সন্ধ্যার উদাস আকাশের দিকে তাকিয়ে মাতুল বললেন, সব ছারখার হয়ে গেল। কোথায় গেল আমার সেই স্বপ্নের শৈশব! ওই সিঁড়িটার দিকে তাকালেই আমি দেখতে পাই, বাবা নেমে আসছেন ধীরে ধীরে। যৌবনের সে চেহারা তোরা দেখিসনি। একমাথা চুল ব্যাকব্রাশ করা। বিলিতি পমেড পড়ে চকচক করছে। গায়ে ফিনফিনে পাঞ্জাবি, কোচানো ধুতি। পায়ে গ্রিসিয়ান জুতো। সেই বাবু মানুষ ধীরে ধীরে সব ছাড়তে ছাড়তে, শেষে আমার চক্রান্তে শেষ ক’টা বছর এই ভাঙা ঘরে চাকরের। মতো কাটিয়ে গেলেন। আমি কার কথা শুনব, বউয়ের কথা, না নিজের বিবেকের কথা? ধীরে ধীরে আমার আমি ঘুমিয়েই পড়ল। আর তো ফিরবে না কেউ! যাহা যায়, তাহা যায়।
সিঁড়ি ভেঙে উঠতে উঠতে মাতুল বললেন, ইট, কাঠ, পাথর প্রাণহীন তাই প্রাণের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী! মানুষ চলে যাবার পরেও স্মৃতি বুকে করে এরা পড়ে থাকবে কতকাল। সিঁড়ির ধাপে ধাপে আমার মায়ের পায়ের ছাপ, বাবার পায়ের ছাপ, দিদির পায়ের ছাপ। একদিন আমিও থাকব না, তুই থাকবি। তোর মনে পড়বে, এক সন্ধ্যায় আমরা দুজনে পাশাপাশি কথা বলতে বলতে ওপরে উঠছিলুম, হয়তো এই আমাদের শেষ দিন, হু নোজ, দি ওয়ার্লড মে এন্ড টু-নাইট! কিছুই বলা যায় না, একেবারেই ক্ষণস্থায়ী বন্দোবস্ত। সুইচ-অন, সুইচ-অফ।
রান্নাঘরের সামনে বাহাদুর ভোলা উনুনে কী একটা করছে! তাল-হারা নর্তকের মতো মাতুল এলোমেলো ঘুরতে লাগলেন, ঘর-বারান্দা, বারান্দা-ঘর। কী করবেন, ভেবে পাচ্ছেন না। বারান্দার চেয়ারে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে বললেন, এ বাড়ি রেখে আর লাভ কী? কে দেখবে? বেচে দেওয়াই ভাল, তুই কী বলিস?
না, এ বাড়ি বেচা চলবে না। আমার মাতামহের স্মৃতি আপনি কার হাতে তুলে দিতে চান?
তুই মাঝে মাঝে এসে দেখবি তো!
আপনার অবর্তমানে এ বাড়িতে এলে আমি কেঁদে ফেলব।
কাঁদবি। কাঁদলে মানুষ পবিত্র হয়। সব অহংকার জল হয়ে ঝরে যায়। তোর কাছে চাবি রইল। আর একটা কাজ সময়মতো করিস, সিন্দুকটা খুলে একবার দেখিস, কী রহস্য আছে।
আপনি পরের বার যখন আসবেন তখন দুজনে একসঙ্গে খুলব। ওর মধ্যে অনেক কিছু আছে। দাদু যেভাবে আগলে আগলে রাখতেন!
আমি আবার কবে আসব তার কি কোনও ঠিক আছে রে?
শ্রাদ্ধশান্তি আপনার কিন্তু এখানেই করা উচিত ছিল।
না রে, আমার মন চাইল না। এখানকার প্রতিবেশীদের আমি সহ্য করতে পারি না, কিছু মনে করিসনি। শ্রাদ্ধ মানেই ভূতভোজন হয়ে যাবে। আমার অন্য প্ল্যান আছে, সাধুসেবা করব। অসাধারণ মৃত্যুর অসাধারণ পারলৌকিক কর্ম। তুই শুনলে আশ্চর্য হবি, তারামায়ের ছবির তলায় দেয়ালে পেনসিল দিয়ে বাবা মৃত্যুর দিন-ক্ষণ-সময় সব লিখে রেখেছিলেন। ঠিক তাই হয়েছে। কী ব্যাপার বল তো? আমার তো সব গুলিয়ে যাচ্ছে রে! সাধনায় মানুষ কী না শক্তি লাভ করে! আমি যদি ওই শক্তির ছিটেফোঁটাও পেতুম! আমি এক কুলাঙ্গার। সংসার, সংসারই আমাকে মেরেছে।
সময় হয়ে আসছে, তাড়াতাড়ি সেরে নিন।
হ্যাঁ, তুই তা হলে এক কাজ করিস, একটা ট্যাক্সি ধরে কাকিমাকে নিয়ে চলে আয়।
বাবার সঙ্গে একবার দেখা করবেন না?
