাবণের ধারা, ভিজে বাতাস, সিক্ত পাতার আনন্দোচ্ছ্বাস। কেউ-ই কারও দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছি না। দুটি দৃষ্টি মাইলের পর মাইল কী সব অপ্রকাশিত কথা লিখে চলেছে ভাষাহীন ভাষায়। সুখেনের কথা, জবার কথা মনে পড়ছে। জবা মা হবে। আমার মা যেমন মা হয়েছিলেন! নরনারীর মিলন যদি পাপের হত, তা হলে শঙ্কর, বুদ্ধ, চৈতন্য, বিবেকানন্দ আসতেন। কী করে?
আমার ডান হাত ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে মুকুর কবজি ধরে ফেলল। সারাশরীরে অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ! আমার সমস্ত মন সেই স্পর্শে নিবেদিত। সবুজ ফসলের খেতে যেন সেচের জল কুলকুল। করে বয়ে চলেছে। লক্ষ করিনি, কখন ওয়েটার এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন। এ জগৎ থেকে চলে গেছি কোন মায়ার জগতে! মানুষের এখনও রসবোধ আছে। ওয়েটার ভদ্রলোক কতক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে আমাদের দুজনের এই তন্ময়তা দেখছিলেন জানি না। চোখাচোখি হতেই মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, কী খাবেন?
বেশ খিদে পেয়েছে। মুকুকে জিজ্ঞেস করলুম, কী খাবে?
যা হয় কিছু বলো না।
মুকু ভদ্রলোককে সামনে থেকে সরাতে চাইছে। আমার সারাশরীরে আড়ামোড়া ভাঙার মতো অদ্ভুত এক অনুভূতি প্রবল হয়ে উঠছে। মন যেসব উপাদান আর উপাধানে সেজে উঠছে, তাতে এই মুহূর্তে নির্জন একটি ঘর পেলে ভাল হয়, একটি শয্যা থাকা চাই। বলশালী এক দৈত্যকে কোমর ধরে আটকাতে চাইছি। সে আমায় খানাখন্দের ওপর দিয়ে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলেছে।
ও হ্যাঁ, ওমলেট আর কফি।
ওয়েটার ধীরে ধীরে চলে গেলেন। টেবিলের ওপর ফেলে রাখা আমার হাতের আঙুল নিয়ে খেলতে খেলতে মুকু বললে, তুমি বেশ সুন্দর হয়েছ।
তুমিও।
সে তোমার চোখে। আয়না কিন্তু অন্য কথা বলে।
একটু রোগা হয়ে সত্যিই তুমি সুন্দর হয়েছ। আমি চোখ ফেরাতে পারছি না।
মুকু মাথা নিচু করল। কপালের সামনে থেকে মাথার পেছন অবধি সিঁথি চলে গেছে। স্বপ্ন দেখছি, আমি যেন রাজবেশে সিঁদুর পরাচ্ছি। দূর থেকে ভেসে আসছে সানাইয়ের শব্দ। রজনীগন্ধার সুবাস।
পাশের টেবিলে প্রৌঢ় দম্পতি মৃদু গলায় নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করছেন। মাঝে মাঝেই কানে আসছে একটি অঞ্চলের নাম, আলমোড়া। স্বামী নির্মলানন্দ আমাকে আলমোড়া পাঠাতে চান। হিমালয়ের কাছাকাছি। আজ থেকে বেশি না, মাত্র তিরিশ বছর পরে আমি আর মুকু ওই আসনে বসতে পারি। সুখী আর সাত্ত্বিক চেহারা নিয়ে। এমন তো কিছু খারাপ নয়, বড় মধুর ভবিষ্যৎ!
মুকু মুখ তুলে তাকাল। মন যদি চোখে আসে, চোখের চেহারা কীরকম হয়? যেমন দেখছি এই মুহূর্তে। মুকু বললে, তোমাকে একটা ছবি দেখাব?
কার ছবি? তোমার?
না। দেখাতে পারি একটা শর্তে। রাগ করা চলবে না।
দেখাও।
দু’প্লেট ওমলেট টেবিলে এসে নামল। মুকু মাথা নিচু করে কোলের ওপর রাখা হাতব্যাগে। ছবি খুঁজছে। ডান হাতের দু’গাছা চুড়ি, সংসারের শব্দে ঠুনুর ঠুনুর করছে। বড় একান্ত, বড় আপন, ভীষণ মায়ায় ভরা। গরম ওমলেটের অল্প অল্প ধোঁয়া মুকুর কোকড়া কোকড়া কালো– চুলের কাছে পাক খাচ্ছে। ব্যাগ থেকে হলদে রঙের একটা খাম তুলে মুকু টেবিলে আলগোছে। রাখল। উদাস দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওমলেটের দিকে। তাকাবার মতোই ভাজা হয়েছে। কাঁচা সোনার রং ছাড়ছে।
