নীচের ওই ঘরে ঢুকতে ইদানীং আমার ভীষণ ভয় করে। মনে হয় হাঙরের মতো এখুনি আমাকে আবার মুখে পুরে ফেলবে। অতীত ফিরে আসবে অনুশোচনা নিয়ে। প্রায়ান্ধকার ঘর থেকে একটা ফোঁসফোঁস শব্দ আসছে। দরজার কাছ থেকে খুব মৃদু সুরে ডাকলুম, কাকিমা! কোনও সাড়া পেলুম না। ফোঁসফোঁসানিটা সামান্য কমে এল।
আবার ডাকলুম, কাকিমা।
এবারে চাপা গলায় উত্তর এল, এসো।
নিরাভরণ ঘরে দেয়ালের দিকে মুখ করে চোখে আঁচল চাপা দিয়ে ভদ্রমহিলা বসে আছেন। নোনা-ধরা ড্যাম্প ঘরের চারপাশ থেকে হিলহিল করে উঠছে মৃত্যুর শীতল নিশ্বাস। অনেকদিন আগে বোতলে একটা পাথরকুচি গাছ রেখেছিলুম। একদিন নির্জন দুপুরে বোতলটার দিকে তাকিয়ে ভয়ে আঁতকে উঠলুম। নীলচে সবুজ জলে, জালি জালি অসংখ্য সাদা সাদা শিকড় জীবন্ত প্রাণীর মতো, অক্টোপাসের মতো কী যেন খুঁজছে। মনে হল কাঁচের আবরণের বাধা না থাকলে, আমাকেই জড়িয়ে ধরতে পারে। এই ঘরেও দৃষ্টিকে আমি তেমনভাবে চারপাশে ফেরাতে পারি না। ভয় করে। চারপাশে ঝুলে আছে আমার কৃতকর্মের সরু সরু কীট।
সেই রাতে আমি যতটা কাছে যেতে পেরেছিলুম, আজ আর তা পারলুম না। চিরকালের জন্যে মনে পাপ ঢুকে গেছে। মন অপরিষ্কার হয়ে গেলে মানুষ কেঁচোর মতো গুটিয়ে যায়। বেশ কিছুটা দূর থেকে বললুম, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।
চোখ থেকে আঁচল সরিয়ে কাকিমা আমার দিকে ফিরে তাকালেন। চোখের বড় বড় পাতা জলে ভিজে ভারী হয়ে ঝুলে আছে। গালে এক বিন্দু পলাতক জল টলটল করছে। এই কি বিধবা হবার বয়েস! কথাটা মনে হওয়ামাত্রই চমকে উঠলুম। এ আমি কী ভাবছি?
কাকিমা ধরাধরা গলায় বললেন, তুমি তো কোনও অন্যায় করোনি। ঠিকই করেছ। আমার বোকামি এখন আমি বুঝতে পেরেছি। পর কখনও আপন হয় না, পিন্টু। তুমি ঠিক করেছ, ঠিক করেছ।
ঠিক করেছ ঠিক করেছ বলতে বলতে কান্নায় গলা ভেঙে এল। এখন তো আমার আর কিছু করার নেই। ছোঁড়া পাথর, ওলটানো দুধ আর বলা কথা, কোনও ভাবেই ফিরিয়ে আনা যায় না। আর কাছের মানুষ নই, দূরের মানুষের মতোই বললুম, আমার ভীষণ অন্যায় হয়ে গেছে, ওপরে চলুন।
কান্না সামলে কাকিমা বললেন, পিন্টু, তুমি আমার একটা উপকার করবে?
বলুন, সম্ভব হলে নিশ্চয় করব।
মামাবাবু আজ রাতে চলে যাচ্ছেন, ওঁর সঙ্গে তোমরা আমার যাবার ব্যবস্থা করে দাও। তখন আমি না বলেছিলুম, এখন আমি হা বলছি। আমাকে কোথাও একটা যেতেই হবে। এখানে সত্যিই আর থাকা যায় না। আমি বুঝতে পেরেছি, কী থেকে কী হয়ে যাবে কেউ বলতে পারে না। আমি বড় খারাপ মানুষের বউ ছিলুম। আশেপাশে এমন একজন কেউ ঘুরছে, যে আমাকে সুখে থাকতে দেবে না। আমাকে কোথাও একটা যেতেই হবে।
এসব কথা আপনি আমাকে না বলে, ওপরে এসে বাবাকে বলুন। আমি কে?
