কেন? এখানে থাকার কী অসুবিধে ছিল? এমন নির্ঝঞ্ঝাট বাড়ি আর কোথায় পাবেন? আপনি এখানেই থাকুন কাকিমা। মাঝে মাঝে আমি এসে আপনার সঙ্গে গল্প করে যাব। আপনার হাতের রান্না খেয়ে যাব।
দুটো হাত পুঁটলির ওপর রেখে কাকিমা উদাস চোখে মুকুর দিকে তাকালেন। এমন শূন্য দৃষ্টি আগে কখনও দেখিনি। হয়তো কিছু বলার ছিল, ঠোঁটদুটো অল্প কেঁপে উঠল। কিছু বলতে পারলেন না। জলের ধারা নামল দু’চোখে।
মুকুর মুখ দেখে মনে হল, ভীষণ অস্বস্তিতে পড়েছে। জীবন এখনও যার শুরুই হয়নি, সে ভাঙা জীবনের কথা বুঝবে কী করে? মুকু বসে বসেই আর একটু এগিয়ে গিয়ে কাকিমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বললে, কাঁদছেন কেন? মামাবাবু খুব ভাল মানুষ। মেসোমশাইয়ের মতো গম্ভীর নন। ভীষণ আমুদে। আমরা মাঝে মাঝে আপনাকে দেখতে যাব।
এইসব কথার উত্তরে কাকিমার অনেক কিছু বলার ছিল। আবেগে কণ্ঠরুদ্ধ। সামনের বিমর্ষ পুঁটলিতে জীবনের যৎসামান্য উপকরণ। অনেক কিছুই মনে হয় ফেলে রেখে যেতে হবে। জীবনের প্রয়োজন কত সামান্য।
মুকু, তুমি বোসো, আমি মামার ওখান থেকে চট করে একবার ঘুরে আসি।
আমি যাব তোমার সঙ্গে?
বেশ ভয় পেয়ে গেলুম। মুকু জানে না, আমরা শত্ৰু পরিবৃত হয়ে বসে আছি। প্রায়-সন্ধ্যায় সুন্দরী এক মহিলাকে সাথী করে রাস্তায় বেরোনো, আর নিরস্ত্র সমরাঙ্গনে যাওয়া প্রায় একই ব্যাপার। কায়দা করে বললুম, তুমি এই এলে। কাকিমাও চলে যাবেন। তুমি থাকো, আমি যাব আর আসব।
মুকু চোখের এক ধরনের ভঙ্গি করল, যার অর্থ হতে পারে ভীরু কোথাকার! মুকুর আর আগের সে ভাব নেই। অনেক খোলামেলা, সামান্য চটুলও। স্বাধীনতা পেলে চরিত্রও কেমন পালটে যায়!
রাস্তায় বেরিয়ে মনে হল, সবাই যেন আমার দিকে কোনও একটা প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে আছে, কী। গো, বইটা পেয়েছ তো? তোমার পিতা পড়া শুরু করেছেন? জোড়া জোড়া অসংখ্য চোখের সামনে নিজেকে কেমন যেন অসহায় মনে হতে লাগল। পা পথ ভাঙছে দ্রুত গতিতে। বেশ বুঝতে পারছি, এ পল্লিতে আর বসবাস করা যাবে না। পালাতেই হবে।
নারকেল গাছের তলায় মাতামহের ছোট্ট খুপরিতে মাতুল বসে আছেন বিষণ্ণ বদনে। একমাথা রুক্ষ চুল এলোমেলো। জীবনের মতোই বিপর্যস্ত। মুখে সর্বক্ষণের সেই মধুর হাসিটি নেই। পর্বত তার এতকালের আড়ালটি সরিয়ে নিয়েছে।
উদাস গলায় বললেন, আয়, তোর কথাই ভাবছিলুম, এত দেরি করলি?
একটু দেরি হয়ে গেল। বিশ্রী একটা ব্যাপারে আটকে গিয়েছিলুম।
কী আবার হল?
