আমার তা মনে হয় না। আমার মনে হয়, এর পেছনে ওই মামাশ্বশুরটি আছেন।
তিনি কী কারণে থাকবেন?
তার স্বভাব।
পয়সার তো অভাব নেই? ভাত যখন ছড়াতে পারেন তখন কাকের অভাব হবার তো কথা নয়।
শুনেছি…
যা বলতে চাই, তা গুরুজনের সামনে বলা যায় না।
কী হল, ইতস্তত করছ কেন? সাহস করে বলো। উই আর ফ্রেন্ডস।
আজ্ঞে, কোনও কোনও মানুষ বিশেষ কারণে কোনও কোনও মহিলায় আসক্ত হয়ে পড়তে পারেন, তখন তারা যে-কোনও সীমায় যেতেও পিছপা হন না।
দ্যাটস রাইট। তা হলে চক্রটাকে ভাঙতে হয়।
সে তো আমাদের কাজ নয়। পুলিশের কাজ।
পুলিশ যথেষ্ট ‘ইন্টারেস্ট’ না-ও নিতে পারে।
নিলে না নেবে। আমরা আর কী করতে পারি?
আমরা খোঁচাতে পারি। আমাদের সন্দেহের কথা পুলিশকে জানাতে পারি।
যা গেছে তা গেছে, শুধু শুধু ঘাঁটাঘাঁটি করে লাভ কী? ব্যাপারটা তো খুবই নোংরা।
নোংরামি বলে অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে? ভদ্রলোকদের এই ঠুনকো সেন্টিমেন্ট ক্ষমা করা যায়?
নোংরায় ঢিল ছুড়লে যে নিজেদের মুখে ছিটকে আসবে। অনেক জল ঘোলা হবে।
তোমার মতে আমাদের তা হলে এখন কী করা উচিত?
ওঁকে এখান থেকে কিছুদিনের জন্যে সরিয়ে দেওয়া।
কোথায়?
মামার ওখানে উনি যেতে রাজি হয়েছেন।
আমাকেও সেই কথাই বলছিলেন। হঠাৎ রাজি হবার কারণ?
তা জানি না, জেনেও কাজ নেই। যেতে রাজি হয়েছেন, বাধা না দেওয়াই ভাল। এখানে থাকলে অশান্তি দিনে দিনে বাড়বে।
তা হলে তুমি একবার জয়ের কাছে যাও। আর বেশি সময় নেই। জয় শ্রাদ্ধের কাজটা এখানে করলেই পারত!
এখানে যে কেউ নেই।
ওখানেই বা কে আছে? যাক যা ভাল বুঝছে করুক। আমার আর সেদিন নেই যে জোর করব। সিঁড়িতে চুটুরপুটুর চটির শব্দ হচ্ছে। এই দুঃসময়ে কে আবার আসছেন? বড় সুললিত পদধ্বনি।
১.৬৯ সমুখ দিয়ে স্বপনসম
মেসোমশাই!
দরজার সামনে মুকু। স্বপ্ন দেখছি না তো? মুকু হঠাৎ উড়ে এল নাকি?
মেসোমশাই, আমি আবার এসে গেছি।
পিতা চেয়ারে নড়েচড়ে বসে বললেন, এসো এসো। তোমার বাবা?
বাবা আসেননি।
সেকী! তুমি একা একা এতটা পথ চলে এলে?
আমি কত বড় হয়ে গেছি!
তা হয়েছ, তবু মেয়েদের একটু সাবধানে চলাফেরা করাই ভাল।
আমরা এক দল চলে এসেছি হইহই করে।
মুকু কথা বলতে বলতে পিতৃদেবের পায়ের কাছে থেবড়ে বসে পড়ল।
ওকী, তুমি মেঝেতে বসলে কেন?
আপনার পায়ের কাছে বসতে ইচ্ছে করল। আপনি যদি আমার বাবা হতেন, কী ভালই হত!
