বয়স্ক পুরুষদের দেখেছি অন্তঃপুরে ঢোকার সময় গলায় এক ধরনের শব্দ করেন, যা কাশিও নয়, চাপা হাঁচিও নয়। ছোট মাছের কাঁটা গলায় বিধে গেলে আমরা ওইরকম শব্দ করি। সঙ্গে সঙ্গে মহিলারা সচেতন হয়ে বক্ষদেশে আঁচল তুলে দেন। কাপড় গুছিয়ে নেন। ব্যতিক্রম স্থূলাঙ্গী মহিলারা। মেদ বিপরীত লিঙ্গিদের কেমন যেন উদম, উদাস করে রাখে।
গলার শব্দে মায়া সচেতন হল না। চেনা মানুষ আর ছাগলে তেমন উনিশ-বিশ নেই বলেই মনে হয়। সলতে পাক খেয়ে উপদখণ্ডের ছায়ায়, সুন্দরী এ কী করলে বলে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ছে। মুখ হয়ে উঠেছে মেঘৈমেদুরম্বরং-এর মতো। একেই কি বলে, কশ্চিৎ কান্তাবিরহগুরুণা!
আমি এলুম।
সে তো দেখতেই পাচ্ছি।
রামগডুরের ছানার মতো, রামলীলার প্যান্ট পরা, খড়ের সোঁটা ন্যাজ ওঁচানো হনুমানের মতো, অশোককাননে নির্বাসিতা সীতার সামনে শিশি হাতে দণ্ডবৎ। বসতে বলছে না। অভিমান হয়েছে। হাম্বীর রাগে মাতুলের শেখানো সেই সংগীতের দু’চরণ গাইব নাকি, জানি না মানিনী, তড়াক, সম-এ এসে পড়লুম, কেন এ অভিমান, ফাঁক। তেটে ধিন ধিন তা, কৎ ধাগেনাগে, ধাগেনাগে, ধেরে কেটে, মেরে ধরে। জানি না মানিনী।
বসতে পারো।
বসতে তো পারি। বসার লোভে প্রাণ মৎস্যাশী হুলোর মতো ছোঁক ঘেঁক করছে। উচিত হবে কি। মায়া যে বিধাতার উদ্যানের প্রথম আপেলে এখনও কামড় লাগায়নি। যে-ভঙ্গিতে ছিল সেই ভঙ্গিতেই বসে আছে। তা ছাড়া এমন একটি কর্ম করে বসল যাতে হৃদয় হোঁচট খায়। এক ফোঁটা তেল দিয়ে মসৃণ ত্বককে মেজে ঘষে পলতে-বিলাসী করে ফেলার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ভয়ে ভয়ে যতটা সম্ভব দূরে বসলুম। বসতে-না বসতেই কাঁঠালতলার ছাগলটা ব্যাঅ্যা করে ডেকে জানিয়ে দিলে, তুমিও এক বলির পাঁটা। ব্যাটা জ্ঞানপাপী হাজার বার পড়েছিস, পঞ্চভূতের ফাঁদে পড়ে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ কাঁদে। পৃথিবীটা যদি আমাদের দু’জনের হত, তা হলে কথা ছিল না। হঠাৎ যদি সন্ন্যাসিনী পিসি ডোবার ধার থেকে চ্যালা কাঠ হাতে তেড়ে আসেন। মানুষের মুখে পাপের ছায়া ইংরেজি সিক্সও ক্লক শেডের মতো ঘনিয়ে আসে। বোঝা যায় সুবোধ বালক মনে মনে পাঁয়তাড়া কষছে।
এই যে তোমার কালি।
ফেলে দাও।
শুধু শুধু রাগ করছ। জানো আমার কী হয়েছিল! অসুখে কাত হয়ে বিছানায় পড়েছিলুম তিন দিন। একবার খবর নিয়েছিলে?
তোমার খবর নেবার উপায় আমার আছে? তুমি না এলে জানব কী করে?
তা অবশ্য ঠিক। মা কোথায়?