তাও তো বটে! না দেখা করে যাই কী করে? ঠিক আছে তুই যা, আমি আসছি।
মুকু একা চুপ করে বসে আছে। কাকিমা রাস্তার দিকের জানলার একপাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছেন। পথ? পথকেই এবার জীবনের সাথী করতে হবে। সেই কথাই হয়তো ভাবছেন।
মুকু, বাবা কোথায়?
হঠাৎ উঠে ছাদে চলে গেলেন। তোমাদের বাড়ির সুর কেটে গেছে।
তা একটু গেছে। তোমাকে সব বললে বুঝতে পারবে। দাদু হঠাৎ চলে গেলেন। এই ঘরেই। সে। দৃশ্য এখনও ভাসছে চোখের সামনে। প্রফুল্লকাকার অস্বাভাবিক মৃত্যু। কাকিমাকে নিয়ে দুরাত্মাদের টানাহ্যাঁচড়া। বাবার অ্যাকসিডেন্ট। সব সুর হঠাৎ বেসুরো। তুমি বোসো, আমি ছাদে ওঁর সঙ্গে একবার দেখা করে আসি।
আকাশে একটা-দুটো তারা চোখ মেলেছে। পিতৃদেব পায়চারি করছেন। আগেকার মতো সদম্ভে নয়। ভোরের বাতাসের মতো মৃদু চরণে।
ছাদে চলে এসেছেন?
আর তো আমার কিছু করার নেই।
মুকু একা বসে আছে!
সে তো তোমার জন্যে বসে আছে। আমাকে তো তার কোনও প্রয়োজন নেই।
কথাটা আচমকা গুলির মতো বুকে এসে বাজল। ইঙ্গিতটা মোটেই ভাল নয়। মুকু কি এমন কিছু বলেছে! অপমানজনক! আর কোনও তিক্ততার মধ্যে যেতে চাই না। প্রসঙ্গ পালটাই, নীচে চলুন। কাকিমা যাবেন, মামা আসছেন। সময় হয়ে এল।
আমি আর কোনও কিছুর সঙ্গে নিজেকে জড়াতে চাই না। যেখানে শুরু করেছিলুম আবার সেখানেই শেষ করে দিলুম। কারুর কোনও অভিযোগ থাকা উচিত নয়। এবার আমরা যে যার পথে। চলব। জীবনের শেষ যাত্রাপথ নিঃসঙ্গ হওয়াই ভাল।
আমার পথ তা হলে আমিই নির্বাচন করতে পারি। সে স্বাধীনতা তা হলে দিলেন?
অবশ্যই।
তা হলে আপনাকে আমি এই সুযোগে জানিয়ে রাখি, আমি সন্ন্যাস নিয়ে আশ্রমে যোগ দিচ্ছি।
পায়চারি করতে করতে ছাদের দূর কোণে চলে গিয়েছিলেন। ফিরে আসতে আসতে থমকে দাঁড়ালেন, সন্ন্যাস?
আজ্ঞে হ্যাঁ। নিজেকে আমি সেইভাবে প্রস্তুত করে ফেলেছি।
সন্ন্যাস তোমার রক্তে নেই। জোর করে বৈরাগ্য হয় না। সন্ন্যাস আর ডাকাতি একই রকম সাহসের কাজ। একটা এ দিক আর একটা ও দিক। তোমার সে সাহস নেই। তোমাকে আমি যতটা জানি, তুমি তার সিকির সিকিও জানো না। ওই ইচ্ছেটাও তোমার এক ধরনের রোমান্টিসিজম। জীবন যাদের খুব মাপা, তারা সন্ন্যাসী হতে পারে না। বলহীনের দ্বারা কিছুই লাভ করা সম্ভব হয় না। ড্রয়িংরুমে বসে ঈশ্বর লাভ করা যায় না।
