শুনতে পারি?
পারেন। তিনি বললেন, পলাশ, তোমার বাবা এটা কী করলেন, আমার মেয়ে ইললিগ্যাল একজন শাশুড়ি নিয়ে কীভাবে ঘর করবে! আমাদের একটা নিখুঁত বংশের ধারা আছে।
ইজ ইট? এই কথা বলেছে? অল রাইট।
পিতৃদেবের চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। কিছু কথা থাকে যা শত চেষ্টাতেও চাপা যায় না। ঠেলে বেরিয়ে আসে, একটার পেছনে আর একটা। এই মুহূর্তে নিজেকে আমার পিতার চেয়েও মহান মনে হচ্ছে। আমি ইস্পাত, উনি খাগড়া। আমার ধারে উড়ে গেলেন।
আচ্ছা, পুরো ব্যাপারটা আমি একটু খতিয়ে দেখি। বিবেকের কাছে সারেন্ডার করব, না জনসাধারণের কাছে!
সদর থেকে হাক এল, চিঠি আছে, পার্সেল।
ধীরে ধীরে নীচে নেমে গেলুম। বারান্দায় পিতৃদেব দাঁড়িয়ে আছেন, উদাসমুখে, আকাশের দিকে তাকিয়ে। পাশ থেকে দেখলে মনে হবে খোদাই করা পাথরের মূর্তি। কাকিমা যেন দম দেওয়া পুতুল। শাড়িটা রেখে ড্রয়ার বন্ধ করলেন। ঢিস করে একটা শব্দ হল।
বেশ মোটা একটা প্যাকেট। পিতার নামে এসেছে। রেজিস্টার্ড পার্সেল। ফর দিয়ে সই করে নিলুম। মনে হচ্ছে একটা বই আছে। হঠাৎ বই এল কোথা থেকে?
বইয়ের প্যাকেট হাতে তিনি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন সেইখানে গিয়ে বললুম, আপনার নামে একটা বই এসেছে। আকাশের দিক থেকে তার চোখ ফিরল না। এক ঝাঁক পায়রা উড়ছে চিকচিক করে। সুদূর থেকে ভেসে এল তার গলা, খুলে দেখো। বই আবার কে পাঠালে?
১.৬৮ যে সুরে বাজাই বেসুর লাগে
পরতে পরতে কাগজ জড়ানো পার্সেল খুলতে একটু সময় লাগল। বই। বেশ স্বাস্থ্যবান। প্রথমেই যে-দিকটা বেরুল, সেটা মলাটের পেছন দিক। হঠাৎ কে আবার বই পাঠালেন! বইটা ওলটাতেই মনে হল আমি আচমকা একটা গুলি খেলুম। সরাসরি একেবারে বুকে। জিভে তামাটে স্বাদ। পা দুটো থিরথির করে কাঁপছে। বরফশীতল সরীসৃপ পা বেয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বুকের দিকে উঠে আসছে। সামনে আয়না থাকলে দেখতে পেতুম, আমার মুখ নীল হয়ে গেছে। শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে। বইটাকে কোনওরকমে উপুড় করে রেখে, প্রায় মাতালের মতো টলতে টলতে নিজের ঘরে ঢুকে খাটে বসে পড়লুম।
সামলাতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। ছি ছি, ভাবা যায় না। এ কার কাজ! তাকে হাতের কাছে পেলে, খুন করে জেলে যেতেও রাজি ছিলুম। পিতাকে এভাবে অপমান করার শোধ তুলতুম। মানুষের ভেতরে ভেতরে কত বড় বড় পয়ঃপ্রণালী চাপা আছে? ওপর দেখলে বোঝা যায় না। হাসছে। জোড় হাতে নমস্কার করছে। সহৃদয়তায় গলে পড়ছে। দেখা হলেই, কী কেমন আছেন, বলে দাঁত বের করছেন। বিজয়ায় কোলাকুলির ঘটা। পিতৃদেব সেই কারণেই মাঝেমধ্যে বাথরুমে। গেয়ে ওঠেন, জগতে তোক চেনা ভার মুখ দেখে। মুখে সবাই পরম বন্ধু, হৃদয় ভরা বিষ। এই। পৃথিবীর সব ভাল, বৃক্ষ, লতা, স্রোতস্বতী, আকাশ বাতাস, সব ভাল। কুৎসিত হল মানুষ! বাঁদর যে। আমাদের পূর্বপুরুষ! কেমন করে ভোলা যায় আমাদের সেই সলাঙ্গুল অতীতকে। একটু আগে আমিই বা কী করে এলুম! নিঃসঙ্গ পবিত্র এক যোদ্ধাকে অহংকারের বল্লম দিয়ে খোঁচা মেরে এলুম। আমি এক মূর্খ।
পিতা বারান্দায় সেই একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে যেন বয়ে চলেছে দিকহীন জীবনের নদী, যার পরপার ঝাঁপসা অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন। পায়ে হাত রেখে প্রণাম করায় চমকে উঠলেন, কে? হঠাৎ কী হল তোমার?