ছেলে কম সেয়ানা নয়। মা শব্দটি এমন মিঠে করে উচ্চারণ করলুম, যেন আমার মা। দেখতে না পেয়ে গলা শুকিয়ে গেছে! ওঁয়া ওঁয়া করে উঠল বলে! আসলে ভয়ে মরছি। এ বাড়ির শাসন, অনুশাসন কোনওটাই তেমন জানা নেই। মায়া বললে, পিসিমা আর দিদি হালিশহর গেছে, ফিরতে রাত হবে।
ভেতরে ব্যাং লাফাল। একা। আমরা দু’জন। মনের কোণে কে যেন হালুম করে উঠল। আমি নই। আমি যে পবিত্র গঙ্গার জল। পাপ ধোয়া তুলসী পাতা। মায়ার সলতে পাকানো শেষ হয়ে গেল। পা ঢেকে বললে, তোমার মুখটা খুব শুকিয়ে গেছে। আমার কাছে দিন কতক থাকলে দুধ খাইয়ে মোটা করে দিতুম।
কীসের দুধ?
ফস করে বেরিয়ে গেছে। জিভ কাটলুম। মায়া কিছুই মনে করেনি। এ হল চরিত্রের ওপর সুখেনের প্রভাব! পিতা ঠিকই বলেন, সঙ্গদোষেই ভুজঙ্গ! প্রশ্নটা তেমন নিরীহ নয়।
[ওহে বর্ণচোরা আম! বেশি অশ্লীলতা করলে কান ধরে উপন্যাস থেকে বার করে দোব। বেশ পেকেছ। মনটাকে মানুষ করো। অবাক হবার কিছু নেই। এ কণ্ঠস্বর আমার। রাশ আলগা হয়েছে ভেবে কাটা ঘুড়ির মতো চেত্তা খেয়ো না, টানতে কতক্ষণ। জীবন একটা আধার। ধরলে অমৃত ধরা যায়, আবার বিষপাত্র হয়ে মৃত্যুকেও ডেকে আনা যায়। তুমি অমৃতের পুত্র হবে, না পুতনার স্তন! মনে মনে তিনবার বীজমন্ত্র জপ করে নাও। জিহ্বা শুদ্ধ হোক।
Truth never come where lust
and fame and greed
of gain reside. No man who
thinks of woman
As his wife can ever perfect be
Nor he who owns however little
nor he
Whom anger chains can ever pass
through Maya’s gates
so give these up, Sannyasm bold
Say Om Sat Om.
সন্ন্যাসীর গীত তোমাকে শুনিয়ে দিলুম। এই মায়া, আর ওই মায়ায় বিশেষ তফাত নেই। তা হলে আরও শোনো, আমেরিকায় তাহার প্রলোভন কম হয় নাই। কাহার? স্বামী বিবেকানন্দের। তুমি অবশ্য তাহার একগাছা কেশেরও যোগ্য নহ। একে জগদব্যাপী প্রতিষ্ঠা; তাহাতে সর্বদাই পরমাসুন্দরী উচ্চবংশীয়া সুশিক্ষিত মহিলাগণ আসিয়া আলাপ ও সেবা করিতেন। তাঁহার এত মোহিনী শক্তি যে, তাহাদের মধ্যে অনেকে তাহাকে বিবাহ করিতে চাহিতেন। একজন অতি ধনাচ্যের কন্যা সত্য সত্য একদিন আসিয়া তাহাকে বলিয়াছিলেন, স্বামী! আমার সর্বস্ব ও আমাকে আপনাকে সমর্পণ করিলাম। স্বামী তদুত্তরে বলিলেন, ‘ভদ্রে! আমি সন্ন্যাসী। আমার বিবাহ করিতে নাই। সকল স্ত্রীলোক আমার মাতৃস্বরূপা!’ তুই হলে কী করতিস ব্যাটা! তেত্রিশটা বউ নিয়ে লোটাকম্বল ফেলে, ন্যাজেগোবরে হয়ে বসে থাকতিস স্বামী পিনখাড়ানন্দ।]
মায়ার লম্বা ডান হাত আমার মুখের দিকে এগিয়ে আসছে। সরু সরু আঙুল। ওপর হাতে লাল সুতো দিয়ে একটা তাবিজ বাঁধা। ওই সর্বনেশে হাত আমার আমসির মতো গাল টিপতে আসছে। ওম তৎসৎ, ওম তৎসৎ! দু’আঙুল দিয়ে নীচে থেকে টিপে ধরেছে। আহা! আমার গালে যদি একটু মানুষের মতো মাংস থাকত! তত্ত্বজ্ঞান না, বৈরাগ্য নয়, পোয়াটাক মাংস দু’গালে।
