পায়চারির জন্যে তিনি আবার পেছন ফিরলেন। ধীরে ধীরে দুরে ফুলগাছের টবের দিকে চলেছেন। আমার সমস্ত শ্রদ্ধা কেমন ঘৃণায় পরিণত হচ্ছে। আমার সবকিছু জানেন? আমার মানসিক শক্তি, আমার চিন্তা ভাবনা? সব উনি জেনে বসে আছেন? অসম্ভব!
ঠিক আছে, নীচে না আসেন, না আসবেন। মানুষটি কোনওদিন কারুর কাছে নতি স্বীকার করেননি। এ-ও তো এক ধরনের অহংকার। মুকু বললে, কী হল, তোমাকে বেশ উত্তেজিত মনে হচ্ছে। কথা কাটাকাটি করে এলে?
কী করে বুঝলে?
তোমার মুখ দেখে। তুমি আমার দেওয়া আংটিটা ফেললে কোথায়? আঙুলে নেই তো।
রেখে দিয়েছি।
পরলে না কেন? তোমার সামনে আমার ভীষণ লজ্জা করছে। কেন বলো তো? তুমি আমার আবোলতাবোল পড়ে কী ভাবলে?
আমার সব ভাবনার কথা তোমাকে পরে বলব, মুকু। আজ আমার ভীষণ দুর্দিন। মনে মেঘ করেছে।
কাকিমাকে অমন জোর করে পাঠিয়ে দিচ্ছ কেন?
সে-ও আর এক কাহিনি। এখানে থাকলে বিপদ আছে।
তুমি কি ওঁদের ট্রেনে তুলতে যাবে?
হ্যাঁ।
আমিও তোমার সঙ্গে যাব। অনেক কথা আছে।
চা-টা কিছু খেয়েছ?
সে পরে হবে। তুমি রেডি হয়ে নাও।
বিদায়ের মুহূর্ত ঘনিয়ে এল। মাতুল বাড়ির চাবিটি পিতৃদেবের হাতে তুলে দিতে দিতে বললেন, মাঝেমধ্যে একটু দেখাশোনা করবেন, আবার কবে আসতে পারব জানি না।
পিতা চাবিটি নিতে নিতে বললেন, আমি হয়তো সময় পাব না, তোমার ভাগনেই মাঝে মাঝে যাবে। তবে তুমি চেষ্টা করো যাতে এখানে ফিরে আসতে পারো। জানো তো, কথায় বলে, অপ্রবাসী, অঋণী। ইচ্ছে করলে এখানেও তুমি অনেক কিছু করতে পারো।
কাকিমার বাঁ হাতে পুঁটলি। ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন। পিতা বললেন, ওঠো বউঠান। মন খারাপ কোরো না। মেয়েছেলের জীবন, ঝড়ের এঁটো শালপাতার মতো, যখন যে দিকে উড়িয়ে নিয়ে যায়! সাবধানে থেকো, মানিয়ে থেকো, আনন্দে থেকো।
দাঁতে আঁচল চেপে কাকিমা কান্নার শব্দ করলেন। অনেক চেষ্টায় বললেন, সাবধানে থাকবেন। শরীরের একটু যত্ন নেবেন। হয়তো আরও কিছু বলার ছিল। ভাষা এল না। মাতুলের সুটকেসটি হাতে নিয়ে বাহাদুর অদূরে দাঁড়িয়ে। লাল একটা জামা পরেছে। একমাত্র বাহাদুরের মুখেই হাসি। পাহাড়ের ছেলে পাহাড়ে চলেছে। যে একবার ঘর ছাড়তে পেরেছে, তার আর ভয় কী? বহতা নদী, রমতা সাধু।
পিতা বললেন, আর দেরি কোরো না। মায়ার বাঁধন যত তাড়াতাড়ি খুলে বেরোনো যায়, ততই ভাল। মাতুল চমকে উঠলেন, উদাস সুরে বললেন, আসি তা হলে। মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে বললেন, উঠাও গাঁটরি।
১.৭০ Tell me in what part of the wood
ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। কবজির কাছটা এখনও জ্বালা করছে। ট্রেন ছাড়ার পূর্ব মুহূর্তে কাকিমা চেপে ধরেছিলেন। জলে ডোবার আগে মানুষ এইভাবে আঁকড়ে ধরে। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিতে হয়েছে। নয়তো চাকার তলায় চলে যাবার সম্ভাবনা ছিল। ট্রেনের পেছনের লাল আলোটি ডিসট্যান্ট সিগন্যালের কাছে এখনও ভাসছে। একটি মুখ দূর থেকে দূরে ক্রমশই আরও দূরে সরে যাচ্ছে। চেষ্টা করলেও যে-মুখটিকে আমি কোনও দিনই ভুলতে পারব না। আকাশের দিকে তাকালে ভেসে উঠবে। স্থির জলে ভাসবে। স্বপ্নে উঁকি মেরে যাবে। বিষণ্ণ আশাহত দুটি চোখ। ভেজাভেজা চোখের পাতা। বারেবারে কেঁপে-ওঠা পাতলা দুটি ঠোঁট।
মুকু হাত ধরে টান মারল, তোমার দেখছি ঘোর লেগে গেছে! এমন ভাব করছ, কেউ যেন কখনও বিদেশ টিদেশ যায় না! মানুষে মানুষে যেন ছাড়াছাড়ি হয় না! আমি বলে কোথাকার মেয়ে সব ছেড়েছুঁড়ে এককথায় কোথায় চলে এলুম, একটুও মন খারাপ হল না আর তুমি পুরুষমানুষ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ফোঁসফোঁস করছ! চলো।
শূন্য প্লাটফর্ম কী অদ্ভুত দেখতে! একজোড়া লাইন পড়ে আছে। কিছু কাগজ, দু’-একটা ভাড়, তেল, কালি, রেল-রেল গন্ধ। বাক্স প্যাটরা বেডিং-এর ওপর গালে হাত দিয়ে বসে থাকা অপেক্ষমাণ। কিছু যাত্রী। সকলকেই যেতে হবে। আগে আর পরে। নীল পোশাক পরা দু’-একজন রেলকর্মী। গল্পরত দু’-একজন টিকিট চেকার। লোহার ঠ্যালাগাড়ি চেপে মালপত্র আসতে শুরু করছে। সতর্ক সময়নিষ্ঠ যাত্রীরা স্ত্রী-পুত্রের হাত ধরে আসছেন। কাঁধে জলের বোতল, হাতে ব্যাগ। লাল জামা পরা পোর্টারের মাথায় মোটঘাট। সায়েবি চেহারার পাঞ্জাবি যুবক। কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে লাস্যময়ী যুবতী। প্ল্যাটফর্ম আবার জমজমাট হয়ে উঠছে। একটু পরেই দুন এক্সপ্রেস ছাড়বে। সুরেলা গলায় মহিলাকণ্ঠ বারেবারে বিভিন্ন ভাষায় সেই সংবাদই ঘোষণা করছে। জোড়া লাইন কোন সুদূরে চলে গেছে। কেবলই মনে হচ্ছে, আমিও এখুনি কোথাও চলে যাই। বারেবারে আসি, বারেবারে ফিরে যাই। আজ যদি না ফিরি কেমন হয়! স্বামী নির্মলানন্দ দেরাদুনে, আলমোড়ায়, মাদ্রাজে, যে-কোনও জায়গায় আমার স্থান করে দিতে পারেন। আমি একবার হ্যাঁ বললেই হয়। মুকু বললে, তুমি অমন হা করে লাইনের নিরুদ্দেশ যাত্রা দেখছ কেন? প্রাণ ছটফট করছে বুঝি?
ধরেছ ঠিক।
আমারও ওইরকম করে। মনে হয় চলে যাই। এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায়। শুধু চলেই যাই। নাও চলো। কফি খেতে ইচ্ছে করছে। তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে।
মুকু আমার শরীরের সঙ্গে লেপটে আছে। কেউ দেখলে ভাববে স্বামী-স্ত্রী। মুকু কি আমাকে জালে জড়াবার জন্যে তৈরি হয়েই এসেছে?