আমায় ক্ষমা করুন।
সন্তান তো সবসময় ক্ষমার স্রোতেই ভাসছে। পিতার অপরাধের ক্ষমা কোথায়?
আপনার কোনও অপরাধ নেই। কোন সমাজে আমরা বাস করছি আমার জানা ছিল না। ওই দেখুন, কী বিশ্রী নোংরা এক বই পাঠিয়েছে অদৃশ্য কোনও এক প্রেরক।
আমি অনুমান করেছিলুম। একটি মহাপুরুষ বাক্য তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, যব হাতি চলে বাজার, তো কুত্তা ফুকে হাজার। ও নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। মানুষকে এই ভাবেই এগিয়ে যেতে হবে বন্ধুর পথে, ডোন্ট ফ্লিকার মাই বয়। ন্যায়কে অন্যায় কোনও দিনই পরাস্ত করতে পারে না, কোনওদিন পারেওনি, থমকে দিতে পারে। যাও, কেরোসিনে চুবিয়ে বইটাকে উনুনে ফেলে দাও। তুমি আমার বন্ধু। সমালোচনার অধিকার তোমার আছে। সংশোধনের প্রয়োজন থাকলে নিজেকে সংশোধন করার উদারতা যেন আমার থাকে। মৃত্যুর আর এক নাম ‘রিজিডিটি’, জীবনের আর এক নাম ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’। পিন্টু, লেট আস লাভ লাইফ, নট ডেথ।
কুৎসিত কদর্য বইটা যত তাড়াতাড়ি পুড়িয়ে ফেলা যায় ততই ভাল। আর এক মুহূর্ত ফেলে রাখা উচিত হবে না। তার আগে আর একটা কাজ বাকি। কাকিমার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। বড় অন্যায় করে ফেলেছি। মহিলার সব গেছে, আছে শুদ্ধ জীবনের সামান্য আশা। কে না বাঁচতে চায়! ফুটপাথে সারারাত ভেঁড়া কাপড় জড়িয়ে যে পড়ে আছে, তার সামনে মৃত্যু এসে দাঁড়ালে সেও একটু সময় চেয়ে নেবে। রোজ সকালে সূর্যোদয়ের দিকে তাকিয়ে সে-ও মনে মনে ভাবে, হয়তো আমারও দিন আসবে, দেখি না আর একটু অপেক্ষা করে।
মহিলা ওপরের কোনও ঘরেই নেই। কোথায় গেলেন? নীচে! সেই বিমর্ষ, মৃত্যু-শীতল কোটরে যেখানে উচ্চুঙ্খল, আশাহত একটি মানুষের প্রেত নিঃশব্দে জীবনকে গ্রাসের অপেক্ষায় আছে। একী? সেই চাবির থোলোটা ড্রয়ারের মাথায় পড়ে আছে, যেটা একটু আগেও কাকিমার আঁচলে ছিল। এবার যদি আমার চোখে জল এসে থাকে, সে কি আমার দুর্বলতা, আমার কোমলতা! সংসার আমার জন্যে নয়। এ বড় করুণ স্থান। প্রতি মুহূর্তেই কাঁচের ফলার ওপর দিয়ে রক্তাক্ত হতে হতে হাঁটা।