পাগলি মেয়ে।
পিতার মুখে পাগলি সম্বোধন এই প্রথম শুনলুম। মুকু দু’হাতে পা স্পর্শ করে মাথায় ঠেকাল। পিতা মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন। মুকু কথার ফাঁকে ফাঁকে, বারকয়েক আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেছে। দুর্দান্ত দেখতে হয়েছে। কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি পরেছে। একই রঙের ব্লাউজ। এলো চুলের গোড়ায় একটি ফিতে বেঁধেছে। রেশমের মতো চুলের গুচ্ছ পিঠের কাছে দুলছে। আরও যেন ফরসা হয়েছে। চোখমুখ আরও ধারালো হয়েছে। একবার তাকালে আধ্যাত্মিক শক্তির বলে মনকে ভগবতমুখী করে, কষ্টে চোখ ফেরাতে হয়। ফিরিয়ে নিলেও নিবে-যাওয়া ধূপের ধোঁয়ার মতো অনেকক্ষণ ভাসতে থাকে। বুকে বড় কষ্ট হয়।
হঠাৎ তুমি চলে এলে?
আবার পড়তে এলুম।
তোমার জিনিসপত্তর?
হস্টেলে।
ও তুমি হস্টেলে থাকবে! কেন, এখানে অসুবিধে আছে?
মুকু মাথা ঝাঁকিয়ে বললে, না না, অসুবিধে কীসের! একসঙ্গে কয়েকজন থাকব বলেই হস্টেলে থাকা।
ভালই করেছ। পুরো সময়টাই পড়াশোনায় দিতে পারবে।
কেমন আছেন আপনি? একটু রোগা হয়ে গেছেন।
বেশ বড় রকমের একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। এক মাস বিছানায় পড়ে ছিলুম।
কী হয়েছিল? অ্যা
সিডে পুড়ে গিয়েছিলুম।
আপনার খুব দুর্ঘটনা হয়, কেন বলুন তো?
প্রারব্ধ ক্ষয় করছি মা।
কাকিমা নেই?
হ্যাঁ আছে, ভেতরে আছে।
মুকু ভেতরে যাবার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ইশারায় আমাকে ডেকে গেল। বেশ সাহস বেড়েছে। সেই চাপা ভাবটা আর নেই। পিতা বললেন, তুমি কিন্তু আর বেশি দেরি কোরো না। জয়কে গিয়ে খবরটা আগে জানিয়ে রাখো।
কাকিমা একটি ছোট পুঁটলি তৈরি করেছেন। দেখে মনে হচ্ছে যাবার জন্যে প্রস্তুত। হাত দুয়েক দূরে মুকু থমকে দাঁড়িয়ে আছে। এখনও মনে হয় ধরতে পারেনি, মহিলার জীবনে কী পরিবর্তন ঘটে গেছে। হয়তো লক্ষই করেনি, শাড়ির জমি কেন সাদা! সিঁথিতে সিঁদুর আছে না মুছে গেছে! আমি আসার আগে মুকু কি কোনও প্রশ্ন করেছিল?
মুকু অবাক হয়ে আমাকে প্রশ্ন করলে, কী হয়েছে?
এক কথায় এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া কি সম্ভব! অতীত থেকে ফিরে আসতে হবে বর্তমানে। সে তো অনেক সময়ের ব্যাপার। তা ছাড়া এই মহিলা সম্পর্কে আমার আর কিছু বলার নেই। সমস্ত পরিস্থিতিটাকে ভদ্রমহিলা এমন ঘোলাটে করে তুলেছেন! পুরো পরিবারের মানসম্মান ডুবে যাবে।
বললুম, কাকাবাবু হঠাৎ মারা গেছেন। ইনি আজই চলে যাবেন।
তোমাদের ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে দেখছি।
মুকু এগিয়ে গিয়ে কাকিমার পুঁটলির সামনে উবু হয়ে বসল। কাকিমা কেমন যেন দিশাহারা, অন্যমনস্ক। নৌকোর হাল ভেঙে গেলে তার আর চালচলনের তেমন ঠিক থাকে না। গাছের মতো। শিকড় নাড়ানাড়ি হলে মুষড়ে পড়বেই।
মুকু বললে, আপনি কোথায় যাবেন? বাপের বাড়ি?
কাকিমা নীরব। একবার চোখ তুলে তাকিয়েই চোখ নামালেন। মুকুর প্রশ্নের উত্তর আমাকেই দিতে হল, কাকিমার কেউ কোথাও নেই। উনি আজই আমার মামার সঙ্গে বাইরে চলে যেতে চাইছেন।