ধীরে ধীরে সব কথাই বললুম, সব শুনে কেমন যেন হয়ে গেলেন। বললেন, ছি ছি, তোদের পাড়াটা কী হয়ে গেল? বইটা চিঠিটা পোড়ালি কেন? পুলিশের হাতে দেওয়া উচিত ছিল। জানিস তো, কান টানলে মাথা আসে। খুব ভুল করেছিস। মাঝে মাঝে মানুষকে উচিত শিক্ষা দিতে হয়, তা না হলে পেয়ে বসে।
বিমর্ষ ঘরে ধীরে ধীরে সাঁঝের আঁধার ঘিরে আসছে। দাদুর তম্বুরাটি ঘরের কোণে এক পায়ে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে। তারামায়ের ছবিটি একটু হেলে গেছে, আর সেই রহস্যময় সিন্দুক একপাশে। কতকালের স্মৃতি যে ওর মধ্যে জমা আছে। মায়ের চিঠি আছে, ব্যবহার করা জিনিস আছে, গান লেখা খাতা আছে, তন্ত্রসাধনার নানারকম উপকরণ আছে। সিন্দুকটি ছিল মাতামহের প্রাণ। আগলে আগলে রাখতেন, কাউকে স্পর্শ করতে দিতেন না।
মাতুল চৌকি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ঠিক আছে, ভদ্রমহিলাকে আমার সঙ্গেই নিয়ে যাচ্ছি। ওখানে সুখেই থাকবেন। একেবারে অনাথ হয়ে গেলুম রে পিন্টু! যতদিন জীবিত ছিলেন বুঝিনি। কত আঘাত দিয়েছি, অশান্তি করেছি, অনাদরও করেছি। কোনও কিছু আর সংশোধনের উপায় নেই। শিল্পীর কখনও বিয়ে করা উচিত নয়। জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল বিবাহ। সংসার অক্টোপাসের মতো সব সাধনাকে জড়িয়ে ধরতে চায়, ভীরু করে দেয়, ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবায়। কিছু কাজ আছে যা একবার করে ফেললে আর নিষ্কৃতি পাবার উপায় থাকে না, কিছু পথ আছে যে-পথে এগোলে আর ফেরার উপায় থাকে না। তুই আমার ভাগনে, দিদি ছিল আমার মায়ের মতো, তোকে আমি কত ভালবাসি তোর ধারণা নেই। একটা কথা বলে যাই, জীবনকে বেশ বুঝেসুঝে খরচ করিস। নিজেকে চেনা বড় কঠিন, সবসময় গুরুজনের পরামর্শে চলিস। নিজেকে এমন কারুর হাতে সমর্পণ করবি যিনি তোর দেহ-মন বুদ্ধি আত্মা সবকিছু ভোলা বইয়ের মতো পড়তে পারেন।
তার মানে গুরু।
পিতার চেয়ে বড় গুরু আর কেউ নেই রে! আমি যে ভুল করেছি, তুই যেন সে ভুল আর করিসনি। জেনে রাখ ভুলও রক্তের প্রবণতা। ভুল মানুষ করে না, ভুলের বীজই মানুষকে ভুল করায়। আমি নিজের দোষে সব ছারখার করে ফেললুম। আজ আমি প্রবাসী। সংসারের ক্রীতদাস। আমার ডানাদুটো কেটে দিয়েছে ভাগ্য। আর আমি উড়তে পারব না। মুক্ত জীব হয়ে গেলুম বদ্ধ জীব।
কথা বলতে বলতে আমরা ঘরের বাইরে নারকেল গাছের তলায় এসে দাঁড়ালুম। সন্ধের বাতাস লেগেছে পাতায় পাতায়। দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ উঠছে। হঠাৎ যেন চমকে উঠতে হয়। মাতামহ কি এখনও তার প্রিয় জায়গাটিতে বসে আছেন, যেমন বসে থাকতেন গালে হাত দিয়ে। দোতলায় ওঠার নির্জন সিঁড়িটি চোখে পড়ছে। কেউ কোথাও নেই। সরু সরু ঘাসের ডগা উদ্দাম বাতাসে বিরক্ত হচ্ছে। রাতের প্রথম ঝিঁঝিটি যন্ত্রের সুর মেলাচ্ছে।