উত্তরে কোথা থেকে আবার একটু রাগের ঘেঁয়া এসে গেল। মেয়েদের চরিত্রটাই এইরকম। এক ইঞ্চি পেলে, এক বিঘত চাইবে। ক্ষমা চাইলুম, তাতে হল না, অন্যায় হয়ে গেছে বললুম, তাতেও হল না। যাঁর কেউ নেই, তার এত অভিমান সাজে না। কীসের অভিমান! কার ওপর অভিমান? পত্রশূন্য বৃক্ষের ছায়ার অভিমান!
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে মনে হল, আমি হয় দেবতা, না হয় শয়তান! যতদিন মোহ ছিল, ততদিন আকর্ষণ ছিল। এখন শুধু পড়ে আছে ঘৃণা। আমার দ্বিতীয় কাজটি এবার করা যাক। কে থাকবেন আর কে যাবেন আমার জানার প্রয়োজন নেই। এ সংসার ভেঙেই আছে। দু’-একটি উটকো পাখি মাঝেমধ্যে উড়ে এসে গান শুনিয়ে যায়, তাকে বসন্ত বলে ভুল কোরো না মন!
গিধঘোড় বইটার প্রথম মলাটের তলায় একটা চিঠি। মহামান্য হরিশঙ্করবাবু, অনেকদিন সব ভুলেটুলে গেছেন। আবার নতুন করে যখন শুরু করলেন, বইটা যথেষ্ট সাহায্য করবে। আপনি জ্ঞানী মানুষ। চরিত্রের অহংকারে মাথা উঁচু করে চলেন। দ্বিতীয় পক্ষের প্রস্তাব ঝাটা মেরে উড়িয়ে দেন। তা মুনিদেরও তো মতিভ্রম হয়। নিজে কিনতে লজ্জা পাবেন ভেবে আমরা যৌতুক পাঠালুম। যে বউভাত হল না, মনে করুন এটি সেই বউভাতেরই উপহার। খাওয়াটা পাওনা রইল মাইরি। অন্নপ্রাশনে যেন বাদ না পড়ি। বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখি। ইতি জনৈক শুভাকাঙ্ক্ষী।
আগুন আর বাইরে জ্বলবে কী! আগুন আমার ভেতরে জ্বলছে। আমি যদি পিতৃদেব হতুম, তা হলে চারপাশে চার জোড়া নহবত বসিয়ে, আকাশে তারাবাজির লহর তুলে, সকলের চোখের সামনে ওই মহিলাকে বিবাহ করতুম। কেন, বাংলার শ্রেষ্ঠ পুরুষ বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ প্রথা চালু করে যাননি! তিনি তা পারবেন না। অন্য জাতের মানুষ। অন্তরে যাঁর সন্ন্যাস তার চিন্তায় এসব কখনও আসবে না। এ পল্লিতে আমাদের আর থাকা উচিত হবে না। আমাদের প্রচ্ছন্ন অহংকার আর আভিজাত্য এতকাল যেসব শত্রু তৈরি করেছে তারা এইবার সুযোগ নেবে। এই হল প্রথম আঘাত। এরপর একে একে আসবে।
চিঠি সমেত যৌনবিজ্ঞানকে কেরোসিন-স্নাত করে আগুনে সমর্পণ করামাত্রই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। শিখায় শিখায় সঙ্ঘর্ষে একটা অট্টহাসির মতো শব্দ উঠছে। এ হাসি আমার পিতার পূত চরিত্রের, না নোংরা প্রতিবেশীদের!
মোটা বই পুড়তে বেশ সময় নিল। রান্নাঘর ধোঁয়ায় ভরে গেছে। প্রেতিনীর চুলের মতো ধোঁয়া ভেতরের ছাদে পাক খাচ্ছে। ডাইনির নৃত্য। চোখ জ্বালা করছে। পেছন থেকে ধরাগলায় কাকিমা বললেন, একী, এ আবার তুমি কী করছ? এখুনি যে অগ্নিকাণ্ড হয়ে যাবে!
