এই চিঠি, ওই বই, এই মহিলা, সেই দুষ্ট প্রতিবেশী আমার মনেও কদর্য ভাব ঢুকিয়ে ছেড়েছেন। একেই বলে দ্রব্যগুণ। পেঁয়াজের সংস্পর্শে গন্ধ ধরবেই। চকিতে মনে উঁকি মেরে গেল, হলেও হতে পারে। নারী আর পুরুষের সম্পর্ক অনেকটা ঘৃত আর অগ্নির মতো। যিনি এই কয়েক মাসে সদ্গুরু সঙ্গ প্রায় মুখস্থ করে ফেললেন তার তো জানা উচিত, নারী কী বস্তু। গোস্বামীজি স্পষ্ট বলছেন, স্ত্রী-দেহ এমনই উপাদানে গঠিত যে, নির্বিকার পুরুষের শরীরকেও তা আকর্ষণ করে। ইহা বস্তু-গুণ। অর্থ ও স্ত্রীলোক বড়ই ভয়ানক।
যে-বস্তু পুড়ে ছাই হচ্ছে, তার নাম তো এই মহিলাকে বলা চলে না। ওই গ্রন্থ আজ পর্যন্ত আমার খুলে দেখার সাহস হয়নি। না হলেও, ওই জ্ঞান শাস্ত্র পড়ে লাভ করার প্রয়োজন হয় না। রক্তে আছে। যত দিন যায় তত স্পষ্ট হয়, ততই প্রত্যক্ষ হয়। ধমনীতে ধমনীতে আর্তনাদ করে, আমি চাই, আমি চাই।
নির্বিকার গলায় বললুম, আগুন লাগার ভয় নেই। কিছু কাগজ পুড়ছে।
তোমাকে ডাকছেন।
যাচ্ছি।
উনুনের মুখে একটা লোহার ঢাকনা টেনে দিলুম। দেহবিজ্ঞান ছাই হয়ে গেল। ইন্দ্রিয় কিন্তু রয়েই গেল। সাংঘাতিক এক ইঙ্গিত চেতনাকে জাগিয়ে দিয়েছে। আমি আর ভাল করে কারুর দিকেই তাকাতে পারব না। কেবলই মনে হবে, হলেও হতে পারে। মানুষের পক্ষে সবই যে সম্ভব?
পিতৃদেবের মুখে একটা বিষণ্ণ ছায়া নেমেছে। বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। বহু দূর থেকে বললেন, বোসো, তোমার সঙ্গে পরামর্শ আছে। ক’টা বাজল?
সাড়ে চারটে।
জয়ের ট্রেন কটায়?
আটটা কি সাড়ে আটটা হবে। আমার সঠিক সময়টা জানা নেই।
যাই হোক এখনও সময় আছে। শোনো, এ পাড়ায় আমাদের অনেক শত্রু আছে। থাকাটাই স্বাভাবিক। বাঙালির স্বভাব তোমার অজানা নয়। আমরা কারুর সঙ্গে বড় একটা মিশি না। আমাদেরও এক ধরনের উন্নাসিকতা আছে। নিজেদের বড় বেশি শ্রেষ্ঠ ভাবি। নেকড়ের মতো মানুষও সমাজবদ্ধ জীব। সমাজচ্যুতকে কামড় খেতেই হবে। আমি প্রস্তুত। তবে আমি আর লড়াইয়ে অকারণ শক্তিক্ষয় করতে চাই না। আমার সব শক্তিকে এখন অন্য কাজে লাগাতে হবে। দিন শেষ হয়ে আসছে, কাজের কাজ এখনও কিছুই করা হল না। ঝুলিতে কিছুই তেমন ভরা হয়নি, একেবারেই শূন্য। কিছু না নিয়ে, ম্লান মুখে আমি যাই কী করে! তুমি পবিত্র কোরান পাঠ করেছ?
আজ্ঞে না, আমার পড়াশোনা খুবই কম।
সময় পেলে পড়ে দেখো। তোমাকে আজ একটা কথা বলে রাখি, পরে আর হয়তো সময় পাব না। পৃথিবীতে আমাদের থাকার সময় বড় কম। এক জীবনে সব করে ওঠা যায় না। এলোমেলো পড়াশোনার কোনও দাম নেই। একটা ধারা ঠিক করে নিতে হয়। সেই জিনিসই পড়বে যা তোমাকে পজেটিভ কিছু দিতে পারে, তোমার সামনে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে, ধীরে ধীরে তোমার শূন্যতায় পূর্ণতা আনতে পারে। জগৎটাকে টুকরো টুকরো করে দেখো না! সব এক। সব মানুষ এক, সব ধর্ম এক, সব অনুভূতির উৎসও এক। কোরান কী বলছেন জানো, যে-ব্যক্তি পরলোকে ফসল কামনা করে আমি তার জন্যে পরলোকের ফসল বর্ধিত করে দিই। যে-কেউ ইহলোকের ফসল কামনা করে আমি তাকে তারই কিছু দিই। পরলোকে এদের জন্যে আর কিছুই থাকবে না। তোমাদের যা কিছু দেওয়া হয়েছে তা পার্থিব জীবনের ভোগ, কিন্তু আল্লাহর কাছে যা আছে তা উত্তম ও স্থায়ী। বিশ্বাসীরা কিয়ামতের দিন বলবে, ক্ষতিগ্রস্ত তারাই যারা নিজেদের ও নিজেদের পরিজনবর্গের ক্ষতিসাধন করেছে। শোনো, আমি আমার হঠকারিতা দিয়ে তোমাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে চাই না। আমি পণ্ডিতের সঙ্গে পাণ্ডিত্য দিয়ে লড়তে পারি, অহংকারীর সঙ্গে লড়তে পারি অহংকার দিয়ে, অভিমানীর সঙ্গে অভিমান দিয়ে। অন্ধকারের সঙ্গে অন্ধকার দিয়ে লড়ার ক্ষমতা আমার নেই। আমার ভেতরে কোথাও একটা ছোট্ট শিখা জ্বলে উঠেছে। সেই শিখাঁটিকে সাবধানে আগলাতে হবে, বাড়াতে হবে। নিবে গেলে, আমার আর কিছুই থাকবে না।
হঠাৎ থেমে পড়লেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, এক গেলাস জল পেলে হত। আজকাল গলাটা বড় শুকিয়ে যায়। অ্যাসিডে বুকটা আমার ঝাঁঝরা করে দিয়েছে।
আমি জল এনে দিচ্ছি।
উদাস সুরে বললেন, দেবে দাও। বয়েসটা সত্যিই বাড়ছে। আগে অন প্রিনসিপল কাউকে কখনও হুকুম করিনি।
তাতে কী হয়েছে?
না না, মানুষের একটা আদর্শ নিয়েই চলা ভাল, অন্তত চেষ্টা করা উচিত।
এক গেলাস জল এনে হাতে দিলুম। গেলাসটা আলোর দিকে তুলে জলটা ভাল করে দেখতে দেখতে বললেন, এই দেখো, কী সব ভাসছে।
কী ভাসছে? আশ্চর্য হয়ে গেলাসটা হাতে নিলুম। জল গড়িয়েই নিয়ে চলে এসেছি। তেমন খুঁটিয়ে দেখিনি। সত্যিই গুঁড়ো গুঁড়ো কী সব ভাসছে।
আমি পালটে আনছি।
কী বুঝলে?
আজ্ঞে?
স্নেহের বড়ই অভাব। বলো ঠিক কি না! আমি একজন ‘পারফেকশনিস্ট’ পিন্টু, আর সেইটাই আমার চরিত্রের মহা দোষ। আর একটা শিক্ষা কী হল বলল তো?
আজ্ঞে?
ব্রত ভঙ্গ করলে হতাশ হতেই হবে।
আমারই অপরাধ। আমি এখুনি আনছি পরিষ্কার জল।
জল খেয়ে গেলাসের গায়ের জল কেঁচার খুঁটে মুছে টেবিলে সাবধানে রাখলেন। কত সাবধানী। জলের দাগে টেবিলের পালিশ নষ্ট হতে পারে। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার সময় নষ্ট করে দিচ্ছি না তো!
আজ্ঞে না, আমার আবার সময়ের দাম কী?
তা হলে বোসো। তোমার আর পাঁচ মিনিট সময় নিই। আমার একটা আশঙ্কা হচ্ছে বুঝলে? আর সেটা উড়িয়ে দেবার মতো নয়। যে-চক্রান্ত প্রফুল্লকে পৃথিবী থেকে সরিয়েছে, সেই চক্রান্ত এবার আমাদের চারপাশে তার জাল বিস্তার করছে। এই মহিলাকে তারা সহজে ছাড়বে না। এমনও হতে পারে এই মহিলা হয়তো তাদেরই একজন। তোমার কী মনে হয়?
